বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ শহর ঢাকা। দ্রুত নগরায়ণ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সূচকেও এ রাজধানী শহরের অবস্থান শীর্ষে। আবাসিক ও বাণিজ্যিক অবকাঠামো নির্মাণের ফলে যদিও তিন দশকে ঢাকার বুক থেকে ধ্বংস হয়ে গেছে অর্ধেকেরও বেশি, অর্থাৎ ৫৬ শতাংশ সবুজ স্থান। যেটুকু আছে এর সিংহভাগই আবার রমনা থানায়। বাকি থানা এলাকাগুলোয় সবুজের পরিমাণ একেবারেই কম। কোনো কোনো এলাকায় তা নামতে বসেছে প্রায় শূন্যের কোটায়। পরিবেশবিদরা বলছেন, এভাবে সবুজ কমতে থাকলে অচিরেই ঢাকা পরিণত হবে একটি মৃত নগরীতে। ঐতিহ্যবাহী এ শহরকে বাঁচাতে একটি উন্নয়ন দর্শন প্রণয়নের পরামর্শ দিয়েছেন নগর বিশেষজ্ঞরা।
নগর জীবনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সবুজ এলাকা ও জলাভূমির ভূমিকা অনস্বীকার্য। এক গবেষণায় দেখা যায়, ১৯৬০ সালেও ঢাকার ৮০ শতাংশ এলাকা ছিল সবুজ ও জলাভূমি। স্বাধীনতার পর দ্রুতই এ শহরের সবুজ স্থান কমতে থাকে। ২০০৫ সালে ঢাকার সবুজ এলাকা নেমে আসে ২৫ শতাংশে। এর বছর পনেরোর মধ্যেই অর্থাৎ ২০২০ সালে ২ শতাংশেরও নিচে নেমে আসে সবুজের হার। সম্প্রতি ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকার সবুজ ভূমি নিয়ে গবেষণাটি করেছেন জার্মানির কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয় ড্রেসডেনের ইকোসিস্টেম সার্ভিস ও ট্রপিক্যাল ফরেস্ট্রি বিভাগের তিন শিক্ষক।
গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৮৯-২০২০ সালে ঢাকার সবুজ ভূমি কমেছে প্রায় ৫৬ শতাংশ। ঢাকা মেট্রোপলিটন এলাকায় বর্তমানে গড়ে ২ শতাংশ ভূমিতে সবুজের আচ্ছাদন। হেক্টরের হিসাবে ৬০২ দশমিক ৪ হেক্টর বা ১ হাজার ৪৮৯ একর। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি সবুজ ভূমি রমনা পার্ক অধ্যুষিত রমনা থানায়, তাও কেবল ১৪ শতাংশ। রাজধানীর প্রাণকেন্দ্র হিসেবে পরিচিত রমনা এলাকায় মোট ভূমির পরিমাণ ৭৮৮ হেক্টর। এর মধ্যে এখনো সবুজ টিকে আছে ১১১ দশমিক ২ হেক্টরে। রমনা থানায় মোট ভবন রয়েছে ৮ হাজার ৮০৯টি, যেখানে মোট ভূমির তুলনায় এর ঘনত্ব ১১৭ দশমিক ৫ শতাংশ। মূলত ৬৮ দশমিক ৫ একরের রমনা পার্কের কারণেই এ থানায় সবুজের পরিমাণ বেশি। পার্কটি মূলত মোগল আমলে নির্মিত। ব্রিটিশ শাসনামলে পরিকল্পিত নগরায়ণের অংশ হিসেবে ১৮২৫ সালে পার্কের উন্নয়ন করা হয়।
রমনার পরই ঢাকার মধ্যে বেশি সবুজ স্থান রয়েছে বাণিজ্যিক এলাকাখ্যাত মতিঝিলে, ১২ শতাংশ। এছাড়া তেজগাঁওয়ে ৭ দশমিক ৯, ধানমন্ডিতে ৭ ও হাজারীবাগে সবুজ আচ্ছাদন রয়েছে ৫ দশমিক ৯ শতাংশ ভূমিতে। তবে সবুজ এলাকা সবচেয়ে কম খিলগাঁও ও শ্যামপুর থানায়। এ দুই থানায় যথাক্রমে মোট ভূমি রয়েছে ২ হাজার ১৯৬ ও ১ হাজার ৯২ হেক্টর। তবে এর মধ্যে সবুজ টিকে আছে কেবল শূন্য দশমিক ২ শতাংশ ভূমিতে। এর ওপর কামরাঙ্গীরচর (শূন্য দশমিক ৪), ডেমরা (শূন্য দশমিক ৫), বাড্ডা ও মিরপুরের (শূন্য দশমিক ৬) অবস্থান।
পর্যাপ্ত সবুজ এলাকা না থাকায় বর্তমান ঢাকা বাসযোগ্যতার হুমকির মুখে পড়েছে। রমনা পার্কের মতো অন্তত পাঁচটি বড় পার্ক নির্মাণ করলে তা পুনরুদ্ধার করা যাবে বলে মনে করেন রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মো. আশরাফুল ইসলাম। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘?স্বাধীনতার ৫০ বছরে ঢাকায় অনেক উন্নয়ন হয়েছে, অবকাঠামো হয়েছে কিন্তু রমনার মতো বড় পার্ক হয়নি একটিও। আগামীর শহুরে জীবন টেকসই ও দুর্যোগমুক্ত করতে হলে সবুজ এলাকা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই। প্রয়োজনে জমি অধিগ্রহণ করে হলেও নগরে সবুজ এলাকা বৃদ্ধি করতে হবে। আমরা ডিটেইল্ড এরিয়া প্ল্যানেও (ড্যাপ) বৃহত্তর ঢাকায় অন্তত পাঁচটি বড় পার্ক নির্মাণের সুপারিশ করেছি।’
রাজধানীর সবুজ ভূমি উজাড়ের ক্ষেত্রে অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও আবাসন নির্মাণকে দায়ী করেছেন গবেষকরা। তারা তাদের গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, জাতীয় সংসদ ভবন, বাংলাদেশ নেভি ও বাংলাদেশ আর্মি বা সেনানিবাস এলাকা নির্মাণ হয়েছে পরিকল্পিতভাবে। পর্যাপ্ত সবুজায়ন করা হয়েছে এসব এলাকায়। এছাড়া সরকারি আরো কয়েকটি প্রশাসনিক এলাকার সবুজায়নের বিষয়টি বিবেচনায় নেয়া হয়েছে। যদিও বেশির ভাগ সরকারি ও বেসরকারি অবকাঠামো নির্মাণের ক্ষেত্রেই ধ্বংস করা হয়েছে সবুজকে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাজনৈতিক প্রভাবও সবুজায়ন ধ্বংসের ব্যাপারে ভূমিকা রেখেছে।
নাগরিকদের স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিতের জন্য সবুজ এলাকার বিকল্প নেই। বিশেষ করে শিশুদের সুস্থভাবে বেড়ে উঠতে সবুজ খুবই জরুরি। কিন্তু ঢাকায় গাছপালা কমে যাওয়ায় দিন দিন শহরটি মুমূর্ষু হয়ে পড়ছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতির (বেলা) প্রধান নির্বাহী সৈয়দা রিজওয়ানা হাসান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘তিন দশক আগে ঢাকার লোকসংখ্যা আর এখনকার সংখ্যা তো তুলনা করা যায় না। তিন দশক আগে ঢাকায় যে মানুষ ছিল তখন সেটি মোটামুটি মানানসই, কিন্তু তিন দশক পর যেভাবে জনসংখ্যা বেড়েছে সে তুলনায় যে শুধু সবুজ এলাকা হারিয়েছে তা নয়, এ শহরে এখন বাগান বলে কিছু অবশিষ্ট নেই। ছাদবাগান আছে কিছু কিছু। কিন্তু মূলত ঢাকা একটি বাগানবিহীন শহরে পরিণত হয়েছে। একটা জীবন্ত ঢাকাকে আমরা মুমূর্ষু ঢাকায় পরিণত করে ফেলেছি। মনে রাখতে হবে, একটা শহর কেবল তার মানুষ আর বিল্ডিং দিয়ে টিকে থাকে না, একটা শহর টিকে থাকে তার সার্বিক বাসযোগ্যতা দিয়ে। ঢাকা নগরীর কোনো দর্শন নেই বলেই আজকের এ ভয়াবহ অবস্থা। ভবিষ্যতে লোকসংখ্যা আরো বাড়বে, সবুজ আরো কমবে। এখই আমাদের একটি দর্শন ঠিক করে নিতে হবে—আগামীর ঢাকা আমরা কেমন দেখতে চাই। সে দর্শন হবে অতীতের গুণ বজায় রেখে ভবিষ্যতের ভুলমুক্ত ঢাকা।’
ক্রমাগত সবুজ কমায় রাজধানীবাসীর জীবনমানে ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘদিন ধরেই বায়ু দূষণে ভুগছে ঢাকা। এ বছরের জানুয়ারি মাসে অধিকাংশ দিনই দুর্যোগপূর্ণ বায়ুর মধ্যে কাটিয়েছেন নগরবাসী। গত মাসে মোট নয়দিন রাজধানীর বায়ুর মান দুর্যোগপূর্ণ ছিল, যা গত সাত বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। এমনকি গতকালও বায়ুদূষণে বিশ্বের মধ্যে শীর্ষে ছিল ঢাকা।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব ও সবুজ ভূমি কমার সঙ্গে নগরীর অতিউষ্ণতা সম্পর্কিত বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজির (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. খন্দকার সাব্বির আহমেদ। এ নগর পরিকল্পনাবিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘?একটি নগরের বিদ্যুৎ-জ্বালানি ব্যবহারের ফলে যে তাপ উত্পন্ন হয় সবুজ এলাকা ও জলাভূমি তা শুষে নিয়ে নগরজীবনের ভারসাম্য বজায় রাখে। ঢাকায় নগরায়ণ বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুৎ-জ্বালানি ব্যবহারের পরিমাণও বাড়ছে, কিন্তু দুঃখজনকভাবে সবুজ এলাকা দিন দিন কমেই চলেছে। ঢাকায় মাথাপিছু কী পরিমাণ এনার্জির ব্যবহার হচ্ছে, সে অনুযায়ী কতটুকু সবুজ এলাকা প্রয়োজন তা হিসাব করে সরকারকে পদক্ষেপ নিতে হবে। সবুজ এলাকা কমার এ ধারা চলতে থাকলে আগামীতে ঢাকার মানুষ ভয়াবহ দুর্যোগের মধ্যে দিন কাটাবে।’
সবুজ এলাকা নগরের উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি জলাবদ্ধতা নিরসনেও বড় ভূমিকা রাখে উল্লেখ করে ড. সাব্বির আহমেদ বলেন, ‘?অতিবৃষ্টির সময় নগরের সড়ক ও বাড়িতে পানি জমত না যদি যথেষ্ট সবুজ এলাকা থাকত। ওই সবুজ এলাকায় যে মাটি আছে তা অতিবৃষ্টির পানি শুষে নেয়। তাছাড়া নাগরিক জীবনের মনস্তাত্ত্বিক চাপ মোকাবেলার ক্ষেত্রে পার্ক ও উন্মুক্ত স্থানের ভূমিকা রয়েছে।’










