দেশের প্রথম ভ্যাকসিন প্লান্ট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। যার মাধ্যমে কভিড ও ডেঙ্গুসহ ১৫ ধরনের টিকা উৎপাদন করা যাবে। ফলে ভবিষ্যতে যেকোনো মহামারী বা অতিমারী মোকাবেলায় নিজস্ব সক্ষমতা তৈরি হবে। আর আধুনিক প্রযুক্তি ও বিশ্বমানের গবেষণার মাধ্যমে উৎপাদিত বিভিন্ন ধরনের টিকা রফতানিও করা যাবে। করোনাকালে সরকার বিদেশ থেকে প্রায় ৩৬ কোটি ডোজ টিকা এনেছিল। সামনে এমন কোনো দুর্যোগে দ্রুত নিজস্ব টিকা উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জনে ৩ হাজার ১২৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ভ্যাকসিন প্লান্টটি নির্মাণ করা হচ্ছে।

তবে বিশাল বিনিয়োগ করার পর যদি প্রয়োজনীয় বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ নিযুক্ত করা না হয় তাহলে টিকা তৈরির এ প্রয়াস মুখ থুবড়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্যমতে, এর আগেও ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথ থেকে কিছু টিকা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু সেটি এখন বন্ধ আছে। তাই নতুন করে বিশাল বিনিয়োগ করে সেটি যেন আবার খারাপ বিনিয়োগে পরিণত না হয় সে বিষয়ে সতর্ক থাকার পরামর্শ তাদের।

পরিকল্পনা কমিশনের সূত্রমতে, এসেনসিয়াল বায়োটেক অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টার নামের ভ্যাকসিন প্লান্ট হবে গোপালগঞ্জে। এরই মধ্যে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়া হয়েছে। আগামী জানুয়ারি থেকে ২০৩০ সালের শেষ নাগাদ প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করবে রাষ্ট্রায়ত্ত ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড। যেখানে ২ হাজার ৬৭৫ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে এডিবি। আর সরকারি অর্থায়ন ৪২০ কোটি টাকার। প্রকল্পটি বাস্তবায়ন হলে দেশের সর্বজনীন টিকা কার্যক্রম (ইপিআই) শক্তিশালী হবে। আর ভ্যাকসিন উদ্ভাবনে গবেষণার সুযোগ তৈরি হবে। প্লান্টটিতে ২০২৮ সালের মধ্যে ছয় ধরনের এবং ২০২৯ সালে আরো নয় ধরনের টিকা উৎপাদন করা সম্ভব হবে। 

প্রকল্প প্রস্তাবনার তথ্যমতে, রিসার্চ সেন্টারের তিনটি মূল ইউনিট স্থাপন করা হবে। এর মধ্যে ভ্যাকসিন, থেরাপিউটিকস অ্যান্ড ডায়াগনস্টিকসের পূর্ণাঙ্গ সুবিধা-সংবলিত একটি ইউনিট। একটি ভ্যাকসিন উৎপাদন ইউনিট এবং একটি আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা ও ডেভেলপমেন্ট ইউনিট। গোপালগঞ্জ সদরে প্রায় সাত একর জায়গায় এটি নির্মাণ করা হবে। টিকা উৎপাদন যন্ত্রপাতি স্থাপনে বরাদ্দের প্রায় অর্ধেক অর্থ ব্যয় করা হবে। টাকার অংকে প্রায় ১ হাজার ৫৩৩ কোটি টাকা। প্রকৌশল যন্ত্র আমদানিতে ব্যয় হবে আরো ৪৩৫ কোটি টাকা। আবাসিক ভবন নির্মাণে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩৫৯ কোটি টাকা। 

প্লান্টের নির্মাণকাজ শেষ হলে ২০২৮ সাল নাগাদ ছয়টি টিকা উৎপাদন করা যাবে। যার মধ্যে রয়েছে এইচপিভি, টিসিভি, এমসিভি, ফ্লু ভ্যাকসিন, অ্যান্টি র‍্যাবিস ভ্যাকসিন এবং জাপানিজ এনসেপালিটিটিস। আর ২০২৯ সালে টিকার কাঁচামাল উৎপাদন করে টিকার সম্পূর্ণ নিজস্ব ম্যানুফ্যাকচারিং হবে। এ পর্যায়ে আইপিভি, পেন্টা, টিটি, পিসিভি ১০ এবং কভিড ও ডেঙ্গুর টিকা উৎপাদন করা হবে। 

এর আগে বেসরকারি পর্যায়ে দুটি ভ্যাকসিন প্লান্ট তৈরি করা হলেও তা প্রয়োজনের তুলনায় খুবই অপ্রতুল। তাই সরকারি উদ্যোগে এ প্লান্ট স্থাপন করা হচ্ছে। এ প্লান্টে ভ্যাকসিন তৈরি করতে সম্প্রতি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানি ডায়াডিক ইন্টারন্যাশনালের সঙ্গে এসেনসিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষর হয়েছে। এমওইউর আওতায় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক কোম্পানিটি ইডিসিএলকে ভ্যাকসিন উৎপাদন সংরক্ষণ এবং মান নিয়ন্ত্রণে প্রয়োজনীয় কারিগরি সহায়তা দেবে। চুক্তিস্বাক্ষর অনুষ্ঠানে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেছিলেন, ‘‌এটা একটি অত্যাধুনিক প্লান্ট হবে। শুধু করোনা ভ্যাকসিন নয়, অন্যান্য ভ্যাকসিন যেগুলো বাংলাদেশের প্রয়োজন সেগুলোও এখানে তৈরি হবে। ‌আমরা আশা করছি, দুই বছরের মধ্যে উৎপাদন শুরু করতে পারব। পুরোপুরি উৎপাদন শুরু করতে চার বছরের মতো লাগবে। এ প্রজেক্ট পুরোপুরি সফল হলে আমাদের ভ্যাকসিন আমদানির প্রয়োজন হবে না।’ 

টিকা তৈরির এ উদ্যোগকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, দেশে প্রতি বছর ৩০-৪০ লাখ টিকার প্রয়োজন হয়। শুধু জলাতঙ্কের জন্যই লাগে তিন-চার লাখ টিকা। সে হিসাবে সরকারি উদ্যোগে দেশে টিকা তৈরি হলে এটা খুবই সাশ্রয়ী হবে। কিন্তু এ উদ্যোগের সফলতা নিয়ে তাদের মধ্যে সংশয় রয়েছে। 

এ বিষয়ে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ বিভাগের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক বেনজির আহমেদ বলেন, ‘‌টিকা তৈরিতে উচ্চমাপের প্রযুক্তি ও বড় বিনিয়োগ প্রয়োজন হয়। অনেক বিজ্ঞানী ও প্রযুক্তিবিদ না থাকলে এমন উদ্যোগ সফলতা পায় না। দেশে এমন উদ্যোগ কতটা সফল হবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।’

তিনি বলেন, ‘এর আগেও ইনস্টিটিউট অব পাবলিক হেলথের পক্ষ থেকে জলাতঙ্ক এবং টিটেনাস তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু লোকবলের অভাবে তা এখন বন্ধ আছে। এমনকি ডেঙ্গুর সময় চাহিদা বাড়লেও প্রতিষ্ঠানটি অতিরিক্ত আইভি ফ্লুইডের জোগান দিতে পারেনি। তাই এসব সমস্যা সমাধান না করলে টিকা তৈরির বড় বিনিয়োগ উল্টো খারাপ বিনিয়োগে পরিণত হতে পারে।’