স্বপ্নের পদ্মা সেতুর নির্মাণকাজ শেষ পর্যায়ে। আগামী ২৩ জুন যান চলাচলের জন্য পদ্মা সেতু খুলে দেয়া হবে বলে সরকারের পক্ষ থেকে ঘোষণা দেয়া হয়েছে। পদ্মা সেতুর সঙ্গে একই দিনে চালু করতে নড়াইলের কালনা সেতুর নির্মাণকাজ বিরামহীনভাবে চলছে। মধুমতী নদীতে নির্মাণাধীন দৃষ্টিনন্দন এ সেতুটি হবে দেশের প্রথম ছয় লেনের সেতু।

পদ্মার সেতুর সঙ্গে একই দিনে চালুর লক্ষ্যে দায়িত্ব পাওয়ার মাত্র চারদিন পর গত ১৬ ফেব্রুয়ারি সড়ক বিভাগের প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম মনির হোসেন পাঠান কালনা সেতু নির্মাণকাজের অগ্রগতি পরিদর্শনে সন্তোষ প্রকাশ করেন। এ সময় তিনি দ্রুত সময়ের মধ্যে সেতুর কাজ শেষ করার জন্য সংশ্লিষ্টদের আহ্বান জানান।

বাংলাদেশ সড়ক ও জনপথ (সওজ) বিভাগের ক্রস বর্ডার রোড নেটওয়ার্ক ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্টের আওতায় জাপান ইন্টারন্যাশনাল কো-অপারেশন এজেন্সির (জাইকা) অর্থায়নে এ সেতু হচ্ছে। জাপানের টেককেন করপোরেশন ও ওয়াইবিসি এবং বাংলাদেশের আবদুল মোনেম লিমিটেড যৌথভাবে এ সেতুর ঠিকাদার। সেতুর পূর্ব পাড়ে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানী উপজেলা এবং পশ্চিম পাড়ে নড়াইলের লোহাগড়া উপজেলা।

প্রকল্পের কর্মকর্তারা জানান, ছয় লেনের এ সেতু হবে এশিয়ান হাইওয়ের অংশ। চারটি মূল লেনে দ্রুতগতির ও দুটি লেনে কম গতির যানবাহন চলাচল করবে। সেতুর দৈর্ঘ্য হবে ৬৯০ মিটার এবং প্রস্থ ২৭ দশমিক ১০ মিটার। বর্ষায় পানি থেকে সেতুর উচ্চতা ৭ দশমিক ৬২ মিটার এবং সেতুর নিচ দিয়ে নৌযান চলাচলের জন্য মাঝ বরাবার ১৫০ মিটার ফাঁকা থাকছে। উভয় পাশে সংযোগ সড়ক হবে ৪ দশমিক ২৭৩ কিলোমিটার, যার প্রস্থ ৩০ দশমিক ৫০ মিটার। সেতু নির্মাণে মোট ব্যয় হবে ৯৫৯ দশমিক ৮৫ কোটি টাকা।

২০১৮ সালের ২৪ জুন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সেতু কর্তৃপক্ষের কার্যাদেশ চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ওই বছরের ৫ সেপ্টেম্বর কার্যাদেশ দেয়া হয়। তখন থেকে ৩৬ মাস অর্থাৎ ২০২১ সালের ৪ সেপ্টেম্বর ছিল মেয়াদকাল।

সেতুর প্রকল্প ব্যবস্থাপক ও সওজ নড়াইলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামান জানান, কালনা সেতুর সার্বিক কাজ হয়েছে ৭২ ভাগ। সংযোগ সড়কের কাজ শেষের পথে। মূল সেতুর দুটি স্প্যান বসানোর কাজ বাকি আছে, এ দুটি বসানো হলে গাড়ি চালানো যাবে। সওজের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সম্প্রতি সেতুর কাজ পরিদর্শন করেছেন। তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ২৩ জুন থেকে এ সেতুতে গাড়ি চালানোর লক্ষ্যে কাজ চলছে।

কালনা সেতুর কাজে দীর্ঘদিন উপপ্রকল্প ব্যবস্থাপক ছিলেন সওজের প্রকৌশলী সৈয়দ গিয়াসউদ্দিন। তিনি জানান, দেশের প্রথম ছয় লেনের সেতু এটি। পদ্মা সেতু চার লেনের। দেশের সবচেয়ে বড় নেলসন লোসআর্চ টাইপের (ধনুকের মতো বাঁকা) সেতু, যা হবে দৃষ্টিনন্দন। পদ্মা সেতুর পাইলক্যাপ পানির ওপর পর্যন্ত। কিন্তু এ সেতুর পাইলক্যাপ পানির নিচে, মাটির ভেতরে। তাই নৌযান চলাচলে সমস্যা হবে না, পলি জমবে না এবং নদীর স্রোত কম বাধাগ্রস্ত হবে।

সরেজমিনে গিয়ে ও প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নদীর পূর্ব পাড়ের সংযোগ সড়কের কার্পেটিং শুরু হয়েছে ও পশ্চিম পাড়ে পাথর-বালি ভরাটের কাজ চলছে। সংযোগ সড়কের ১৩টি কালভার্টের মধ্যে ১২টির কাজ শেষ হয়েছে। আটটি আন্ডারপাসের কাজ শেষ হয়েছে। কাশিয়ানীর পাশে ডিজিটাল টোল প্লাজা নির্মাণের কাজ চলছে। সেতুর মাঝখানে বসানো হয়েছে ১৫০ মিটার দীর্ঘ স্টিলের স্প্যান। ধনুকের মতো বাঁকা স্প্যানটি তৈরি হয়েছে ভিয়েতনামে। তৈরি করেছে জাপানের নিপ্পন কোম্পানি। এটিই ছিল সেতুর সবচেয়ে বড় কাজ, তা বসানোর কাজ শেষ হয়েছে। ওই স্প্যানটির উভয় পাশের অন্য স্প্যানগুলো পিসি গার্ডারের (কনক্রিট)। মোট ১৩টি স্প্যানের মধ্যে পিসি গার্ডারের দুটি স্প্যানের কাজ বাকি আছে।          

সেতুর প্রকল্প ব্যবস্থাপক মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, প্রথমে সেতুর নকশা ছিল চার লেনের, পরে তা করা হয়েছে ছয় লেনের। সংযোগ সড়কের ভূমি অধিগ্রহণে দেরি হয়েছে। করোনার জন্য প্রায় ছয় মাস কাজ বন্ধ ছিল। এসব কারণে নির্ধারিত মেয়াদে কাজ শেষ হয়নি।

স্থানীয়রা জানায়, এ সেতু চালু হলে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্তত ১০ জেলার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ লাঘব হবে। এখানে সেতুর দাবিতে বহু আন্দোলন কর্মসূচি পালিত হয়েছে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ২০০৮ সালের ১৯ ডিসেম্বর নড়াইলের নির্বাচনী জনসভায় এ সেতু নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। ২০১৪ সালের ১৯ জানুয়ারি মধুমতী নদীর ওপর কালনা সেতু প্রকল্পটি অনুমোদিত হয়।

সওজ ও পরিবহন সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, কালনা সেতু চালু হলে বেনাপোল-ঢাকা ও যশোর-ঢাকার দূরত্ব ১১৩ কিলোমিটার, খুলনা-ঢাকার দূরত্ব ১২১ কিলোমিটার এবং নড়াইল-ঢাকার দূরত্ব ১৮১ কিলোমিটার কমবে। একইভাবে ঢাকার সঙ্গে শিল্প ও বাণিজ্যিক শহর নওয়াপাড়া এবং মোংলাবন্দর, সাতক্ষীরাসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের অন্য জেলার দূরত্বও কমে যাবে।

স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহন সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, পদ্মা সেতু ও কালনা সেতু চালু হলে কালনা থেকে যশোর পর্যন্ত সড়কে পরিবহনের চাপ বাড়বে। এতে পুরনো কম প্রশস্ত সড়কে দুর্ঘটনা বাড়তে পারে।

এ প্রসঙ্গে সওজ নড়াইলের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আশরাফুজ্জামান বলেন, কালনা থেকে যশোর পর্যন্ত বর্তমান সড়কটি আরো ছয় ফুট প্রশস্ত করা হবে। এক মাসের মধ্যে এর টেন্ডার হবে। এক বছরের মধ্যে কাজ শেষ হবে।

প্রসঙ্গত, গত পাঁচ বছরে যোগাযোগমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের কালনাঘাট তিনবার  পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে সাংবাদিকদের বলেন, কালনা সেতু পদ্মা সেতুরই একটা অংশ। পদ্মা এবং কালনা সেতুর মাধ্যমে বেনাপোল স্থলবন্দর থেকে সিলেটের তামাবিল স্থলবন্দর পর্যন্ত আঞ্চলিক যোগাযোগ স্থাপিত হবে। এতে প্রকল্প এলাকাসহ দেশের আর্থসামাজিক অবস্থার ব্যাপক উন্নয়ন হবে।