চীনের ক্ষমতাসীন দল কমিউনিস্ট পার্টি অব চায়নার (সিপিসি) শতবার্ষিকী উদযাপন হয়েছে গত বৃহস্পতিবার। এ উপলক্ষে বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) (বড়ুয়া) সাধারণ সম্পাদক দিলীপ বড়ুয়ার এক সাক্ষাৎকার প্রকাশ করেছে দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া। তাকে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ এক রাজনৈতিক নেতা আখ্যা দিয়ে সাক্ষাৎকারটি গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেছে চীনা রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশন চ্যানেল চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশনও (সিসিটিভি)।
দেশের রাজনীতিতে বামপন্থী অনেক নেতাই চীনঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তবে সিনহুয়া তাদের মধ্যে সাক্ষাৎকার নিয়েছে শুধু দিলীপ বড়ুয়ারই। এর কারণ হিসেবে বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক বর্তমানে অনেক ভালো। এক্ষেত্রে দিলীপ বড়ুয়ার বড় ধরনের অবদান রয়েছে। দেশে বামপন্থী নেতাদের মধ্যে দিলীপ বড়ুয়াকেই সবচেয়ে কাছের মিত্র বিবেচনা করে বেইজিং। রাজনৈতিক কারণেই দীর্ঘদিন ধরে সিপিসির সঙ্গে সুসম্পর্ক রয়েছে তার।
সাবেক শিল্পমন্ত্রী দিলীপ বড়ুয়া বর্তমানে বাংলাদেশের সাম্যবাদী দলের (মার্ক্সবাদী-লেনিনবাদী) (বড়ুয়া) সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করছেন। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ২০০৯ সালে গঠিত দ্বিতীয় মন্ত্রিসভার সদস্য ছিলেন তিনি। এরপর তাকে আর মন্ত্রিসভায় দেখা যায়নি। রাজনৈতিকভাবেও খুব একটা আলোচনায় আসেননি তিনি। এ মুহূর্তে রাজনৈতিক অঙ্গনে তিনি বা তার দলের তেমন সরব কোনো উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে না। যদিও বরাবরের মতোই ঢাকার সঙ্গে বেইজিংয়ের যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে সক্রিয় রয়েছেন তিনি। দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনের নানা উত্থান-পতনের মধ্যেও সিপিসির কাছে কখনই প্রাসঙ্গিকতা হারাননি তিনি। বরং দলটির চোখে বরাবরই তিনি একজন ‘অল ওয়েদার ফ্রেন্ড’ বা ‘যেকোনো পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য মিত্র’।
চীনা দূতাবাস-সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানিয়েছে, ব্যাক চ্যানেলে এদেশী কোনো রাজনৈতিক দল বা নেতার সঙ্গে আলোচনার প্রয়োজন হলে দিলীপ বড়ুয়ার সহযোগিতা নেয় বেইজিং। এমনকি নানা ক্ষেত্রে ভাষাগত অনেক সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রেও ঢাকায় নিযুক্ত চীনা দূতাবাসকে সহায়তা করেছেন তিনি।
সিপিসির সঙ্গে সুসম্পর্কের বিষয়টি উল্লেখ করেছেন দিলীপ বড়ুয়া নিজেও। দলটির শতবর্ষ উপলক্ষে সিনহুয়াকে দেয়া সাক্ষাৎকারে দিলীপ বড়ুয়া জানান, চীনের কমিউনিস্ট পার্টির সঙ্গে তিনি ও তার দলের সম্পর্ক ১৯৭৬ সাল থেকে। সিপিসি ও তার দলের মধ্যে ওই সময় থেকেই নিয়মিতভাবে প্রতিনিধি বিনিময় ও মার্ক্সবাদ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।
দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতা জোরদার করার জন্য ২০১৯ সালে গড়ে তোলা হয় বাংলাদেশ চায়না সিল্ক রোড ফোরাম (বিসিআরএফ)। শুরু থেকেই ফোরামের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করছেন দিলীপ বড়ুয়া। বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় চীনকে বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে দেখছেন তিনি। এ বিষয়ে বণিক বার্তাকে দিলীপ বড়ুয়া বলেন, বাংলাদেশের উন্নয়নের ক্ষেত্রে বর্তমানে অন্যতম নির্ভরশীল মিত্র হচ্ছে গণচীন। প্রধানমন্ত্রীও সিপিসির শতবর্ষ উপলক্ষে দেয়া বক্তব্যে এ কথা বলেছেন। কথাটি তিনি সঠিক বলেছেন। আমাদের বিনিয়োগ, বাণিজ্য, কানেক্টিভিটি ও অর্থনৈতিক স্বাবলম্বিতার ক্ষেত্রে চীন যে ভূমিকা রাখছে, বাংলাদেশের সাধারণ জনগণ এটি অনুধাবন করতে পারছে। প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যেও এসেছে, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা গড়ে তোলার স্বপ্ন বাস্তবায়ন এবং প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনৈতিক ভিত কায়েম করতে হলে চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ককে অবশ্যই আরো গভীর করে তুলতে হবে। তার এ উপলব্ধির জায়গায় সহমত পোষণ করছি।
আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চীনের সঙ্গে উন্নয়ন সম্পর্ক অনেক দেশকেই ঋণফাঁদের দিকে ঠেলে দিয়েছে। এ বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এমন কিছু ঘটার সম্ভাবনা নেই বলে জোর অভিমত দেন দিলীপ বড়ুয়া। এ বিষয়ে তার বক্তব্য হলো, ঋণ নিলে ঋণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার করতে হয়। এক্ষেত্রে ঋণের অর্থের যথাযথ ব্যবহার যে করবে না, সে-ই ঋণের ফাঁদে পড়বে। সেটা যেখান থেকেই আসুক না কেন। এজন্য ঋণের অর্থ যথাযথ জায়গায় সঠিকভাবে বিনিয়োগ করতে হয়। বাংলাদেশ বারবার বলেছে, এখন পর্যন্ত আমাদের ঋণফাঁদে পড়ার কোনো সম্ভাবনা তৈরি হয়নি। প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, বাংলাদেশ ঋণের ফাঁদে পড়বে না। চীনা রাষ্ট্রদূতও কিছুদিন আগে বলেছেন তার দেশ বাংলাদেশকে কোনোভাবেই ঋণের ফাঁদে ফেলবে না।
অন্যদিকে চীন সম্পর্কে পশ্চিমা গণমাধ্যমে প্রকাশিত বক্তব্যগুলোকে প্রপাগান্ডা হিসেবে দেখছেন তিনি। তার বক্তব্য অনুযায়ী, এসব মিডিয়ায় চীন সম্পর্কে যেসব তথ্য উঠে আসে, তার সঙ্গে বাস্তবতার কোনো মিল নেই। চীন নিয়ে তারা দেখাতে চায়, এখানে একনায়কের শাসন চলে। বিষয়টি আসলে সে রকম নয়। এটি হলো কমিউনিস্ট শাসিত দেশ। চীন পরিচালিত হয় যৌথ নেতৃত্বে। যৌথ নেতৃত্বের সিদ্ধান্তগুলোকে সিপিসির সাধারণ সম্পাদক হিসেবে শি জিনপিং সেগুলো সামনে নিয়ে আসেন। সিপিসির নেতৃত্বে চীন নিজেকে এরই মধ্যে আত্মনির্ভরশীল একটি জাতি হিসেবে প্রমাণ করতে পেরেছে। এখন পর্যন্ত বিশ্বে তিনটি শিল্প বিপ্লব হয়েছে। তিনটির কোনোটিতেই চীন নেতৃত্ব দিতে পারেনি। আজকের চীনের লক্ষ্য হলো দেশটি চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে নেতৃত্ব দেবে। এজন্য প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞান গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তারা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এ প্রতিজ্ঞা পূরণের জন্য রাষ্ট্রীয় ও সিপিসির নেতৃত্বের পর্যায় থেকে যে যে জিনিস করা প্রয়োজন, তারা সেগুলো করছে। শি জিনপিংয়ের নেতৃত্বে তারা অপ্রতিরোধ্য হয়ে উঠেছে। তারা যেভাবে মহামারীকে নিয়ন্ত্রণ করেছে, সেটি অভূতপূর্ব। মহামারীর শুরুর দিকে পরিস্থিতি কঠিন হলেও তারা এটিকে মোকাবেলার একটি রূপরেখা তৈরি করে সেভাবেই এগিয়েছে। এজন্যই সাতদিন, ১২ দিন বা ১৪ দিনের মধ্যে হাসপাতাল নির্মাণের মতো দুরূহ কাজও তারা করে দেখিয়েছে। এক্ষেত্রে তারা প্রযুক্তিগত ও লজিস্টিক সক্ষমতার প্রদর্শন করেছে। এ কারণে তারা করোনা নিয়ন্ত্রণ করে অর্থনৈতিক ধারাটিকে অব্যাহত রেখেছে। যেখানে পশ্চিমা বিশ্ব মহামারীতে অর্থনৈতিকভাবে ধুঁকেছে, অর্থনৈতিক বিনির্মাণ করতে ব্যর্থ হয়েছে, সেখানে চীন কিন্তু ঠিকই পেরেছে। বর্তমানে তারা বিশ্বের অন্যান্য দেশকেও মহামারী মোকাবেলায় সহায়তা করছে। সেক্ষেত্রেও তারা তাদের সক্ষমতা প্রদর্শন করেছে।
চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বিআরআই) প্রকল্পকে বাংলাদেশের জন্য লাভজনক হিসেবে দেখছেন দিলীপ বড়ুয়া। তিনি বলেন, এ প্রকল্পের মাধ্যমে উন্নয়নের বিকল্প ধারা তৈরি করেছেন শি জিনপিং। এ বিষয়ে তার মূল লক্ষ্য হলো, এ প্রকল্প যে দেশের মধ্য দিয়ে যাবে সেই দেশ সমৃদ্ধ হবে। বৈশ্বিক কানেক্টিভিটির মাধ্যমে ব্যবসা-বাণিজ্যের উন্নয়নের জন্য এ প্রকল্প হাতে নিয়েছেন তিনি। এজন্য চীনের কুনমিং থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম হয়ে ভারতের কলকাতা পর্যন্ত কানেক্টিভিটি তৈরির প্রস্তাব দেয়া হয়েছিল। বাংলাদেশ-চায়না-ইন্ডিয়া-মিয়ানমার ইকোনমিক করিডোর (বিসিআইএম ইসি) শীর্ষক এ পরিকল্পনা বাস্তবায়ন হলে সবাই লাভবান হতো। এক্ষেত্রে চীনারা চট্টগ্রাম বন্দর ব্যবহারের সুযোগ পেত। আবার আমাদের পণ্যও সরাসরি চীনে পাঠানো যেত। এ থেকে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান ও সমৃদ্ধ হওয়া যেত। সরকারও এটিকে সমর্থন করেছে। তবে এর বিরুদ্ধাচরণ করছে ভারত। এ কারণে তা বাস্তবায়ন হচ্ছে না। বাস্তবায়ন হলে এখান থেকে অনেকভাবেই লাভবান হতে পারত বাংলাদেশ।










