বিদ্যুতের উৎপাদন ও চাহিদায় দৈনিক ঘাটতি এখন আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াটের মতো। বিতরণ কোম্পানিগুলো এ ঘাটতি লোডশেডিংয়ের মাধ্যমে সমন্বয়ের চেষ্টা করছে। যদিও এ প্রক্রিয়ায় দেড় হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সাধারণভাবে সমন্বয় করতে পারলেও অতিরিক্ত ঘাটতির চাপে শিডিউল মেনে লোডশেডিং করা সম্ভব হচ্ছে না। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও সরবরাহের এমন সংকটকালেও পূর্ণ সক্ষমতায় নিয়মিত উৎপাদন করতে পারছে না পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র। জাতীয় গ্রিডে এখনো সংযুক্ত করা সম্ভব হয়নি দেশের অন্যতম বৃহৎ এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটিকে। এটি গ্রিডে যুক্ত করা সম্ভব হলে সংকট মোকাবেলায় বড় ভূমিকা রাখতে পারত বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

জানা গিয়েছে, জ্বালানি সংকটের কারণে খুলনা, বরিশাল ও ফরিদপুর অঞ্চলে তেলভিত্তিক বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ রয়েছে। এসব কেন্দ্র বন্ধ রেখে ওই অঞ্চলে পায়রা থেকে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। জাতীয় গ্রিডে যুক্ত না থাকায় পায়রার উৎপাদন সক্ষমতার যেমন পূর্ণ ব্যবহার হচ্ছে না, তেমনি বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থাপনায় কেন্দ্রটি সেভাবে কাজে আসছে না।

জ্বালানি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, গ্রিড লাইন যথাসময়ে নির্মাণ না করায় পায়রার বিদ্যুৎ নির্দিষ্ট অঞ্চলে বিতরণ করতে হচ্ছে। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের চাহিদার ভিত্তিতে বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে কেন্দ্রটি। গ্রিডে যুক্ত থাকলে এটিকে পূর্ণ সক্ষমতায় ব্যবহার করা যেত। ফলে বিতরণ কোম্পানিগুলো লোডশেডিংয়ের পরিমাণ কমিয়ে আনতে পারত। অন্যদিকে পায়রা থেকে সরবরাহ নেয়ায় ওই অঞ্চলের তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো বন্ধ রাখা হয়েছে। এতে বসিয়ে রেখে বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে সক্ষমতার চার্জ দিতে হচ্ছে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্রে জানা গিয়েছে, দেশে বিদ্যুতের দৈনিক চাহিদা এখন ১৩ হাজার থেকে সাড়ে ১৩ হাজার মেগাওয়াট। এর বিপরীতে বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে সর্বোচ্চ সাড়ে ১১ হাজার মেগাওয়াট। কখনো কখনো তা সাড়ে ১০ হাজার মেগাওয়াটে নেমে যাচ্ছে। অর্থাৎ চাহিদা ও উৎপাদনে গড়ে দৈনিক সরবরাহ ঘাটতি থাকছে আড়াই থেকে তিন হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত। অতিরিক্ত এ ঘাটতি সমন্বয় করতে গিয়ে শিডিউল বিপর্যয়ে পড়ছে ছয় বিতরণ কোম্পানি। ফলে কোথাও ৫-৬ ঘণ্টা, আবার কোথাও ৮-১০ ঘণ্টা পর্যন্ত লোডশেডিং করতে হচ্ছে তাদের।

বিতরণ কোম্পানিগুলোর ঊর্ধ্বতন একাধিক কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গিয়েছে, দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদনে এক থেকে দেড় হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত সমন্বয় করা সম্ভব। এর বেশি হলে সেটি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। এ পরিস্থিতিতে নিয়ম মেনে লোডশেডিং করা সম্ভব হয় না।

কেন্দ্রভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন চিত্র থেকে দেখা গিয়েছে, পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে গত ১২ অক্টোবর বিপিডিবি পিক আওয়ারে (সন্ধ্যায়) বিদ্যুৎ নিয়েছে সর্বোচ্চ ৮৯০ মেগাওয়াট। আর দিনে পিক আওয়ারে বিদ্যুৎ নিয়েছে ৬৮০ মেগাওয়াট। ওইদিন পিক ও অফপিক মিলিয়ে গড়ে পায়রা থেকে বিপিডিবি বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ৭৮৫ মেগাওয়াট। এর আগে ৯ অক্টোবর দিনে পিক আওয়ারে কেন্দ্রটির উৎপাদন ছিল ৯৯০ মেগাওয়াট, যা একই দিন রাতে ছিল ৮৪০ মেগাওয়াট। পরদিন দিনে ৬১০ মেগাওয়াট আর রাতে ১ হাজার ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে কেন্দ্রটি। ১১ অক্টোবর পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র দিনে ৬৯০ মেগাওয়াট ও রাতে ১ হাজার ২০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।

বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদন চিত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত ছয় মাসে পায়রা তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রের গড় উৎপাদন ছিল ৭০০-৭৫০ মেগাওয়াট। গত ১২ মে পায়রার গড় বিদ্যুৎ উৎপাদন ছিল ৬৯০ মেগাওয়াট, জুনের একই তারিখে তা গিয়ে দাঁড়ায় গড়ে ৯১৫ মেগাওয়াট, জুলাইয়ে ৫৮৬ মেগাওয়াট। আগস্টে ৪৬০ মেগাওয়াট। সেপ্টেম্বরে ৯০৫ মেগাওয়াট এবং অক্টোবরে একই তারিখে ৭৮৫ মেগাওয়াট। অর্থাৎ ১ হাজার ৩২০ মেগাওয়াট সক্ষমতার এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি উৎপাদন করছে অর্ধেক।

তবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটির পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ-চায়না পাওয়ার কোম্পানি লিমিটেড (বিসিপিসিএল) বলছে, পায়রা বর্তমানে ৯০০ থেকে এক হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। কেন্দ্রটির উৎপাদিত বিদ্যুৎ গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মাদারীপুর এবং বরিশাল, খুলনা ও বাগেরহাট অঞ্চলসহ দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে সরবরাহ হচ্ছে।

পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রকল্প পরিচালক শাহ আব্দুল মাওলা বণিক বার্তাকে বলেন, পায়রা দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বৃহৎ এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে। গত এপ্রিল থেকে পায়রা এক হাজার মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন করছে। জ্বালানি তেলচালিত অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র এখন বন্ধ রয়েছে। এসব জায়গায় পায়রার বিদ্যুৎ সরবরাহ করছে।

বিসিপিসিএলের তথ্য অনুযায়ী, পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটির প্রথম ইউনিট উৎপাদনে আসে ২০২০ সালের জুনে। একই বছরের ডিসেম্বরে উৎপাদনে আসে কেন্দ্রটির দ্বিতীয় ইউনিট। অথচ উৎপাদনে থাকা এ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত ৫৫০-৬০০ মেগাওয়াটের বেশি ব্যবহার করা যায়নি। বিদ্যুৎকেন্দ্রটির উৎপাদনের জন্য যে সঞ্চালন লাইন প্রস্তুত করা দরকার, সেটি প্রস্তুত করতে পারেনি পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি অব বাংলাদেশ (পিজিসিবি)।

বিদ্যুৎ সঞ্চালনের একমাত্র রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান পিজিসিবি সূত্রে জানা গিয়েছে, পদ্মা নদীতে টাওয়ার নির্মাণের কাজ শেষ হয়েছে। টাওয়ারে তার টানার কাজ দ্রুতই শুরু হবে। এটি সম্পন্ন হলে চলতি বছরের ডিসেম্বর নাগাদ পায়রা তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রের বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে আনা সম্ভব হবে।

দেশের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো অব্যাহতভাবে জ্বালানি সংকটে ভুগছে। বিশেষ করে স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি বন্ধ থাকায় গত কয়েক মাস ধরে অব্যাহত এ সংকট গত দেড় মাস ধরে প্রকট রূপ নিয়েছে। বিদ্যুৎ উৎপাদনে ডিজেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র ঘোষণা দিয়ে বন্ধ করলেও লোডশেডিং মোকাবেলায় তা পুনরায় চালু করতে হয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগকে।

জ্বালানি সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, স্থানীয় মজুদ সংকট ও বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারের ঊর্ধ্বমুখিতা বিদ্যুৎ বিভাগকে উভয় সংকটে ফেলেছে। এর দ্রুত কোনো সমাধানও মিলছে না। আসন্ন শীত মৌসুমে চাহিদা হ্রাস পেলে ও কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো দ্রুত চালু করা গেলে এ পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে মনে করছেন তারা।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বুয়েটের সাবেক অধ্যাপক ইজাজ হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, লোডশেডিং মোকাবেলায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদনে এলে বড় ভূমিকা রাখতে পারে। এ মুহূর্তে এলএনজির মূল্য ঊর্ধ্বমুখী থাকায় তা কেনা যাচ্ছে না। অন্যদিকে স্থানীয় গ্যাসের সরবরাহ বাড়ার সম্ভাবনা শিগগিরই দেখা যাচ্ছে না। এসব দিক বিবেচনায় কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো উৎপাদনে আনার কোনো বিকল্প নেই।