রাজধানীর গুলিস্তানে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কার্যালয় (নগর ভবন) ও সচিবালয়ের মাঝে ওসমানী উদ্যানের অবস্থান। প্রায় ২৩ দশমিক ৩৭ একর জায়গাজুড়ে বিস্তৃত উদ্যানটির বেশির ভাগ অংশই অর্থাৎ ৫২ শতাংশ এখন কংক্রিটে ঢাকা। পুরান ঢাকার বাহাদুর শাহ পার্ক, ঐতিহাসিক সোহরাওয়ার্দী উদ্যান, বনানী পার্ক, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ পার্কগুলোর চিত্রও প্রায় একই। অথচ ইমারত নির্মাণ বিধিমালা অনুযায়ী কোনো পার্ক বা উদ্যানের ৫ শতাংশের বেশি অংশে কংক্রিটের আচ্ছাদন দেয়ার নিয়ম নেই। পার্কের পাশাপাশি সৌন্দর্যবর্ধনের নামে রাজধানীর খোলা জায়গাগুলোতেও বসানো হচ্ছে মাত্রাতিরিক্ত কংক্রিট। ফলে অল্প বর্ষণেই তীব্র জলাবদ্ধতায় ভুগতে হচ্ছে নগরবাসীকে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দুই সিটি করপোরেশনের অবহেলা ও অব্যবস্থাপনাই নগরে জলাবদ্ধতা বাড়ানোর পেছনে বড় ভূমিকা রাখছে। উন্নয়ন প্রকল্পের নামে কংক্রিটে ঢেকে ফেলা হয়েছে রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ উদ্যান ও খোলা জায়গাগুলো। যদিও দুই সিটি মেয়রের নির্বাচনী ইশতেহার ছিল জলাবদ্ধতামুক্ত ঢাকা গড়ার।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের তথ্যমতে, রাজধানীতে গত ২৮ জুন ১১৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়। ১ জুলাই হয়েছে ৮০ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। এতেই তলিয়ে যায় ঢাকার পথঘাট। ঈদের ছুটিতে রাজধানী ফাঁকা থাকায় অবশ্য ব্যাপক জনভোগান্তি হয়নি। তবে সামনের বর্ষার দিনগুলোয় এমন বৃষ্টি ঝরলে ঠিকই চরম দুর্ভোগে পড়তে হবে নগরবাসীকে। কেননা জুলাইয়ে সাধারণত ১১৪ মিলিমিটার পর্যন্ত বৃষ্টিপাত হয়।
নগর পরিকল্পনাবিদরা জানান, বৃষ্টির পানি সাধারণত তিনভাবে নিষ্কাশন হয়। এর মধ্যে মাটি কিছু শুষে নেয়। কিছু পানি জলাশয় ও নিচু ভূমিতে গিয়ে জমা হয়। আর বড় একটা অংশ নগরের ড্রেন হয়ে খাল ও নদীতে গিয়ে মেশে। কিন্তু ঢাকায় না আছে পর্যাপ্ত জলাশয়, না আছে শোষণক্ষম ভূমি। ফলে অল্প বৃষ্টিতেও সৃষ্টি হয় জলাবদ্ধতা। আবার যে পরিমাণ খোলা জায়গা ও পার্ক রয়েছে সেগুলোও যদি কংক্রিটে ঢেকে ফেলা হয় তাহলে আগামী দিনগুলোয় অল্প বৃষ্টিপাতেই নগরবাসীকে দীর্ঘমেয়াদি জলাবদ্ধতায় ভুগতে হবে।
বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) গবেষণা থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, রাজধানীতে আশঙ্কাজনক হারে শোষণক্ষম ভূমি কমছে। ১৯৯৯ সালে ঢাকায় কংক্রিট আচ্ছাদিত ভূমির পরিমাণ ছিল প্রায় ৬৫ শতাংশ। ২০১৯ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৮২ শতাংশে। অর্থাৎ ২০ বছরের ব্যবধানে শোষণক্ষম ভূমি কমেছে ২৬ শতাংশ। একই সঙ্গে রাজধানীতে কমেছে খোলা জায়গাও। ১৯৯৯ সালে ফাঁকা ভূমি ছিল ১৪ শতাংশ। বর্তমানে সেটি ৪ দশমিক ৬১ শতাংশে গিয়ে ঠেকেছে। রাজধানীতে ২০ বছরে সবুজ আচ্ছাদিত এলাকা কমেছে প্রায় ৩৮ শতাংশ। বর্তমানে এর পরিমাণ মাত্র ৯ দশমিক ২ শতাংশ।
বিআইপির সম্প্রতি প্রকাশিত আরেক গবেষণা বলছে, রাজধানীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পার্ক ওসমানী উদ্যানের ৫২ শতাংশ, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের ৩৭ শতাংশ, বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ পার্কের ৩৭ শতাংশ এবং বনানী পার্কের ৪২ শতাংশ কংক্রিটে আচ্ছাদিত। একইভাবে বাহাদুর শাহ পার্কের মতো ঐতিহাসিক পার্কেও গত বছর নতুন করে কংক্রিটের আচ্ছাদন দেয়া হয়েছে, তাও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) অনুমোদন নিয়ে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, প্রতিনিয়ত রাজধানীর শোষণক্ষম ভূমি এভাবে কংক্রিটে ঢেকে ফেলায় আরো জটিল আকার ধারণ করবে নগরীর জলাবদ্ধতা। ডিএসসিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘পর্যাপ্ত জলাশয় ও শোষণক্ষম ভূমি সমস্যার সমাধান না করে রাজধানীবাসীকে কখনই জলাবদ্ধতা থেকে মুক্ত করা সম্ভব নয়। ড্রেন ও খাল শতভাগ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করা হলেও জলাবদ্ধতা থেকেই যাবে। কারণ এসব ড্রেন ও খালের একটি নির্দিষ্ট ধারণক্ষমতা রয়েছে।’ জলাবদ্ধতা বাড়ার জন্য মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও সৌন্দর্যের নামে দেদার পার্ক ও উদ্যান কংক্রিটে ঢেকে ফেলাকে দুষেছেন এ কর্মকর্তা।
রাজধানীর শোষণক্ষম ভূমি নির্ধারিত পরিমাণে বাড়ানো না গেলে এ সমস্যার সমাধান হবে না বলে মনে করেন নগরবিদরা। তাদের মতে, বাসযোগ্য শহরের জন্য ২৫ শতাংশ মাটি থাকা জরুরি। ঢাকার ক্ষেত্রে অবশ্য ২৫ শতাংশ মাটির পাশাপাশি ১৫ শতাংশ জলাশয়ের ব্যবস্থা করা ছাড়া জলাবদ্ধতা নিরসন সম্ভব নয়। বিআইপির সাধারণ সম্পাদক আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘ঢাকার প্রধান সমস্যা এখন জলাবদ্ধতা। অল্প বৃষ্টিতেও কেন নগরী ডুবে যায় এটা এখন বড় প্রশ্ন। আসলে একটি বাসযোগ্য নগরীর জন্য যতটুকু শোষণক্ষম ভূমি ও জলাশয় থাকা আবশ্যক, ঢাকায় তা নেই। পাশাপাশি নগরীর পার্শ্ববর্তী নদ-নদী ও খালগুলো ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এর মধ্যে সরকারি উদ্যোগের পার্ক-উদ্যানে কংক্রিটের আচ্ছাদন বাড়ছে। ফলে অল্প বৃষ্টিতেই জলে ডুবে যায় রাজধানী।’
জানতে চাইলে ডিএনসিসির প্রধান নগর পরিকল্পনাবিদ মাকসুদ হাসেম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘যেকোনো প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে পাবলিক হিয়ারিং বা জনগণের মতামত নেয়ার বিষয় থাকে। যেখানে জনগণ বা সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের মতামত নেয়া হয় না সেখানেই ভুল হয়ে যায়। তবে এটা ডিজাইন-সংশ্লিষ্ট ভুল। আশার কথা হলো পার্কগুলো এখন আর দখলে নেই।’










