রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দে অবস্থিত নারী জাগরণের অগ্রদূত বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রটি দীর্ঘদিন ধরে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে চলছে। অবশেষে স্মৃতি কেন্দ্রের কার্যক্রমে ব্যাপক পরিবর্তনের আভাস পাওয়া গিয়েছে। এ স্মৃতি কেন্দ্রের উন্নয়নে শিগগিরই নতুন প্রকল্প হাতে নেয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে বাংলা একাডেমি কর্তৃপক্ষ। এতে বিভিন্ন বিষয়ে প্রশিক্ষণে স্থানীয় নারীদের ভাগ্যোন্নয়নের পাশাপাশি বিকশিত হবে পর্যটন খাত।
বাংলা একাডেমি সূত্রে জানা গিয়েছে, বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র উন্নয়ন প্রকল্পে থাকবে নারীদের প্রাথমিক শিক্ষা প্রদানের পাশাপাশি কুটির শিল্প, হস্তশিল্প, ধাত্রী বিদ্যা ও কম্পিউটার প্রশিক্ষণ। বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষিত নারী সমাজ গড়ে তোলাই হবে এ কেন্দ্রের মূল কাজ। কেন্দ্রে থাকবে আধুনিক ডিজিটাল লাইব্রেরি। এ লাইব্রেরির বিশেষত্ব হচ্ছে দেশ-বিদেশের নারীদের লেখা এবং নারীদের সম্পর্কিত বিভিন্ন বই এখানে পাওয়া যাবে। বিদ্যমান ভবন সংস্কারের পাশাপাশি নির্মিত হবে একাধিক নতুন অবকাঠামো। গড়ে তোলা হবে বেগম রোকেয়ার সংগ্রহশালা। এছাড়া প্রাচীন নিদর্শনের প্রমাণস্বরূপ বেগম রোকেয়ার আঁতুড় ঘর, মসজিদ খিলান এবং কবরস্থান নান্দনিক রূপ দেয়ার পাশাপাশি বাংলা ভাষা ও সংস্কৃতির সঙ্গে সংগতি রেখে দেশের বিখ্যাত গান, কবিতা ও উপন্যাস চিত্রায়ণ করা হবে। এসব উদ্যোগের লক্ষ্য হচ্ছে এলাকাটি পর্যটকবান্ধব রূপ দেয়া। থাকবে মুক্তমঞ্চ। যেখানে প্রতিদিন হবে নানা সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড। এছাড়া পরিকল্পনায় আছে চিত্রাঙ্কন এবং গানসহ বিভিন্ন প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।
বাংলা একাডেমির প্রশাসন মানবসম্পদ উন্নয়ন ও পরিকল্পনা বিভাগের পরিচালক ডা. কে এম মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘স্মৃতি কেন্দ্র উন্নয়নে বড় প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে।’
বর্তমানে বেগম রোকেয়ার জন্মভূমিতে বিদ্যমান স্মৃতি কেন্দ্রের কার্যক্রম মন্থরগতিতে চলছে বলে তিনি স্বীকার করেন। তিনি বলেন, ‘প্রকল্পের বিষয়ে এরই মধ্যে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী সচিবসহ ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা চার-পাঁচবার স্মৃতি কেন্দ্রটি ঘুরে গিয়েছেন। তাছাড়া প্রধানমন্ত্রীও চান সামনের বছরের মাঝামাঝি স্মৃতি কেন্দ্রে বড় ধরনের প্রকল্প চালু হোক।’
ডা. কে এম মুজাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য হলো বেগম রোকেয়া প্রান্তিক নারীদের নিয়ে যে স্বপ্ন দেখেছেন তা বাস্তবায়ন এবং এলাাকায় ব্যাপক পর্যটকের আগমন নিশ্চিত করা।’
এতে অনেক কর্মসংস্থানের সুযোগ হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। প্রকল্পের কাজ কবে নাগাদ শুরু হবে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রকল্প পরিকল্পনার শতকরা ৮০ ভাগ কাজ শেষ হয়েছে। এখন উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) তৈরি করে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানোর জন্য কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’
মহীয়সী নারী বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্র চালু ও সচল রাখতে যারা নিরলসভাবে কাজ করছেন তাদের অন্যতম স্থানীয় বাসিন্দা রাজু আহমেদ বলেন, ‘দুঃখজনক হলেও সত্য আজও আমরা স্মৃতি কেন্দ্রটি সঠিকভাবে পরিচালনা করতে পারছি না। বর্তমানে স্মৃতি কেন্দ্রের কার্যক্রম বলতে পাঠাগার চালু আছে। ফান্ড থাকলে গানের প্রশিক্ষণ হয় আর কর্মকর্তা ও কর্মচারীরা অফিস করেন। তিনি বলেন, ‘একাধিকবার কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বরাবর লিখিতভাবে আবেদন করেছি। আশা করছি প্রকল্পটি চালু হলে এ অঞ্চলের মানুষের প্রাণের দাবি পূরণ হবে।’
তিনি দ্রুত প্রকল্পের কাজ শুরু করার জন্য প্রধানমন্ত্রী সুদৃষ্টি কামনা করেন।
বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রের ইনচার্জ মো. আব্দুল্লাহ ফারুক বলেন, ‘বর্তমানে কেন্দ্রে লোকবল হচ্ছে সব মিলিয়ে আটজন।’
২০১২ সালের পর থেকে স্মৃতি কেন্দ্রের কার্যক্রম চলমান আছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। তবে কী কী কার্যক্রম পরিচালিত হয় জানতে চাইলে তিনি বিষয়টি এড়িয়ে যান।
১৮৮০ সালের ৯ ডিসেম্বর অন্ধকারাচ্ছন্ন এবং সংকটময় সময়ে রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার পায়রাবন্দে জন্মগ্রহণ করেন বেগম রোকেয়া। এদিকে মিঠাপুকুর তথা রংপুরবাসীর দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে ১৯৯৭ সালের ২৮ জুন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা পায়রাবন্দে ৩ একর ১৫ শতক জমির ওপর বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। ২০০১ সালের ১ জুলাই স্মৃতি কেন্দ্রটি উদ্বোধন করেন তিনি। প্রথমে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্মৃতি কেন্দ্রটি পরিচালিত হলেও ২০০৪ সালের ৪ অক্টোবর স্মৃতি কেন্দ্রটির দায়িত্ব নেয় বাংলা একাডেমি।
স্মৃতি কেন্দ্র প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্য ছিল বেগম রোকেয়ার জীবন ও কর্ম সম্পর্কে গবেষণা, তার গ্রন্থাবলির অনুবাদ, প্রচার ও প্রকাশনা, সংস্কৃতিচর্চা এবং স্থানীয় তরুণ-তরুণীদের নানা বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেয়া।
২০০৮ সালে তত্কালীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রটি মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করা হয়। ওই বছরের ১৭ মার্চ অলিখিতভাবে স্মৃতি কেন্দ্রটি বিকেএমইর শ্রমিক প্রশিক্ষণ কেন্দ্র হিসেবে ব্যবহারের জন্য অনুমতি প্রদান করা হয়। শুরু হয় পোশাক শ্রমিক তৈরির প্রশিক্ষণ। এর উদ্বোধন করেছিলেন তত্কালীন সেনাপ্রধান মঈন উ আহমেদ।
স্মৃতি কেন্দ্রটির মূল উদ্দেশ্য ব্যাহত করে সেখানে পোশাক শ্রমিক তৈরির প্রশিক্ষণ বন্ধ এবং বিকেএমইকে উচ্ছেদ করার জন্য হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশ এবং পায়রাবন্দ স্মৃতি সংসদের সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম দুলাল ২০১২ সালের ২২ ফেব্রুয়রি হাইকোর্টে একটি রিট করেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে হাইকোর্ট বেগম রোকেয়া স্মৃতি কেন্দ্রের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ এবং শ্রমিক তৈরির কারখানা বন্ধের আদেশ দিলে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন ২০১২ সালের ১ মে বিকেএমইএকে উচ্ছেদ করে।










