কভিডের অভিঘাতে স্থবিরতা নেমে এসেছিল দেশের ব্যবসা-বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে। অর্থনীতি ও ব্যবসা-বাণিজ্য টিকিয়ে রাখতে কয়েক দফায় ২ লাখ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করে সরকার। সাময়িক স্বস্তি নিয়ে এলেও প্রণোদনা হিসেবে ঘোষিত এসব প্যাকেজ অর্থনীতিতে তারল্য সরবরাহ বাড়িয়ে দিয়েছে। এতে মূল্যস্ফীতি বাড়ার পাশাপাশি চাঙ্গা হয়েছে পুঁজিবাজার। অন্যদিকে আমদানি বেড়ে যাওয়ার প্রভাবে বেড়েছে চলতি হিসাবে ঘাটতিও। ডলারের চাহিদা বাড়ার প্রভাবে অবমূল্যায়ন হয়েছে টাকার। সব মিলিয়ে সামষ্টিক অর্থনীতির ভারসাম্যকে চাপে ফেলার ক্ষেত্রে প্রণোদনা প্যাকেজেরও বড় ভূমিকা ছিল বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
তাদের ভাষ্যমতে, প্রণোদনা প্যাকেজের সবচেয়ে বেশি সুবিধা পেয়েছেন বড় ব্যবসায়ীরা। টাকার অংকে বড় ব্যবসায়ীদের সুবিধার পরিমাণও ছিল বেশি। ব্যাংকগুলোর কাছ থেকেও তারা সুবিধা নিয়েছেন বেশি। বিশেষ করে তৈরি পোশাক খাতের ব্যবসায়ীরা প্রণোদনার অর্থ কাজে লাগিয়ে পণ্য উৎপাদন করে তা রফতানির মাধ্যমে বৈদেশিক মুদ্রা আয় করেছেন। কিন্তু অন্য খাতের ব্যবসায়ীরা কাঁচামাল আমদানির বিপরীতে ডলার ব্যয় করেছেন, যা দেশের চলতি মূলধন হিসাবের ওপর চাপ তৈরি করেছে। অন্যদিকে ছোট ব্যবসায়ীরা তাদের জন্য ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজের সুবিধা পুরোপুরি কাজে লাগাতে পারেননি। আবার ব্যাংকগুলোও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের ঋণ দেয়ায় খুব একটা আগ্রহী ছিল না। বড় ব্যবসায়ীরা যত সহজে প্রণোদনার অর্থ পেয়েছেন, ক্ষুদ্রদের জন্য তা ছিল ততটাই কঠিন। এতে যাদের কাছে আগে থেকেই সম্পদ কেন্দ্রীভূত ছিল, তারাই সুবিধা পেয়েছেন সবচেয়ে বেশি। অন্যদিকে যাদের সম্পদ কম, তারা সুবিধাও পেয়েছেন কম। ক্ষুদ্ররা প্রণোদনার যথাযথ সুবিধা পেলে তা কর্মসংস্থান বাড়ানোর পাশাপাশি মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণেও কার্যকর হতো।
প্রণোদনা প্যাকেজে অর্থনীতিতে তারল্য সরবরাহ বেড়েছে। এ তারল্যের একটি অংশ দেশের পুঁজিবাজারেও ঢুকেছে। পুঁজিবাজারে তারল্য বাড়ায় ২০২১ সালের তৃতীয় প্রান্তিক পর্যন্ত বাজার বেশ চাঙ্গা অবস্থায় ছিল। এ অর্থ বেরিয়ে যাওয়া শুরু হয় গত বছরের শেষ প্রান্তিকে। আবারো নিম্নমুখিতার কবলে পড়ে দেশের পুঁজিবাজার।
দেশের সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০২০ সালের ৩০ জুন শেষে চলতি হিসাবের ঘাটতি ছিল ৪৮৫ কোটি ডলার। চলতি বছরের ৩১ মে এ ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৭২৩ কোটি ডলারে। একইভাবে প্রতি ডলারের বিনিময় হার ২০২০ সালের ৩০ জুনের ৮৪ টাকা ৮০ পয়সা থেকে বেড়ে এখন ৯৪ টাকা ৭০ পয়সায় দাঁড়িয়েছে। মূল্যস্ফীতির হার গত ৩০ জুন শেষে দাঁড়িয়েছে ৭ দশমিক ৫৬ শতাংশে। গত বৃহস্পতিবার সাপ্তাহিক লেনদেনের শেষ দিনে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের সূচক ডিএসইক্স এক বছর পর ৬ হাজার পয়েন্টের মনস্তাত্ত্বিক সীমার নিচে নেমে আসে। সামষ্টিক অর্থনীতির সূচকগুলো এভাবে চাপে পড়ে যাওয়ার পেছনে কভিডের অভিঘাত মোকাবেলায় ঘোষিত প্রণোদনা প্যাকেজগুলোর ভূমিকা রয়েছে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
এ পর্যন্ত সরকার মোট ২৮টি অর্থনৈতিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে। গত মার্চ পর্যন্ত এসব প্রণোদনা প্যাকেজের মোট আকার দাঁড়িয়েছে ২ লাখ ৪২৯ কোটি টাকা, যা ২০২১ অর্থবছরের মোট জিডিপির ৫ দশমিক ৬৮ শতাংশ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্যানুসারে এর মধ্যে রফতানিমুখী উৎপাদন শিল্পের শ্রমিকদের বেতন বাবদ ৫ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়, যার শতভাগ বাস্তবায়ন হয়েছে। দুই দফায় ক্ষতিগ্রস্ত শিল্প ও সেবা খাতের জন্য ৭৩ হাজার কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণ প্যাকেজের মধ্যে প্রথম পর্যায়ে ৮১ দশমিক ৮১ শতাংশ ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ৩২ দশমিক ৬৯ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। এসএমই ও কটেজ শিল্পের জন্য দুই দফায় ৪০ হাজার কোটি টাকার চলতি মূলধন ঋণ প্যাকেজের আওতায় প্রথম পর্যায়ে ৭৬ দশমিক ৯৩ ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ৪৪ দশমিক ৪০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। রফতানি উন্নয়ন তহবিলের (ইডিএফ) আকার বাড়ানোর পাশাপাশি ব্যাক টু ব্যাক এলসির মাধ্যমে মাত্র ২ শতাংশ সুদে কাঁচামাল আমদানি বাবদ ২৯ হাজার ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়, যার ৯৩ দশমিক ৩০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। প্রি-শিপমেন্ট ঋণ পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের আওতায় ৫ হাজার কোটি টাকার প্যাকেজ ১০ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, কভিডের সময়ে অর্থনীতির কথা চিন্তা করেই প্রণোদনা দেয়া হয়েছিল। সে সময় তৈরি পোশাক ও বড় শিল্পে প্রণোদনা অর্থ বেশি গিয়েছে। পোশাক খাতে এলসি খোলা হলে এতে রফতানি বাড়বে এবং বৈদেশিক মুদ্রা আসবে। কিন্তু অন্য ব্যবসায়ীরা মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির জন্য এলসি খুলেছেন। সেটার প্রভাব এখন পড়েছে। সে সময় বিষয়টি লক্ষ করা উচিত ছিল। হঠাৎ করে মুদ্রার অবমূল্যায়ন বেড়ে যাওয়ায়ও সমস্যা হয়েছে। এটা যদি আগে থেকেই একটু একটু করে বাড়ানো হতো তাহলে এতটা চাপ পড়ত না। এটা বাজারের ওপর ছেড়ে দেয়া উচিত ছিল। প্রণোদনা প্যাকেজ ছোট ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের বেশি দেয়া উচিত ছিল। এ ধরনের উদ্যোক্তারা বিদেশ থেকে তেমন একটা আমদানি করেন না। বরং তারা স্থানীয় পর্যায় থেকে কাঁচামাল সংগ্রহ করে পণ্য উৎপাদন করেন। সম্প্রতি এসএমই খাতের জন্য প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। এটিও আরো অনেক আগেই দেয়া প্রয়োজন ছিল। শুধু নীতিগত সিদ্ধান্ত দিলেই হবে না। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের উচিত এসব নীতি যথাযথভাবে বাস্তবায়ন হচ্ছে কিনা সেটি নিবিড়ভাবে মনিটরিং করা। বর্তমান সংকট থেকে উত্তরণে মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ নিতে হবে। এক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানগুলোকে কাঠামোগত পদক্ষেপ নিতে হবে। ব্যাংক ব্যবস্থার সংস্কার, বৈদেশিক মুদ্রানীতির কৌশল, আমদানি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে মধ্যম ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশল গ্রহণ করতে হবে। আমরা শুধু প্রবৃদ্ধি ও সামষ্টিক অর্থনীতি খুব ভালো দেখছি, কিন্তু সামষ্টিকের নিচে যে নড়বড়ে হয়ে গিয়েছে সেটি দেখছি না। সেদিকে আমাদের নজর দিতে হবে।
চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের বিশেষ ভাতা বাবদ ১৩৮ কোটি টাকা বরাদ্দের মধ্যে ৮০ দশমিক ৪৩ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। কভিড-১৯ রোগীদের চিকিৎসায় নিয়োজিত চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের পাশাপাশি সরকারের নির্দেশনা বাস্তবায়নের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট স্থানীয় প্রশাসন, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সশস্ত্র বাহিনী ও অন্যান্য সরকারি চাকরিজীবী করোনায় আক্রান্ত হলে কিংবা মারা গেলে তাদের পরিবারকে যথাযথ ক্ষতিপূরণ বাবদ ৭৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছিল। এর ৯ দশমিক ৭৩ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।
করোনার কারণে কর্মসংস্থান হারানো দরিদ্রদের জন্য প্রণোদনা বাবদ ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকার সমপরিমাণ পাঁচ লাখ টন চাল ও এক লাখ টন গম বিনামূল্যে বিতরণ করার ঘোষণা দেয়া হয়েছিল। এর ৪ দশমিক ৮৮ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। নিম্ন আয়ের মানুষের মধ্যে ওএমএসের মাধ্যমে ১০ টাকা কেজি দরে চাল বিক্রির জন্য ৭৭০ কোটি টাকা বরাদ্দের পুরোটাই ব্যয় হয়েছে। করোনায় কর্মহীন হয়ে পড়া অতিদরিদ্র ৫০ লাখ মানুষের জন্য জনপ্রতি আড়াই হাজার টাকা নগদ প্রণোদনা বাবদ ১ হাজার ৩২৬ কোটি টাকার প্যাকেজের ৯৪ দশমিক ৮৭ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।
কৃষি যান্ত্রিকীকরণে সহায়তা বাবদ ৩ হাজার ২২০ কোটি টাকার প্যাকেজের ১৫ দশমিক ৬২ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। সারে ভর্তুকির ৯ হাজার ৫০০ কোটি টাকার ৮২ দশমিক ৬৩ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। দুই দফায় ৮ হাজার কোটি টাকার কৃষি পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের প্রথম পর্যায়ে ৮৫ দশমিক ৯ শতাংশ ও দ্বিতীয় পর্যায়ে ৫৩ দশমিক ৫৩ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।
নিম্ন আয়ের পেশাজীবী, কৃষক ও ক্ষুদ্র বিক্রেতাদের জন্য ৩ হাজার কোটি টাকার পুনঃঅর্থায়ন স্কিমের ৮১ দশমিক ৬৬ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। দরিদ্র গ্রামীণ কৃষক, বিদেশফেরত অভিবাসী কর্মী, প্রশিক্ষিত ও বেকার যুবকদের জন্য ৩ হাজার ২০০ কোটি টাকার স্বল্প সুদের ঋণ প্যাকেজের ৭০ দশমিক ৩১ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। ২০২০ সালের এপ্রিল-মে সময়ে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর স্থগিতকৃত সুদের ভর্তুকি বাবদ ২ হাজার কোটি টাকার ৬৯ দশমিক ৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। এসএমই খাতে ঋণ ঝুঁকি অংশগ্রহণ স্কিম বাবদ ২ হাজার কোটি টাকার মধ্যে মাত্র ৪ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।
রফতানিমুখী তৈরি পোশাক, চামড়াজাত পণ্য ও পাদুকা শিল্পের সুবিধাবঞ্চিত শ্রমিকদের সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম বাবদ ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্রণোদনার প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়। এর মধ্যে বরাদ্দ দেয়া হয় ৫০ কোটি টাকা। বিতরণ হয়েছে ৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা। গ্রামীণ অর্থনীতি পুনরুজ্জীবিতকরণ ও কর্মসংস্থান সৃষ্টি বাবদ এনজিওগুলোর মাধ্যমে বিতরণের জন্য ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকার প্যাকেজের ৬৪ দশমিক ৬৬ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে। দ্বিতীয় দফায় ৩৫ লাখ নিম্ন আয়ের পরিবার ও এক লাখ ক্ষতিগ্রস্ত বোরোচাষীদের প্রত্যেককে নগদ আড়াই হাজার টাকা করে বিতরণ বাবদ ৯৩০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের ৮৯ দশমিক ২৫ শতাংশ ব্যয় হয়েছে। ১৭ লাখ ২৪ হাজার ৪৭০ জন দিনমজুর, পরিবহন কর্মী, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, নৌ শ্রমিকদের জন্য জনপ্রতি নগদ আড়াই হাজার টাকা করে মোট ৪৫০ কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজের ৯৬ শতাংশ বাস্তবায়ন হয়েছে।
এছাড়া দরিদ্রদের সহায়তা প্রকল্পের আকার বাড়ানো বাবদ ৮১৫ কোটি টাকা, গৃহহীনদের জন্য বাড়ি নির্মাণে ভর্তুকি বাবদ ২ হাজার ১৩০ কোটি টাকা, দেশের ১৫০টি দারিদ্র্যপীড়িত উপজেলার বয়োবৃদ্ধ, বিধবা ও তালাকপ্রাপ্ত নারীদের জন্য ১ হাজার ২০০ কোটি টাকার প্রণোদনা, শহর অঞ্চলের নিম্ন আয়ের মানুষদের সহায়তার জন্য ১৪ দিনব্যাপী বিশেষ ওএমএস কার্যক্রমের মাধ্যমে ২০ হাজার টন চাল ও ১৪ হাজার টন আটা বিতরণ বাবদ ১৫০ কোটি টাকা, হেল্পলাইনের মাধ্যমে সহায়তা চাওয়ার ক্ষেত্রে জেলা প্রশাসকদের অনুকূলে ১০০ কোটি টাকার বরাদ্দ, পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক, কর্মসংস্থান ব্যাংক ও পিকেএসএফের মাধ্যমে গ্রামীণ এলাকায় কর্মসংস্থান সৃষ্টি কার্যক্রমে ৪ শতাংশ সুদে ঋণসহায়তা বাবদ ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং ট্যুরিজম খাতের হোটেল, মোটেল ও থিম পার্কের কর্মীদের বেতন-ভাতা পরিশোধে ব্যাংকের মাধ্যমে ৪ শতাংশ সুদে চলতি মূলধন ঋণ বাবদ ১ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে।
পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ও ব্র্যাক ব্যাংকের চেয়ারম্যান ড. আহসান এইচ মনসুর বণিক বার্তাকে বলেন, বৈশ্বিকভাবেই প্রণোদনা প্যাকেজের কারণে অর্থনীতিতে তারল্য সরবরাহ বেড়েছে। এর প্রভাবে মূল্যস্ফীতিও বেড়েছে। এরই মধ্যে প্রণোদনা প্যাকেজ অনেকাংশেই বিতরণ করা হয়েছে। তবে এর প্রভাব এখনো রয়ে গিয়েছে। প্রণোদনা প্যাকেজ দেয়া হয়েছিল যাতে অভ্যন্তরীণভাবে চাহিদা বাড়ে। দেশে চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি বহির্বিশ্বে পণ্যের দামও বেড়েছে এ সময়। এ দুটো মিলেই আমাদের চলতি মূলধন ঘাটতির ওপর চাপ বেড়েছে। প্রণোদনা সুবিধা বড় ব্যবসায়ীরা বেশি পেয়েছেন। সে তুলনায় ছোট উদ্যোক্তারা সুবিধা পাননি। এজন্য সম্প্রতি ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য আরেকটি প্রণোদনা ঘোষণা করা হয়েছে। কভিডের সময়ে ব্যাংকের কাছ থেকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা সেভাবে সুবিধা পাননি। তাই ব্যাংকের মাধ্যমে তাদের সুবিধাপ্রাপ্তির সুযোগ দিতে এসএমইর ক্ষেত্রে ঋণের সুদহারের সীমা উঠিয়ে দেয়া যেতে পারে কিংবা এক্ষেত্রে সরকার যে ভর্তুকি দিতে চাচ্ছে সেটি ব্যাংকের ৯ শতাংশ সুদের সঙ্গে অতিরিক্ত হিসেবে যোগ করা যেতে পারে। এতে ব্যাংকের মাধ্যমে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থায়ন নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে আরো বেশকিছু প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করা হয়েছে। এর মধ্যে বৃহৎ শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য ৩০ হাজার কোটি টাকার তৃতীয় ও শেষ দফার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর মধ্যে ২৭ হাজার কোটি টাকা শিল্প ও সেবা খাতের প্রতিষ্ঠানগুলোর জন্য আর বাকি ৩ হাজার কোটি টাকা বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা), বাংলাদেশ রফতানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেপজা) ও বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষে অবস্থিত এ, বি ও সি টাইপ শিল্পপ্রতিষ্ঠান এবং এসব অঞ্চলের বাইরে অবস্থিত শতভাগ বিদেশী মালিকানাধীন বা যৌথ মালিকানাধীন দেশী-বিদেশী প্রতিষ্ঠানগুলোকে ঋণ হিসেবে দেয়া হবে।
একই সঙ্গে কভিডে ক্ষতিগ্রস্ত কুটির, অতিক্ষুদ্র, ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের (সিএমএসএমই) জন্য তৃতীয়বারের মতো ২০ হাজার কোটি টাকার প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ প্যাকেজ থেকে ক্ষতিগ্রস্ত সিএমএসএমই প্রতিষ্ঠান ৪ শতাংশ সুদে ঋণ পাবে। বাকি ৫ শতাংশ সুদ সরকার ভর্তুকি দেবে। আগামী বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত এ প্যাকেজ চালু থাকবে। এ প্যাকেজের বরাদ্দকৃত তহবিলের ৭০ শতাংশ কুটির, অতিক্ষুদ্র ও ক্ষুদ্র (সিএমএস) শিল্পে বিতরণ করা হবে। বাকি ৩০ শতাংশ ঋণ পাবেন মাঝারি শিল্প খাতের উদ্যোক্তারা। প্যাকেজের আওতায় বার্ষিক মোট ঋণের ৮ শতাংশ নারী উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিতরণ করতে হবে বলেও জানিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক।
ঘোষিত এসব প্রণোদনা প্যাকেজ এখনো শতভাগ বাস্তবায়ন হয়নি। বড় ব্যবসায়ীদের অনেকেই প্যাকেজের পুরো সুবিধা নিয়েছেন। আবার অনেক খাতে এখনো প্রায় শতভাগ সুবিধা অব্যবহূত রয়েছে। বিশেষ করে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অনেকেই প্রণোদনার সুবিধা পাননি। এ কারণে সরকারকে নতুন করে তাদের জন্য সম্প্রতি আবারো প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করতে হয়েছে।
সার্বিক বিষয়ে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী ড. শামসুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, প্রণোদনা প্যাকেজের কারণে ব্যবসায়ীয়া আমদানি করেছেন, অর্থ ব্যয় হয়েছে। এজন্য কভিডের মধ্যেও আমাদের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। ফলে যে উদ্দেশ্যে প্রণোদনা দেয়া হয়েছিল সেটি কার্যকর হয়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে গত ফেব্রুয়ারি থেকে মূল্যস্ফীতি বাড়তে শুরু করেছে। মূলত যুদ্ধের প্রভাবে সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় খাদ্যপণ্যের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি জ্বালানির দামও বেড়েছে। এসব পণ্য আমাদের আমদানি করতে হয়। ফলে আমাদের এখানেও মূল্যস্ফীতি বেড়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমরা চালসহ আরো বেশকিছু পণ্যে ট্যারিফ কমিয়েছি। বিলাসপণ্য আমদানি নিরুৎসাহিত করা, ইডিএফ ঋণের সুদহার বাড়ানো এবং এ তহবিলের মাধ্যমে আয়ের ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ডলার সংরক্ষণ করার নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। এটা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে সহায়ক হবে। পাশাপাশি দেশে উৎপাদন ব্যবস্থাকে সক্রিয় রাখতে ভর্তুকি অব্যাহত রাখা ও বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দেয়া অব্যাহত রাখা হয়েছে। সামগ্রিকভাবে দেশের মূল্যস্ফীতি না কমলেও এটিকে কিছুটা নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব হয়েছে। আশা করছি কয়েক মাসের মধ্যে মূল্যস্ফীতি কমে আসবে। অন্যান্য দেশের তুলনায় আমাদের দেশে মূল্যস্ফীতি কম রয়েছে। ডলারের দাম বেড়ে যাওয়ার একটি কারণ হচ্ছে বর্ধিত আমদানি। পাশাপাশি পণ্যের দামও বেড়ে গিয়েছিল। গত অর্থবছরে আগের বছরের তুলনায় ৩ বিলিয়ন ডলার রেমিট্যান্স কম এসেছে। এতেও ডলারের ওপর চাপ পড়েছে। ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে অনেকগুলো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। আশা করছি এটিও স্থিতিশীল হয়ে আসবে। গত দুই বছরে ১২ লাখ শ্রমিক প্রবাসে গিয়েছেন। ফলে সামনে আমাদের রেমিট্যান্স প্রবাহ বাড়বে।










