৮৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে যশোরের অভয়নগর উপজেলার ভৈরব নদের ওপর নির্মিত সেতু উদ্বোধনের ১১ মাসের মাথায় পুনর্নির্মাণ করার উদ্যোগ নিয়েছে এলজিইডি। সেতুটির পূর্বপাশে সংযোগ সড়কের প্রতিরক্ষা দেয়াল ধসে পড়ছে। এছাড়া ওই অংশে সড়কের দুই দিকে সংযোগ সড়ক ও প্রতিরক্ষা দেয়ালের মধ্যে লম্বা ফাটল দেখা দিয়েছে। এরই মধ্যে এলজিইডির ডিজাইন শাখার কর্মকর্তারা পরিদর্শন করেছেন।

গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে ভারি বৃষ্টিতে সেতুর সংযোগ সড়কের প্রতিরক্ষা দেয়ালে এ ধস এবং সংযোগ সড়ক ও প্রতিরক্ষা দেয়ালের মধ্যে ফাটল দেখা দেয়। এ অবস্থায় অনেকটা ঝুঁঁকি নিয়ে সেতু দিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। ২০২০ সালের ২২ নভেম্বর যশোর জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে ভৈরব সেতুর উদ্বোধন করেছিলেন।

যশোরের অভয়নগর উপজেলা আটটি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত। মাঝ দিয়ে বয়ে গেছে ভৈরব নদ। নদটি উপজেলাটিকে দুই ভাগে বিভক্ত করেছে। ভৈরব নদের উত্তর-পূর্ব পাড়ে একটি পৌরসভাসহ চারটি ইউনিয়ন এবং দক্ষিণ-পশ্চিম পাড়ে চারটি ইউনিয়ন অবস্থিত। নদের উত্তর-পূর্ব অংশের চারটি ইউনিয়নের লোকজন নৌকায় করে নদ পার হয়ে উপজেলা সদর নওয়াপাড়ায় যাতায়াত করত। দুই পাড়ের মানুষের যোগাযোগ সহজ করার জন্য ভৈরব নদের ওপর সেতু নির্মাণ করা হয়।

স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি), অভয়নগর উপজেলা কার্যালয় সূত্র জানায়, প্রায় ৮৫ কোটি ৩৯ লাখ টাকা ব্যয়ে ৭০২ দশমিক ৫৫ মিটার দীর্ঘ এবং ৮ মিটার প্রস্থের ভৈরব সেতুটি নির্মাণ করা হয়। সেতুটিতে মোট ১৫টি পিলার ও ১৬টি স্প্যান রয়েছে। সেতুর নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০১৪ সালের ৩০ নভেম্বর। সেতুটি নির্মাণ করে ঢাকার যৌথ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ম্যাক্স-রানকেন গ্রুপ। ২০১৯ সালের জুনে সেতুর নির্মাণকাজ শেষ হয়।

সূত্র জানায়, গত বছর ২২ নভেম্বর প্রধানমন্ত্রী গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সিংয়ের মাধ্যমে ভৈরব সেতুর উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রীর উদ্বোধনের পর ওইদিন সেতুটি আনুষ্ঠানিকভাবে লোকজন ও যানবাহন চলাচলের জন্য খুলে দেয়া হয়।

সরেজমিনে দেখা গেছে, ভৈরব নদের পশ্চিম পাড়ে নওয়াপাড়া পৌরসভার মশরহাটি গ্রাম। আর পূর্ব পাড়ে উপজেলার শ্রীধরপুর ইউনিয়নের দেয়াপাড়া গ্রাম। পূর্ব ও পশ্চিম বরাবর সেতুটি মশরহাটি এবং দেয়াপাড়া গ্রামকে সংযুক্ত করেছে। পূর্ব অংশে সেতু থেকে প্রায় ৩৫০ ফুট দূরে সংযোগ সড়কের বাম দিকে ৯০ ফুট এলাকাজুড়ে প্রতিরক্ষা দেয়ালের ব্লক ধসে পড়েছে। ওই অংশে আরো প্রায় ৫০ ফুট এলাকাজুড়ে ব্লক ধসে পড়ার উপক্রম হয়েছে। সেতু থেকে প্রায় ৩০০ ফুট দূরে সংযোগ সড়ক ও প্রতিরক্ষা দেয়ালের মধ্যে প্রায় ১০০ ফুট এলাকাজুড়ে লম্বা ফাটল দেখা দিয়েছে। সংযোগ সড়কের ডান দিকে প্রতিরক্ষা দেয়াল উঁচুনিচু হয়ে আছে। কয়েকটি স্থানে প্রতিরক্ষা দেয়ালের ব্লক দেবে গেছে। এছাড়া সংযোগ সড়ক ও প্রতিরক্ষা দেয়ালের মধ্যে দেখা দেয়া লম্বা ফাটল সেতুর প্রায় ১৫০ ফুটের মধ্যে চলে এসেছে। প্রতিরক্ষা দেয়ালের নিচের দিকে পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় প্রায় ২৫টি বাড়ি জলাবদ্ধ হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় কয়েক ব্যক্তি জানান, সেতুর পূর্ব অংশের দুই পাশে একেবারেই খাড়া করে সংযোগ সড়কের প্রতিরক্ষা দেয়াল নির্মাণ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় ঢাল রাখা হয়নি। কাজও করা হয়েছে নিম্নমানের। এজন্য গত ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে বৃষ্টিতে দেয়ালের ব্লক ধসে পড়ে। যানবাহন চলাচল করায় সংযোগ সড়ক ও প্রতিরক্ষা দেয়ালের মধ্যে ফাটল সৃষ্টি হয়েছে। নিচের অংশ থেকে মাটি সরে গেলে সড়কটি ধসে পড়তে পারে। এতে সেতুটি ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তারা জানান, সেতু নির্মাণের সময় সংযোগ সড়কের প্রতিরক্ষা দেয়ালের নিচের দিকে পানি নিষ্কাশনের জন্য কোনো ড্রেন করা হয়নি। ফলে বৃষ্টির পানি সেতুর ওপর দিয়ে গড়িয়ে নিচে পড়ছে। নিষ্কাশিত না হওয়ায় ওই পানিতে প্রায় ২৫টি বাড়ি তলিয়ে গেছে।

গ্রামের কৃষক রফিকুল ইসলাম শেখ বলেন, সংযোগ সড়কের প্রতিরক্ষা দেয়ালের নিচের দিকে ২৫টি বাড়ি আছে। আমার বাড়ি সেখানে। আগে সেখানে একটি কালভার্ট ছিল। সেতু করার সময় কালভার্ট ভেঙে ফেলা হয়। কিন্তু পানি সরানোর জন্য কোনো ড্রেন করা হয়নি। গত সেপ্টেম্বর সেতু দিয়ে নেমে আসা বৃষ্টির পানিতে সবগুলো বাড়ি তলিয়ে আছে।

ভৈরব বাঁচাও আন্দোলন সংস্কার কমিটির উপদেষ্টা ইকবাল কবীল জাহিদ জানান, এলজিইডি ও সড়ক বিভাগ জনগণের টাকার লুটপাট করছে। সেতুটি প্রস্তুত করার আগে কেন এলজিইডির কর্মকর্তারা সবকিছু খতিয়ে দেখেননি। এসব কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সরকারের ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন।

এলজিইডির অভয়নগর উপজেলা প্রকৌশলী (দায়িত্বপ্রাপ্ত) শ্যামল কুমার বসু বলেন, ওই এলাকায় বালির পরিমাণ বেশি। এজন্য ভারি বৃষ্টিতে সংযোগ সড়কের প্রতিরক্ষা দেয়ালের প্রায় ৭০ ফুট এলাকায় ব্লক ধসে পড়েছে। সংযোগ সড়ক ও প্রতিরক্ষা দেয়ালের মধ্যে ফাটল দেখা দিয়েছে। সরেজমিন পরিদর্শন করে একটি প্রতিবেদন তৈরি করা হয়েছে। ওই প্রতিবেদন এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলী, বড় সেতু নির্মাণ প্রকল্পের (এলবিসি) প্রকল্প পরিচালক এবং ডিজাইন বিভাগের প্রধানের কাছে পাঠানো হয়েছে। ডিজাইন বিভাগের কর্মকর্তারা সরেজমিন পরিদর্শন করে গেছেন। তারা বললে আবার সংস্কার করা হবে।

এ ব্যাপারে এলজিইডির যশোর কার্যালয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী একেএম আনিছুজ্জামান জানান, এলজিইডির ডিজাইন বিভাগের কর্মকর্তারা দেখে গেছেন। আমরা একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছি তাদের কাছে। সেতুটি পুনর্নির্মাণ করতে হবে। প্রধান কার্যালয় থেকে নির্দেশনা দিলে আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেব।