প্রায় ১০ গ্রামের জমি আবাদে সেচের জন্য নির্ভরশীল পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার ভদ্রার বিলের ওপর। এ বিলের পানি প্রবাহিত এলাকায় অবৈধভাবে গড়ে তোলা হয়েছে পাবনা রশিদ পেপার মিল। এতে এক অংশে মৃতপ্রায় বিল অন্য প্রান্তে স্থায়ী জলাবদ্ধতায় অনাবাদি হয়ে পড়েছে ১০ গ্রামের প্রায় ৫০০ একর ফসলি জমি।
স্থানীয়রা জানান, ২০১৭ সালে পাবনার মুলাডুলির সরাইকান্দি গ্রামের বিএডিসি পানাসি (পাবনা-নাটোর-সিরাজগঞ্জ) সেচ প্রকল্পের আওতাধীন কৃষিজমি ভরাট করে গড়ে তোলা হয় রশিদ পেপার মিল।
গ্রামবাসীর অভিযোগ, কৃষিজমিতে শিল্প নির্মাণে সরকারি নিষেধাজ্ঞা থাকলেও তা অমান্য করে গ্রামের পানি নিষ্কাশনের ক্যানেল বন্ধ করে কারখানা গড়ে তোলে মিল কর্তৃপক্ষ। উৎপাদন শুরুর পর রাসায়নিক মিশ্রিত দূষিত বর্জ্য ও অপরিশোধিত পানি চাষীদের জমিতে ফেলায় নষ্ট হচ্ছে ধান, ইক্ষুসহ বিভিন্ন ফসল। দুর্গন্ধযুক্ত পানিতে এলাকায় পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি ছড়িয়ে পড়ছে নানা চর্মরোগও। ২০১৯ সালের মার্চে বছরভিত্তিতে অবস্থানগত ছাড়পত্র নেয় মিলটি। এ ছাড়পত্রের মেয়াদ এরই মধ্যে শেষ হলেও তারা তা নবায়নের কোনো আবেদন করেনি। পেপার মিল ছাড়াও আশপাশে আরো বেশ কয়েকটি কারখানা গড়ে উঠেছে। জলাবদ্ধতার কারণে এখানকার কৃষকরা বাধ্য হয়েই শিল্প-কারখানার মালিকদের কাছে স্বল্প মূল্যে জমি বিক্রি করে দিচ্ছেন।
এ বিষয়ে পাবনা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. নাজমূল হোসাইন বণিক বার্তাকে বলেন, উৎপাদন শুরু করলেও পরিবেশগত সনদ নেই মিলটির। সে কারণে একাধিকবার পরিবেশ অধিদপ্তরের স্থানীয় ও বিভাগীয় পর্যায় থেকে মিলটি পরিদর্শন করে দেখতে পায়, তারা ব্যাপক হারে পরিবেশ দূষণ করে উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। অধিদপ্তর থেকে বারবার মিল কর্তৃপক্ষকে সতর্ক ও নির্দেশনা দেয়ার পরও কর্তৃপক্ষ তা অগ্রাহ্য করে আসছে। এ কারণে পাবনা পরিবেশ অধিদপ্তর থেকে সার্বিক ফিরিস্তিসহ ২৪ নভেম্বর ৪৮১ নং স্মারকপত্রে রশিদ পেপার মিলের ব্যাপারে বিধিগত ব্যবস্থা নেয়ার জন্য বিভাগীয় দপ্তর বগুড়ায় পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকে সুপারিশসহ পত্রটি ঢাকার দপ্তরে পাঠানো হলেও এ পর্যন্ত কোনো বিধিগত ব্যবস্থা নেয়া হয়নি।
মুলাডুলি ইউনিয়নের ৬ নং ওয়ার্ড সদস্য আব্দুল আজিজ জানান, ভদ্রার বিল থেকে পানি নিষ্কাশন ক্যানেল হয়ে নদীতে গিয়ে মিশত। বর্ষা মৌসুম ছাড়া অন্য দুটি মৌসুমে গ্রামের চাষীরা বছরে দুটি ফসল ওইসব জমিতে আবাদ করতেন। রশিদ পেপার মিলসহ কয়েকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিষ্কাশনের পথ বন্ধ করে স্থাপনা নির্মাণ করেছে। পানি নির্গমনের পথ বন্ধের কারণে সৃষ্ট স্থায়ী জলাবদ্ধতায় তিন বছর ধরে অনাবাদি হয়ে পড়েছে উপজেলার সরাইকান্দি, লক্ষ্মীকোলা, চাঁদপুর, দরগাপাড়া, কারিগরপাড়া, দেবীপুর, বহরপুর, রামচন্দ্রপুর গ্রামের প্রায় ৫০০ একর ফসলি জমি। রাসায়নিক মিশ্রিত দুর্গন্ধযুক্ত পানি পুকুরে মেশায় মারা যাচ্ছে মাছও। কর্তৃপক্ষের কাছে ক্ষতিপূরণ ও প্রতিকার চেয়ে উল্টো ভয়ভীতি ও হুমকি মিলেছে।
সরেজমিন ভদ্রার বিল এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, জলাবদ্ধতা ও কারখানার দূষিত বর্জ্যের কারণে বিলের বুকজুড়ে এখন কচুরিপানার রাজত্ব। একসময় কৃষাণ-কৃষাণীর কর্মচাঞ্চল্যে দিনভর মুখরিত হয়ে থাকত মুলাডুলির ভদ্রার বিল। শত শত একর জমিজুড়ে ফলত ধান, ইক্ষুসহ বিভিন্ন ফসল। এ ফসল দিয়ে জীবন-জীবিকার নির্বাহ করতেন হাজারো কৃষক পরিবার। সেই বিল এখন নীরব নিস্তব্ধ। তিন বছর ধরে এ বিলের কৃষিজমির ফসলের ওপর নির্ভরশীলদের জীবন নিদারুণ অর্থকষ্ট ও হতাশায় ভরে গেছে।
সরাইকান্দি গ্রামের কৃষক আমজাদ হোসেন বলেন, রশিদ পেপার মিল নির্মাণের স্থান দিয়েই ভদ্রার বিলের পানি বের হয়ে যাওয়ার প্রধান নালা ছিল। ২০১৭ সাল থেকে পেপার মিল নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার পর এ নালা বন্ধ করে দেয়া হয়। বিলের পানি বের হওয়ার আর কোনো বিকল্প পথ না থাকায় বিলের জমিতে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়। এ বিলের জমিতে বছরে দুটি ফসলের আবাদ করা যেত। জলাবদ্ধতার কারণে এখানে তিন বছর ধরে কোনো আবাদ হয় না।
মিল কর্তৃপক্ষের দাবি, নীতিমালা মেনে পরিবেশবান্ধব পদ্ধতিতে উৎপাদন চলছে। সাক্ষাতে কথাও বলেননি রশিদ পেপার মিলের মালিক। কয়েক দিন টানা চেষ্টা করে সেলফোনে কথা হয় প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী পরিচালক জহিরুল হকের সঙ্গে। তিনি দাবি করেন, রশিদ পেপার মিলে জার্মান প্রযুক্তির ইফ্লুয়েন্ট ট্রিটমেন্ট প্লান্ট (ইটিপি) ব্যবহার হচ্ছে। মেশিন অ্যাডজাস্ট করতে কিছুটা অসুবিধা হওয়ায় পানি অন্যের জমিতে চলে গেছে। এটি সমাধান হয়ে যাবে। একটি পুকুরের তিন-চারটি মাছ মারা গেছে। এ নিয়ে মাথাব্যথার কিছু নেই বলেও দাবি করেন তিনি।
কৃষিজমিতে শিল্পায়নের ব্যাপারে জহিরুল ইসলাম বলেন, কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগে কারখানা স্থাপন হয়েছে। সরকারি অনুমোদন নিয়ে সব কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
পাবনা কল-কারখানা ও প্রতিষ্ঠান পরিদর্শক অধিদপ্তরের উপমহাপরিদর্শক মো. জাহাঙ্গীর আলম বলেন, এ দপ্তর থেকে রশিদ পেপার মিল কোনো সনদ না নিয়েই বেশ কিছুদিন ধরে তাদের মিল চালু করে। বিভিন্ন সময় তাদের সনদ নেয়ার তাগিদ দিলেও কর্ণপাত করে না তারা। ২০১৯ সালে প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে বিধিগত ব্যবস্থা নেয়ার উদ্যোগ নিলে ২০২০ সালে এসে তারা একটি সনদ গ্রহণ করে, যার মেয়াদ চলতি বছরের জুন পর্যন্ত বলবৎ রয়েছে।
এদিকে ঈশ্বরদী উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ আ. লতিফ বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার কৃষকদের অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে এলাকা পরিদর্শন করে ঘটনার সত্যতা পাওয়ায় মিল কর্তৃপক্ষকে বর্জ্য ও পানি নিষ্কাশনের পরিবেশগত ব্যবস্থা নেয়ার পরামর্শ দেয়া হয়। তার পরও তারা কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।
পাবনা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আ. কাদের জানান, বিষয়টি জানার পর জেলা প্রশাসকসহ সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলোচনা করে বিধিগত ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে।
কৃষিজমি নষ্ট করে শিল্পায়নের সুযোগ নেই বলে জানিয়েছেন পাবনা জেলা প্রশাসক কবীর মাহমুদ। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, কৃষিপ্রধান এলাকায় ফসলি জমিতে কীভাবে এ শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখা হবে। সাধারণ কৃষকদের ক্ষতি করে কোনো শিল্পপ্রতিষ্ঠান চলতে পারে না। এ ব্যাপারে প্রশাসনিক পদক্ষেপ নেয়া হবে।










