গাজীপুরে বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) নতুন একটি জৈব সার উদ্ভাবন করেছে। ‘ব্রি অর্গানিক সার’ নামে সম্প্রতি উদ্ভাবিত এ সার প্রয়োগে ইউরিয়ার ব্যবহার প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তারা বলছেন, এ সার ব্যবহারের ফলে আলাদা টিএসপি ব্যবহারেরও তেমন প্রয়োজন হবে না। এটি মাটির কার্বন, জৈব পদার্থ ও উপকারী অণুজীবের সংখ্যা বাড়াবে। এতে ধানের উৎপাদন ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। সারটি বাজারজাত করার লক্ষ্যে এরই মধ্যে ব্রি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান এসিআই লিমিটেডের মধ্যে প্রাথমিক চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে। শিগগিরই এ সার বাজারে আসবে বলে জানিয়েছে ব্রি কর্তৃপক্ষ।
ব্রির পরিচালক (গবেষণা) ড. মো. রফিকুল ইসলাম জানান, ব্রি অর্গানিক সার’ মাটি ও কৃষক উভয়ের জন্যই অত্যন্ত উপকারী। এটি মাটির স্বাস্থ্য পুনরুদ্ধার এবং টেকসই চাষাবাদ নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। এ সার ব্যবহারে ধানের জমিতে ৩০ শতাংশ ইউরিয়া সারের ব্যবহার কমানো সম্ভব এবং টিএসপি ব্যবহারের প্রয়োজন হয় না। সরাসরি মাটিতে কার্বন ও জৈব পদার্থের পরিমাণ বৃদ্ধি করে মাটির উর্বরতা ও স্বাস্থ্য রক্ষা করে। এতে উপকারী ব্যাকটেরিয়া থাকে, যা মাটির জৈবিক ক্রিয়াকলাপ বৃদ্ধি করে। এ সার সাধারণত পচনযোগ্য রান্নাঘরের বর্জ্য, সবজি ও ফসলের অবশিষ্ট অংশ, বায়োচার, রক ফসফেট এবং বিশেষ ব্যাকটেরিয়ার মিশ্রণ দিয়ে তৈরি করা হয়। ব্রি অর্গানিক সার ব্যবহারে ধানের ফলন সাধারণের তুলনায় ১০-২০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পেতে পারে।
তিনি জানান, এ সার দীর্ঘ সময় ধরে ধাপে ধাপে পুষ্টি সরবরাহ করে, যা গাছের জন্য উপকারী। জৈব পদার্থ ও কার্বন বাড়ায়, মাটির গঠন, পানি ধারণক্ষমতা এবং উপকারী অণুজীবের সংখ্যা বৃদ্ধি করে যা মাটিকে স্বাস্থ্যবান করে তোলে। এতে নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়ামসহ অন্যান্য মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট এবং জৈব উত্তেজক উপাদান থাকে। এটি মাটির কণাগুলোকে একত্রে ধরে রেখে মাটির গঠন উন্নত করে এবং অম্লতা কমাতে সাহায্য করে। জৈব সার ব্যবহারের ফলে মাটির পানি ধরে রাখার ক্ষমতা বৃদ্ধি পায়, ফলে সেচের ক্ষেত্রে কৃষককে সুবিধা দেয় এবং খরা মৌসুমে ফসলের জন্য সহায়ক হয়। ব্রি অর্গানিক সার শুধু পুষ্টিই দেয় না, মাটিকেও উর্বর ও স্বাস্থ্যকর করে তোলে, যা একটি সমন্বিত সার ব্যবস্থাপনা পদ্ধতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সার গ্রিনহাউজ গ্যাস নিঃসরণও উল্লেখযোগ্যভাবে কমাবে।
কৃষক পর্যায়ে এ সারের উৎপাদন প্রযুক্তি হস্তান্তরযোগ্য কিনা এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘ব্রি উদ্ভাবিত এ জৈব সার মূলত গবেষণাগারে উদ্ভাবিত বিশেষ এক ধরনের বায়োঅর্গানিক সার। সাধারণ কৃষক পর্যায়ে উৎপাদনে কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে। অণুজীব বা ব্যাকটেরিয়ার সঠিক মিশ্রণ নিশ্চিত করা সাধারণ কৃষকের জন্য কিছুটা কঠিন হতে পারে, এজন্য বিশেষজ্ঞের তদারকি প্রয়োজন। এটি সাধারণ জৈব সার বা কম্পোস্টের চেয়ে কিছুটা ভিন্ন হওয়ায় নির্দিষ্ট কিছু ধাপ ও উপকরণের প্রয়োজন হয়। এ সার উৎপাদনে নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়া বা অণুজীবের মিশ্রণ দরকার হয়। ফলে যাদের পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা আছে সেসব প্রতিষ্ঠানই কেবল উৎপাদন করতে পারবে। কৃষকের পক্ষে ল্যাব সুবিধা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।’
ব্রি সূত্রে জানা গেছে, সারটির বাণিজ্যিক উৎপাদনে আগ্রহী উপযুক্ত প্রতিষ্ঠান বাছাইয়ের জন্য গত জুনে দরপত্র আহ্বান করা হয়। এ প্রক্রিয়ায় দুটি প্রতিষ্ঠান আগ্রহ প্রকাশ করেছে। কৃষিসংশ্লিষ্ট পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি বিশেষজ্ঞ দল প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা ও কারিগরি বিষয় যাচাই করেছেন। প্রক্রিয়া শেষে এসিআইয়ের সঙ্গে বাণিজ্যিক উৎপাদনের জন্য প্রাথমিক চুক্তির পর একটি চূড়ান্ত প্রক্রিয়া চলমান। এ প্রক্রিয়া শেষ হলে শিগগিরই ব্রি অর্গানিক সার বাজারে পাওয়া যাবে।










