পুরান ঢাকার বড় মাঠগুলোর মধ্যে ধূপখোলা মাঠটি অন্যতম। সংস্কারের নামে আড়াই বছর ধরে বন্ধ মাঠটি। শিশু-কিশোররা খেলাধুলা থেকে বঞ্চিত হওয়ার পাশাপাশি এলাকাবাসীও ব্যবহার করতে পারছে না গণপরিসরটি। একদিকে মাঠ বন্ধ, অন্যদিকে মাঠের জায়গা দখল করে মার্কেট নির্মাণ করছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)। এ পরিস্থিতিতে মাঠটি দ্রুত ব্যবহার উপযোগী করে উন্মুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
বন্ধ হওয়ার আগে ৭ দশমিক ৪৭ একরের মাঠটি তিনটি ভাগে ছিল। জগন্নাথ কলেজ (বর্তমানে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়) মাঠ, ইস্ট অ্যান্ড ক্লাব খেলার মাঠ ও সবার জন্য উন্মুক্ত একটি মাঠ। তিনটি অংশের প্রত্যেকটি আকারে একটি ফুটবল মাঠের চেয়ে বড়। কিন্তু সিটি করপোরেশন পুরো মাঠটিকে একটি মাঠে রূপান্তর করে সংস্কারকাজ করছে। বর্তমানে মাঠের কাজ পুরোপুরি শেষ হলেও মার্কেট নির্মাণে দেরি হওয়ায় মাঠটি এখনো জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করছে না।
কাগজ-কলমে ধূপখোলা মাঠের নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে ২০২১ সালে মে মাসে। কাজ শেষ শেষ হওয়ার কথা ছিল ওই বছরের ডিসেম্বরে। এরপর গত বছরের জুনে মাঠটি প্রস্তুত করে উন্মুক্ত করার একটি উদ্যোগ নেয় ডিএসসিসি। কিন্তু সেটাও ব্যর্থ হয়। চলতি বছরের জুনেও মাঠটি উন্মুক্ত করা যাবে না বলে ডিএসসিসি সূত্র জানিয়েছে।
মাঠ উন্মুক্ত করতে দেরি হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে ডিএসসিসির এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, ‘মার্কেট নির্মাণে দেরি হচ্ছে, তাই মাঠটি উন্মুক্ত করা যাচ্ছে না। ঠিকাদার ঠিকমতো কাজ করছে না, তাই মার্কেট নির্মাণে দেরি হচ্ছে। তবে বেশি দেরি হলে মার্কেট এভাবে রেখেই মাঠ উন্মুক্ত করা হবে বলে কথা শোনা যাচ্ছে।’
মাঠটি বন্ধ আছে তিন বছরেরও বেশি সময় ধরে। এলাকাবাসীর সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, প্রায় সাড়ে তিন বছর ধরে মাঠে ঢোকা বন্ধ করে রেখেছে সিটি করপোরেশন। রিপন আহমেদ নামের এক স্থানীয় বাসিন্দা বলেন, ‘তিন বছর ধরে এ মাঠে আমরা কেউ ঢুকতে পারছি না। আমাদের শিশুদের খেলার কোনো বিকল্প জায়গায়ও নেই। সিটি করপোরেশন মাঠের নামে বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ করবে আর তার মাশুল দেবে আমাদের শিশু-কিশোররা না খেলে, এটা কোনো নিয়মের মধ্যে পড়ে, তা জানতে চাই। মাঠটি দ্রুত ব্যবহার উপযোগী করে আমাদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়ার দাবি জানাচ্ছি।’
সরেজমিন দেখা গেছে, ধূপখোলা মাঠের ভেতরে একটি মার্কেট তৈরির কাজ চলছে। ডিএসসিসির পরিকল্পনা অনুযায়ী, মাঠের চারপাশে থাকা ৩৯৪টি দোকানকে জায়গা করে দিতে কর্তৃপক্ষ একটি পঞ্চম তলা মার্কেট নির্মাণ করছে। এ মার্কেটের কারণে মাঠের মোট শূন্য দশমিক ৬২ শতাংশ জায়গা কমে গেছে।
এছাড়া সিটি করপোরেশন হাঁটার রাস্তা, বসার ব্যবস্থা, পার্কিং স্পেস ও একটি ক্যাফেটেরিয়া নির্মাণ করতে যাচ্ছে। মাঠে শিশুদের জন্য একটি আলাদা জোনও থাকবে। ফলে মাঠের জায়গা আরো কমবে। প্রকল্পের নথি অনুসারে, শিশুদের জোনের জন্য শূন্য দশমিক ৬ একর জায়গা লাগবে।
সংস্কারের নামে মাঠ দীর্ঘদিন বন্ধ রাখা এবং এলাকাবাসীর মাঠে বাণিজ্যিক অবকাঠোমো নির্মাণ পুরোপুরি বেআইনি বলে মন্তব্য করেছেন নগরবিদ ও স্থপতি ইকবাল হাবিব। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রথমত, গণপরিসর তথা মাঠ ও পার্কের মতো জায়গায় সিটি করপোরেশন কখনই বাণিজ্যিক ভবন বা কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে না। এটা মারাত্মক অন্যায়। এ অন্যায়ের সঙ্গে যারা জড়িত এখন পার পেয়ে গেলেও ভবিষ্যতে আইনের কাঠগড়ায় তাদের দাঁড়াতেই হবেই। দ্বিতীয়ত, সিটি করপোরেশনের তফশিলে স্পষ্ট বলা আছে, সেবা ছাড়া কোনো বাণিজ্যিক কার্যক্রম সিটি করপোরেশন পরিচালন করতে পারবে না। তার পরও ধূপখোলা মাঠে কীভাবে কার স্বার্থে মাঠের জায়গায় বাণিজ্যিক ভবন নির্মাণ হচ্ছে, সেটা আমাদের বোধগম্য নয়। এ ধরনের ভুল সিদ্ধান্ত থেকে সিটি করপোরেশন যত দ্রুত বেড়িয়ে আসবে ততই নগরবাসীর জন্য স্বস্তিদায়ক হবে বলে মনে করি।’
ডিএসসিসির প্রধান জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. আবু নাছেরকে একাধিকবার ফোন করলে তার মুঠোফোন বন্ধ পাওয়া যায়।










