প্রাথমিক শিক্ষায় গুণগত মানোন্নয়ন ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে ‘‌শিক্ষার্থী-কেন্দ্রিক শিক্ষা পদ্ধতি’ শীর্ষক জাতীয় মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। সোমবার (২৯ ডিসেম্বর) সকালে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের অডিটোরিয়ামে গণসাক্ষরতা অভিযান ও নেটজ বাংলাদেশ যৌথভাবে এ সভার আয়োজন করে।

সভায় শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষা পদ্ধতির বাস্তবায়ন, প্রাথমিক স্তরে ভর্তি ব্যবস্থার বিদ্যমান সীমাবদ্ধতা, লটারি পদ্ধতির প্রভাব, শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ, মানসম্মত শিক্ষা ও মূল্যায়ন, শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য উন্নয়ন এবং সব শিশুর জন্য ন্যায্য ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা নিশ্চিত করতে করণীয় বিষয়ে আলোকপাত করা হয়।

আয়োজকদের মতে, প্রাথমিক শিক্ষায় অগ্রগতি হলেও এখনো বেশ কিছু কাঠামোগত সংকট রয়ে গেছে। বিশেষ করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের গ্রেড পদ্ধতি না থাকা, ভর্তি প্রক্রিয়ায় ‘‌ক্যাচমেন্ট এরিয়া’-এর আওতাভুক্ত অনেক শিশু লটারিতে নির্বাচিত না হওয়ায় বিদ্যালয়ে ভর্তি হতে পারছে না, যা শিক্ষার সমতা ও শিশুর মৌলিক অধিকার বাস্তবায়নে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

গণসাক্ষরতা অভিযানের উপ-পরিচালক তপন কুমার দাশের সূচনা বক্তব্যের মাধ্যমে সভার কার্যক্রম শুরু হয়। এতে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইইআর-এর অধ্যাপক শাহ শামীম আহমেদ। তিনি নেটজ বাংলাদেশের স্বপ্ন প্রকল্পের আওতায় পরিচালিত গবেষণার প্রধান ফলাফল তুলে ধরে বলেন, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠ পরিকল্পনা থাকলেও দলগত কাজ, শিক্ষণ সহায়ক উপকরণের ব্যবহার, গঠনমূলক মূল্যায়ন এবং শিক্ষার্থীদের ব্যক্তিগত সহায়তার মতো শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষণ অনুশীলনের কার্যকর প্রয়োগ এখনো সীমিত—বিশেষ করে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে। তিনি আনন্দলোক মডেল স্কুলগুলোকে ভালো অনুশীলনের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন এবং শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষা জোরদারে ব্যবহারিক শিক্ষক নির্দেশনা, ধারাবাহিক প্রশিক্ষণ ও নীতিগত সহায়তার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।

অন্যান্য সংগঠনগুলোর উদ্যোগ ও অভিজ্ঞতা বিনিময় পর্বে ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচির জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা প্রফুল্ল চন্দ্র বর্মণ এবং রুম টু রিড-এর অ্যাডভোকেসি ও স্টেকহোল্ডার এনগেজমেন্ট ম্যানেজার হাফিজুর রহমান আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষণ পদ্ধতির প্রয়োগ, চ্যালেঞ্জ ও অর্জিত অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন।

গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে. চৌধুরীর সঞ্চালনায় উন্মুক্ত আলোচনা পর্বে নীতিগত সীমাবদ্ধতা, শিক্ষক সক্ষমতা উন্নয়ন, পাঠ্যক্রমের নমনীয়তা এবং শ্রেণিকক্ষভিত্তিক চর্চা নিয়ে আলোচনা হয়। এ পর্বে বক্তব্য দেন এশিয়া সাউথ প্যাসিফিক অ্যাসোসিয়েশন ফর বেসিক অ্যান্ড অ্যাডাল্ট এডুকেশনের ক্যাপাসিটি সাপোর্ট এডভাইজার কেএম এনামুল হক, টিচার্স ডেভেলপমেন্ট ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক নাজমুল হক, কুষ্টিয়ার খোকসা উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা খন্দকার শরিফুল ইসলাম, বাংলা ট্রিবিউনের বিশেষ সংবাদদাতা এস এম আব্বাস, বাংলাদেশ প্রাথমিক বিদ্যালয় সহকারী শিক্ষক সমিতির সহসভাপতি এনামুল হক, বাংলাদেশ প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় সমন্বয় পরিষদের সভাপতি মো. ইলিয়াস রাজ এবং ব্র্যাক-আইইডির সিনিয়র ম্যানেজার নাহিদ পারভীনসহ অন্যান্য অংশগ্রহণকারীরা।

অনুষ্ঠানে নির্ধারিত অতিথি বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন সাবেক প্রাথমিক ও উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা পরামর্শক কমিটির সদস্য চৌধুরী মুফাদ আহমেদ।

সম্মানিত অতিথির বক্তব্যে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আবু নূর মো. শামসুজ্জামান বলেন, শিক্ষক প্রশিক্ষণে মোটিভেশনের ঘাটতি চিহ্নিত করা হয়েছে এবং তা সমাধানে প্রশিক্ষণ মডিউল সংশোধন করা হচ্ছে। শিক্ষকদের জন্য প্রি-সার্ভিস ডিপ্লোমা এবং শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধে মিড-ডে মিল কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হয়েছে। তিনি আরো উল্লেখ করেন, সম্প্রতি প্রধান শিক্ষকদের ১০ম গ্রেডে উন্নীত করা হয়েছে এবং সহকারী প্রাথমিক শিক্ষকদের ক্ষেত্রেও শিগগিরই ইতিবাচক অগ্রগতি প্রত্যাশা করা হচ্ছে। অভিভাবকদের সম্পৃক্ততার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, মানসম্মত প্রাথমিক শিক্ষা নিশ্চিত করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়; এ ক্ষেত্রে সরকারি-বেসরকারি সংস্থা ও নাগরিক সমাজের সম্মিলিত উদ্যোগ অপরিহার্য।

সভায় সভাপতিত্ব ও সঞ্চালনা করেন গণসাক্ষরতা অভিযানের নির্বাহী পরিচালক রাশেদা কে চৌধুরী। সভা শেষে নেটজ বাংলাদেশের প্রোগ্রাম ম্যানেজার ও ম্যানেজমেন্ট টিম মেম্বার আফসানা বিনতে আমিন ধন্যবাদ জ্ঞাপন করেন।

সভায় গণসাক্ষরতা অভিযানের কাউন্সিল (বোর্ড) সদস্য, অ্যাডুকেশন ওয়াচের সদস্য, এনজিও প্রতিনিধি, শিক্ষক সংগঠনের প্রতিনিধি, শিক্ষা গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ঊর্ধ্বতন প্রতিনিধিরা অংশ নেন।