২০২২ সালের বন্যায় ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সিলেট-ছাতক রেলপথ। এর পর থেকে পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে ৩৪ কিলোমিটার রেলপথটি। চলতি বছর ২ জানুয়ারি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় ক্ষতিগ্রস্ত মিটার গেজ ট্র্যাক সংস্কারের অনুমোদন দেয়া হয়। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ১৯৯ কোটি ৯৩ লাখ ৮৮ হাজার ৫৪৫ টাকা। ১৮ মাসের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। তবে দীর্ঘ চার বছর বন্ধ থাকার পর কাজ শুরু হলেও চলছে ধীরগতিতে। এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন এলাকাবাসী।

তবে তাদের প্রত্যাশা, শিগগিরই আবারো ছুটবে ট্রেন, বাজবে হুইসেল। অন্যদিকে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও রেল কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, বৃষ্টিপাতের কারণে কাজ কিছুটা বিঘ্নিত হলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ করা যাবে।

এ বিষয়ে নাম অপ্রকাশ রাখার শর্তে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মীর আক্তার হোসেন লিমিটেডের এক কর্মচারী জানান, ২০২৬ সালের মাঝামাঝি সময়ে সংস্কারকাজ শেষ করার কথা। বৃষ্টিপাতের কারণে কিছুদিন কাজে বিঘ্ন ঘটেছে। তবে এবার দ্রুত কাজ এগিয়ে চলছে। নির্ধারিত সময়ের আগে কাজ শেষ হবে।

১৯৫৪ সালে সিলেট রেলওয়ে স্টেশন থেকে পশ্চিম-উত্তরে সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক উপজেলার ছাতক বাজার রেলওয়ে স্টেশন পর্যন্ত ৩৫ কিলোমিটার রেলপথ নির্মাণ করা হয়। ওই সময় এ রেলপথের সর্বশেষ স্টেশন হিসেবে ছাতক বাজার রেলওয়ে স্টেশন নির্মাণ করা হয়। এর আগে এটি ছিল আখাউড়া-কুলাউড়া-সিলেট পর্যন্ত সীমাবদ্ধ। ১৯৭৯ সালে রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের রাজস্ব আয়ে ছাতক বাজার স্টেশন শ্রেষ্ঠত্বের স্থান দখলে করে নেয়। প্রতিদিনই এ পথে তিনটি ট্রেন যাতায়াত করত। মাঝে নানা অজুহাত দেখিয়ে কমিয়ে দেয়া হয় ট্রেন ও বগি সংখ্যা। ট্রেনে করে প্রায় ৪৫ মিনিটে ছাতক থেকে সিলেট পৌঁছানো যায়। সিলেট-ছাতক রেলপথের ট্রেন খাজাঞ্চীগাঁও, সৎপুর ও আফজালাবাদ স্টেশনে যাত্রাবিরতি দেয়। ছাতক, সিলেটের সৎপুর ও খাজাঞ্চীগাঁও এলাকার কয়েক হাজার মানুষের সিলেট শহর ও দেশের অন্যান্য অঞ্চলে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম ছিল এ রেলপথ। শিল্প শহর ছাতক থেকে চুনাপাথর, সিমেন্ট, স্লিপার, বালি, বোল্ডার পাথরসহ মালপত্র দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করতে এ রেলপথে সড়কপথের চেয়ে পরিবহন খরচ কয়েক গুণ কম। এজন্য এ রেলপথ দিয়ে পণ্য পরিবহনে আগ্রহী ছিলেন ব্যবসায়ীরা।

যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রেও জনপ্রিয় ছিল এ রেলপথ। সিলেট থেকে ছাতকে রেলপথের দূরত্ব ৩৫ কিলোমিটারের ভাড়া মাত্র ১০ টাকা। ট্রেনের ভাড়া ১০ টাকার বিপরীতে বাসের ভাড়া বর্তমানে ৬০ টাকা ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়া ৮০-১০০ টাকা।

ছাতক প্রেস ক্লাবের সভাপতি সৈয়দ হারুন অর রশীদ বলেন, ‘সিলেট বিভাগের শিল্পাঞ্চল ছাতক, যেখানে রেললাইন স্থাপন করা হয়েছিল যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন আর পণ্য পরিবহনের জন্য। বালি, পাথর, সিমেন্টসহ নির্মাণসামগ্রী বহন হতো এ রুটে। রেল চলাচল বন্ধ থাকায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ব্যবসা-বাণিজ্যও। পরিকল্পিতভাবে রেললাইন বন্ধ করে দেয়া হয়। আমরা মনে করছি, রেললাইন উন্নত হলে এ অঞ্চলের ব্যবসা-বাণিজ্যও আরো প্রসারিত হবে।’

স্থানীয় বাসিন্দা মনির হোসেন বলেন, ‘বন্যায় রেলপথ বিধ্বস্ত হওয়ায় ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। দীর্ঘদিন ধরে রেলপথ বন্ধ থাকার পর কাজ শুরু হওয়ায় তাদের মধ্যে আবারো আশা জাগ্রত হয়েছে।’

রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, রেলপথ সংস্কারকাজ শুরু করার জন্য নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (এনওএ) পায় পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্ত প্রকৌশল খাতের কোম্পানি মীর আকতার হোসেন লিমিটেড। এর আগে চলতি বছরের ২ জানুয়ারি সরকারি ক্রয়সংক্রান্ত উপদেষ্টা পরিষদ কমিটির সভায় ক্ষতিগ্রস্ত মিটার গেজ ট্র্যাক সংস্কারের অনুমোদন করা হয়। গত ৩ ফেব্রুয়ারি এ বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষর হয়। ১৮ মাসের মধ্যে প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার কথা। যেখানে রেলাইন সংস্কারসহ স্টেশনের আধুনিকায়নসহ রাখা বিভিন্ন সুযোগ সুবিধা প্রকল্পে রাখা হয়।

অন্যদিকে রেললাইন সংস্কারকাজের শুরু থেকে ধীরগতিতে কাজ চলছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। এ অবস্থায় নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ করা নিয়েও সংশয় রয়েছে তাদের মধ্যে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের নির্বাহী প্রকৌশলী (ছাতক বাজার) আহসান হাবিব বলেন, ‘কাজের অগ্রগতি সন্তোষজনক। আশা করছি শিগগিরই এই রুটে ট্রেন চলাচল শুরু হবে। নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই কাজ শেষ করতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে তাগিদ দেয়া হচ্ছে।’

সার্বিক বিষয়ে সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা চাইব সংস্কার কাজটি গুণগত মান বজায় রেখে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে শেষ হবে। কেননা রেললাইনের কাজ বারবার হয় না। বিষয়টি আমরা তদারকির মধ্যে রেখেছি। রেললাইন পুনঃস্থাপনের কাজ সুনামগঞ্জবাসীকে আশান্বিত করেছে।’