রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদ ওরফে সাহেদ করিমের নামসর্বস্ব ১৩ প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাবে গত পাঁচ বছরে জমা হয়েছে শতকোটি টাকা। এর মধ্যে ২২ ফেব্রুয়ারি তার মালিকানাধীন ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস কোম্পানির নামে খোলা হয় নতুন একটি ব্যাংক হিসাব। এতে ১ মার্চ থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত জমা হয়েছে ৩ কোটি টাকা, যার বড় অংশই নগদে। তদন্তকারী সংস্থাগুলোর ধারণা ভুয়া কভিড পরীক্ষার মাধ্যমে আয় করা অর্থ দৈনিক ভিত্তিতে এ ব্যাংক হিসাবে জমা করেছেন সাহেদ।

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাহেদের নামে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে নয়টি ব্যাংকে হিসাব রয়েছে। তার স্ত্রীর নামেও রয়েছে আরো একটি ব্যাংক হিসাব। এর বাইরে নামসর্বস্ব ১৩টি প্রতিষ্ঠান ও রিজেন্ট হাসপাতালের নামে ব্যাংক হিসাব খুলেছেন সাহেদ। এসব ব্যাংক হিসাবে জুলাই পর্যন্ত জমা হয়েছে ৯১ কোটি টাকা। ২০০৪ সাল থেকে ব্যাংকিং চ্যানেলে সাহেদের লেনদেন শুরু হলেও এ অর্থের সিংহভাগই জমা হয়েছে ২০১৫ সাল-পরবর্তী সময়ে।

তদন্ত সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, রিজেন্ট ডিসকভারি ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস লিমিটেডের নামে গত ২২ ফেব্রুয়ারি মিউচুয়াল ট্রাস্ট ব্যাংকে (এমটিবি) হিসাব খোলা হয়। কোনো কার্যক্রম না থাকলেও এ প্রতিষ্ঠানের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবে গত ১ মার্চ থেকে ৭ জুলাই পর্যন্ত জমা হয়েছে ৩ কোটি ১১ লাখ টাকা। এর মধ্যে তিনটি চেকে ৬০ লাখ টাকা জমা হয়েছে। এছাড়া নিয়মিত নগদ টাকা জমা দেয়া হয়েছে ব্যাংক হিসাবটিতে।

করোনা মহামারীর মধ্যে মার্চ থেকে কভিড পরীক্ষার অনুমতি পায় সাহেদের মালিকানাধীন রিজেন্ট হাসপাতাল। তিন মাস কার্যক্রম পরিচালনার পর নমুনা পরীক্ষা ছাড়াই কভিডের রিপোর্ট তৈরির বিষয়টি ধরা পড়ে র্যাবের অভিযানে। এ সময়ের মধ্যে কভিড পরীক্ষার ভুয়া রিপোর্ট তৈরির মাধ্যমে হাসপাতালটির আয় হওয়া নগদ অর্থ রিজেন্ট ডিসকভারি ট্যুর অ্যান্ড ট্রাভেলস লিমিটেডের নামে খোলা ব্যাংক হিসাবে জমা করা হয়েছে।

তদন্তকারী সংস্থার সূত্রে জানা গেছে, সাহেদের মালিকানাধীন রিজেন্ট হাসপাতাল লিমিটেডের নামে সর্বমোট ১২টি ব্যাংক হিসাব রয়েছে। এর সব হিসাবই বেসরকারি ব্যাংক এনআরবিতে। এছাড়া নামসর্বস্ব মুনলাইট রিসোর্ট লিমিটেডের নামে ব্যাংক হিসাব রয়েছে ব্র্যাক ব্যাংকে। আরএস শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং কোম্পানির নামের ব্যাংক হিসাব রয়েছে এমটিবিতে। আরএস ট্রেডিংয়ের নামে হিসাব রয়েছে ট্রাস্ট ব্যাংকে। রিজেন্ট আর্কিটেক্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট প্রতিষ্ঠানের নামে হিসাব রয়েছে প্রিমিয়ার ব্যাংকে। একই ব্যাংকে হিসাব রয়েছে সাহেদের মালিকানাধীন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান অ্যালবার্ট গ্লোবাল লিমিটেডের নামে। মাল্টিপোল ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেডের নামে হিসাব রয়েছে ট্রাস্ট ব্যাংকে। ঢাকা সেন্ট্রাল কলেজের নামে হিসাব রয়েছে শাহজালাল ইসলামী ব্যাংকে। একই ব্যাংকে হিসাব রয়েছে এআরবিআইএস মেডিকেল ইকুইপমেন্ট নামে সাহেদের মালিকানাধীন নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানের। এছাড়া ফোর স্টোর ইন্টারন্যাশনালের হিসাব রয়েছে ডাচ্-বাংলা ব্যাংক লিমিটেডে। কর্মমুখী কর্মসংস্থান সোসাইটির হিসাব রয়েছে ইউসিবিএলে। একই ব্যাংকে হিসাব রয়েছে সাহেদের মালিকানাধীন রিজেন্ট কেসিএস লিমিটেডের।

কভিড টেস্ট না করে সার্টিফিকেট প্রদানসহ বিভিন্ন জালিয়াতি ও প্রতারণার দায়ে অভিযুক্ত রিজেন্ট গ্রুপের চেয়ারম্যান সাহেদের অন্যতম সহযোগী রিজেন্ট গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাসুদ পারভেজ। গত ১৩ জুলাই গাজীপুরের কাপাসিয়া থেকে তাকে গ্রেফতার করে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)। সাহেদের মতো মাসুদ পারভেজেরও রয়েছে নামসর্বস্ব প্রতিষ্ঠান। তার মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের নাম প্রাইম ট্রেডিং করপোরেশনের একটি ব্যাংক হিসাবে গত জুলাই পর্যন্ত জমা হয়েছে ৩ কোটি টাকা।

র্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক আশিক বিল্লাহ বণিক বার্তাকে বলেন, সাহেদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলার তদন্ত শুরু করার পর তদন্তকারী কর্মকর্তা মনে করেছেন তার অপরাধলব্ধ আয়ের মাধ্যমে গড়ে তোলা সম্পদের বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া প্রয়োজন। সে অনুযায়ী বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে দাপ্তরিকভাবে চিঠি দেয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে তারা কাজ করছেন।

নভেল করোনাভাইরাসের সনদ জালিয়াতির অভিযোগের সত্যতা পেয়ে গত ৬ জুলাই র্যাব উত্তরার রিজেন্ট হাসপাতালে অভিযান চালায়। এ ঘটনায় সাহেদকে আসামি করে মামলাও দায়ের করে সংস্থাটি। এর প্রায় নয়দিন আত্মগোপনে থাকার পর সাতক্ষীরার সীমান্তবর্তী এলাকা থেকে সাহেদকে গ্রেফতার করে তদন্ত শুরু করে র্যাব। আর আর্থিক অপরাধসংক্রান্ত অভিযোগগুলো অনুসন্ধানের জন্য পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগকে (সিআইডি) চিঠি পাঠায় র্যাব।

সাহেদের অপরাধলব্ধ আয়ের সন্ধান পেতে কাজ করছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ সিআইডি। বিভাগটির উপমহাপরিদর্শক ইমতিয়াজ আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, সাহেদের অপরাধলব্ধ আয়ের বিষয়ে এরই মধ্যে অনুসন্ধান শুরু করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে চিঠি পাঠিয়ে তথ্য চাওয়া হয়েছে। তথ্যগুলো পাওয়ার পর তা পর্যালোচনা করে সাহেদের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা দায়েরের জন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হবে।