দেশের যে কয়টি জেলায় অধিক আলু চাষ হয় তার মধ্যে অন্যতম মুন্সিগঞ্জ। এখান থেকে ফরিদপুর, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ভোলা, বরিশাল, খুলনাসহ বিভিন্ন স্থানের ব্যবসায়ীরা খুচরা বাজারে বিক্রির জন্য আলু কিনে নিয়ে যান। জেলা কৃষি অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, মুন্সিগঞ্জে ডায়মন্ড, কার্ডিনাল, এস্টারিকসসহ ১০ জাতের আলুর চাষ হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় চলতি মৌসুমে আলুর উচ্চ ফলন হয়েছে। তবুও চিন্তার ভাঁজ কৃষকের কপালে। কারণ হিসেবে তারা বলছেন, অন্য বছরের তুলনায় এবার উৎপাদন খরচ বেড়েছে। তবে সে তুলনায় বাজারে দাম কম। হিমাগারেও ভাড়া বাড়ানো হয়েছে। বাজার দাম না বাড়লে লোকসানের শঙ্কা থেকেই যাচ্ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি রবি মৌসুমে জেলার ছয়টি উপজেলায় আলু আবাদের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছিল ৩৪ হাজার ৩৫৫ হেক্টর জমিতে। তবে আবাদ হয়েছে ৩৪ হাজার ৭৫৮ হেক্টরে। আর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয় ১০ লাখ ৩৬ হাজার ২৫০ টন। যদিও প্রকৃত উৎপাদন ১২ লাখ টন ছাড়িয়ে যাবে বলে ধারণা সংশ্লিষ্টদের।
চাষীরা বলছেন, অনুকূল আবহাওয়া ও পোকার সংক্রমণ ছিল না এবার। সর্বোপরি বড় ধরনের কোনো প্রাকৃতিক বিপর্যয় না হওয়ায় এ বছর আলুর ফলন ও গুণগত মান বৃদ্ধিতে সহায়ক হয়েছে। কৃষক, আলু ব্যবসায়ী, হিমাগার মালিক-শ্রমিকরা আলু তোলা ও সংরক্ষণে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন। বিগত বছরগুলোয় ভালো দাম পাওয়ায় কৃষক এবার আলু চাষে বেশি আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এ কারণে এবার জমির ভাড়া, বীজ আলুর দাম, শ্রমিকের মজুরিও অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। এছাড়া সময়মতো বৃষ্টি না হওয়ায় সেচ দিতে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। তবে সে তুলনায় বাড়েনি বাজার দাম। এর ফলে ভালো ফলন হলেও লোকসানের আশঙ্কা রয়েছে। এ বছর আলু সংরক্ষণে হিমাগার ভাড়াও বেশি গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। এতে প্রান্তিক কৃষক আলু সংরক্ষণ নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন। নিরুপায় অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে আলু বিক্রি করে দিচ্ছেন।
মুন্সিগঞ্জের কয়েকটি বাজার ঘুরে দেখা গেছে, ৫০ কেজি ওজনের এক বস্তা আলু কৃষকের কাছ থেকে ব্যবসায়ীরা কিনছেন ৮০০ টাকা দিয়ে। তবে কৃষকরা বলছেন, ৫০ কেজি আলু উৎপাদনে তাদের ব্যয় হয়েছে ১২০০-১৪০০ টাকা। সে হিসাবে প্রতি কেজি আলু উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে সর্বনিম্ন ২৪ টাকা। অথচ কৃষক পর্যায়ে বিক্রি হচ্ছে ১৬ টাকা।
সিরাজদিখান উপজেলার মালখানগর এলাকার আলুচাষী খালেক মিয়া জানান, ব্যবসায়ীরা ৫০ কেজির এক বস্তা আলুর দাম দিচ্ছে ৮০০ টাকা। ১০০ বস্তা আলুর দাম বলছে ৯২ হাজার টাকা। অথচ ১০০ বস্তা আলু উৎপাদনে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার টাকা। প্রতি কেজি আলুতে পাঁচ থেকে সাত টাকা লোকসান গুনতে হচ্ছে কৃষকদের। এ বছর ডায়ামন্ড জাতের বীজ আলুর বাক্স (৫০ কেজি) ব্যবসায়ীরা ৬ হাজার টাকা, ক্ষেত্র বিশেষ ৩৩ হাজার টাকায় কিনতে বাধ্য করেছেন। বীজ আলু ব্যবসায়ীরা কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন।
একই উপজেলার সেলিম মিয়া বলেন, ‘গত বছর শ্রমিকের মজুরি তিন বেলা খাওয়াসহ ৬০০ টাকা ছিল। এ বছর ৭০০ টাকা দিতে হচ্ছে। এছাড়া জমির ভাড়া প্রতি শতাংশ ২০০ টাকা হলেও এ বছর তা ৮০০ টাকা দিতে হয়েছে। এছাড়া আলু সংরক্ষণে হিমাগারের ভাড়াও বাড়ানো হয়েছে। প্রভাবশালী ও মধ্যস্বত্বভোগীরা হিমাগার অগ্রিম ভাড়া নেয়ায় প্রান্তিক চাষীরা বিপাকে পড়েছেন।’
জেলার ৬৪টি হিমাগারের মধ্যে ৫৮টি সচল রয়েছে। এসব হিমাগারে প্রায় ৫ লাখ ৪০ হাজার ৭৬০ টন আলু সংরক্ষণের সুযোগ রয়েছে। সদর উপজেলার মুক্তারপুরের কদম রসুল কোল্ড স্টোরেজের মালিক দুলাল মণ্ডল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আগে যা ভাড়া রাখতাম তার চেয়ে খরচ অনেকটা বেড়েছে। তাই হিমাগারের ভাড়া বাড়ানো হয়েছে।’ তবে কত টাকা নেয়া হচ্ছে তা বলতে রাজি হননি তিনি।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিপ্লব কুমার মোহন্ত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এ অঞ্চলে প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সার প্রয়োগে উৎপাদন খরচ বাড়ছে। আলুর বাজার স্থিতিশীল রাখতে সরকারিভাবে কেনার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। এছাড়া বীজ আলু ও খাবার আলু আলাদাভাবে সংরক্ষণের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।’
অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘বীজ আলু ব্যবসায়ীদের লাগামহীন দাম নিয়ন্ত্রণে আগামী বছর থেকে আমদানীকৃত বীজের বাক্সে প্রকৃত দাম উল্লেখ করার ব্যবস্থা রাখা হবে। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করা হয়েছে।’










