সরকারি হিসাব মতে, সিলেট জেলায় মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ৭ শতাংশ প্রতিবন্ধী। এর মধ্যে শুধু বিশ্বনাথ উপজেলায় এর হার ২ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০১৯ সালে বিষয়টি প্রকাশ পাওয়ার পর তোলপাড় শুরু হয়েছিল সারা দেশে। এ উপজেলা প্রবাসী অধ্যুষিত হওয়ায় আলোচিত হয়েছিল দেশ-বিদেশে। এ অবস্থায় সরকারও বেশ গুরুত্ব দিয়ে উপজেলার আমতৈল গ্রামে একটি বিশেষায়িত কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের উদ্যোগ নেয়। এলাকাবাসী বিশেষায়িত কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনে ভূমিও দান করেছেন দুই বছর আগে। তবে সেই ভূমিতে এখনো শুরু হয়নি কাঙ্ক্ষিত ক্লিনিক স্থাপনের কাজ।
বিশ্বনাথ উপজেলা সমাজসেবা অফিস সূত্র জানায়, এ উপজেলায় তিন হাজারের মতো প্রতিবন্ধী রয়েছেন। রামপাশা ইউনিয়নের আমতৈল গ্রামের তিনটি ওয়ার্ডে সব মিলিয়ে রয়েছেন ২৩৩ প্রতিবন্ধী। সিলেটে মোট জনসংখ্যার ১ দশমিক ৭ শতাংশ প্রতিবন্ধী হলেও বিশ্বনাথে এ হার হচ্ছে ২ দশমিক ৩ থেকে ২ দশমিক ৪ শতাংশ। সর্বশেষ জরিপ হয় ২০১৯ সালে। এর পর থেকে জরিপ না হলেও অনেকেই নিজ উদ্যোগে অফিসে এসে প্রতিবন্ধীদের তালিকাভুক্ত করছেন।
উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. আশরাফুল ইসলাম বলেন, স্বাস্থ্য সম্পর্কে অসচেতনতা, আত্মীয়ের বাইরে বিয়ে না হওয়া এবং প্রসবকালীন পরিচর্যার অভাবে এ গ্রামে এত বেশিসংখ্যক প্রতিবন্ধী। তিনি বলেন, এ গ্রামের বাসিন্দারা জেলে সম্প্রদায়ের। ফলে তাদের বিয়েশাদী হয় নিজেদের গোত্রের মধ্যে। জেনেটিক কারণে গ্রামের অনেকে প্রতিবন্ধিত্বের শিকার হচ্ছে বলে মন্তব্য করেন তিনি। ২০১৯ সালে সর্বশেষ জরিপ হলেও এখনো নিবন্ধন অব্যাহত রয়েছে। সর্বশেষ আমতৈল গ্রামে ২৩৩ জন প্রতিবন্ধী সুবিধাভোগী রয়েছেন।
আমতৈল গ্রামের বাসিন্দা ও রামপাশা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন জানান, তার ইউনিয়নের তিনটি ওয়ার্ড নিয়ে বৃহত্তর আমতৈলের অবস্থান। ওয়ার্ডে লোকজন এক পঞ্চায়েত হিসেবেই বসবাস করে। তিনটি কারণে ওই গ্রামে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা বেশি বলে জানান তিনি। দাইকে দিয়ে প্রসব করানো, নিজেদের গোত্রের মধ্যে বিয়েশাদী এবং ঘনবসতির কারণে ওই গ্রামে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা বাড়ছে।
চেয়ারম্যান আলমগীর হোসেন আরো জানান, স্বাস্থ্য বিভাগের উদ্যোগে গ্রামে একটি স্পেশালাইজড কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের জন্য ১০০ শতক জমি এরই মধ্যে অধিগ্রহণ করা হয়েছে। দুই বছর আগে এলাকাবাসী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের জন্য ভূমি দান করেছে কিন্তু কাজ এখনো শুরু হয়নি। সম্প্রতি ১০টি প্রতিবন্ধী পরিবারকে পুনর্বাসনে জায়গা নির্বাচন করা হয়েছে বলে জানান চেয়ারম্যান।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ওই গ্রামে কেউ শ্রবণ, কেউ বাক, কেউ দৃষ্টি, কেউবা শারীরিক প্রতিবন্ধী। অভাবের তাড়নায় পরিবারগুলো প্রতিবন্ধী এসব শিশুর ন্যূনতম দাবিটুকু পূরণ করতে পারে না। চিকিৎসা তো দূরের কথা, ঠিকমতো দুই বেলা-দুমুঠো ভাতও জোটে না অনেক প্রতিবন্ধীর।
আমতৈল গ্রামের বাসিন্দা সুফিয়া বেগম জানান, তাদের পাঁচটি শিশুর মধ্যে একটি শিশু শ্রবণ প্রতিবন্ধী। শিশুটি মুখে কথা বলতে পারে না। জানালেন, ডেলিভারির সময় শিশুটি সামান্য কেঁদেছিল। এরপর তারা তাকে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যান। চিকিৎসক জানান, বড় হলে সব ঠিক হয়ে যাবে, কিন্তু শিশুটি বড় হওয়ার পর থেকে আর কথা বলতে পারে না।
সিলেট বিভাগীয় সমাজসেবা কর্মকর্তা নিবাস রঞ্জন দাস জানান, আমতৈলের প্রতিবন্ধীদের নিয়ে আলাদা একটি প্রকল্প চালু করার বিষয়ে তারা চিন্তা-ভাবনা করছেন। আমতৈলে সব প্রতিবন্ধী ভাতার আওতায় রয়েছে। তাদের মাসে ৭৫০ টাকা করে ভাতা দেয়া হচ্ছে। তাদেরকে তিন মাসের ভাতা একসঙ্গে ২ হাজার ২৫০ টাকা করে দেয়া হচ্ছে।
সিলেটের ভারপ্রাপ্ত সিভিল সার্জন ডা. জন্মেজয় দত্ত জানান, বিশ্বনাথের বৃহত্তর আমতৈল গ্রামে একটি স্পেশালাইজড (বিশেষায়িত) কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের প্রস্তাব স্বাস্থ্য অধিদপ্তরে পাঠানো হয়েছে। সে লক্ষ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি টিম গত নভেম্বরে এলাকাটি ঘুরে গেছে। কমিউনিটি ক্লিনিক ট্রাস্ট থেকে প্রস্তাবনাটি পাস হওয়ার পর সেখানে কমিউনিটি ক্লিনিক স্থাপনের প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে জানা গেছে।
সিলেট বিভাগীয় পরিচালক (স্বাস্থ্য) ডা. হিমাংশু লাল রায় জানান, বিশ্বনাথের প্রতিবন্ধী গ্রামে নিয়মিত মেডিকেল ক্যাম্প করতে উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। স্বাস্থ্য বিভাগ এ বিষয়ে অবহিত জানিয়ে তিনি বলেন, ওই গ্রামে অধিকসংখ্যক প্রতিবন্ধী হওয়ার পেছনের কারণ বের করতে ওসমানী মেডিকেল কলেজের নিউরোমেডিসিন ও পেডিয়াট্রিক মেডিসিন বিভাগ কাজ করছে।










