সাম্প্রতিক বন্যায় সিলেটের পর্যটন খাতে বড় ধরনের ধাক্কা লেগেছে। ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এ শিল্পের। ভাটা পড়েছে পর্যটকের উৎসাহে। হোটেল-মোটেল ব্যবসাও ভালো হয়নি। বন্যার পানি নেমে গেলেও এখনো পর্যটকের সমাগম ঘটেনি। সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, পর্যটক বরণে প্রস্তুত পর্যটন কেন্দ্রগুলো। সেই সঙ্গে বন্যার ধাক্কা সামলে ঘুরে দাঁড়ানোর অপেক্ষায় পর্যটনসংশ্লিষ্টরা।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি সিলেট। চা বাগান, জলমগ্ন বুনো বন, পাথুরে নদী, পাহাড়ের কোল থেকে নেমে আসা ঝরনা, দিগন্ত বিস্তৃত নীল জলরাশি হাওরসহ সিলেট বিভাগজুড়ে রয়েছে দৃষ্টিনন্দন সব পর্যটনকেন্দ্র। প্রকৃতিকে কাছে থেকে দেখার মতো রয়েছে অনেক পর্যটন স্পট। পর্যটনের ভরা মৌসুমে সিলেটে বাগড়া দিয়েছে বন্যা। এ বন্যার ধকল কাটিয়ে এখনো স্বাভাবিক হতে পারেননি বানভাসিরা। ফলে পর্যটনকেন্দ্রগুলোও এখনো মুখর হয়ে ওঠেনি।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের দেয়া তথ্য মতে, সিলেটের ১৩ উপজেলার মধ্যে ১১টি বন্যাকবলিত হয়েছে। এসব উপজেলার ৯০টি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়। এ বন্যা স্থায়ী ছিল ১১-২২ মে পর্যন্ত। এতে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হয় সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলো। কানাইঘাট, গোয়াইনঘাট, জকিগঞ্জ, কোম্পানীগঞ্জ উপজেলার পুরোটাই বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। মূলত এ উপজেলাগুলোতেই রয়েছে সিলেটের আকর্ষণীয় সব পর্যটনকেন্দ্র। পাথর কোয়ারিনির্ভর এসব এলাকায় কোয়ারিতে পাথর উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। ফলে খেটে খাওয়া লোকজন পর্যটন খাত ঘিরে নানা পেশায় নিয়োজিত ছিলেন। বন্যা এসে যেন সবকিছু বদলে দিয়েছে।

সিলেটের অন্যতম পাথর কোয়ারি রয়েছে কোম্পানীগঞ্জে। সেখানে পাথর উত্তোলন বন্ধ করে দিয়ে মেঘালয় রাজ্যঘেঁষা সাদা পাথর নামক জায়গাকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে। প্রতিদিন হাজার হাজার মানুষ যেখানে বিনোদনের উদ্দেশ্যে ভিড় জমায়, বন্যা-পরবর্তী সাড়া নেই সেখানে।

কোম্পানীগঞ্জ ট্যুরিস্ট ক্লাবের সভাপতি আবিদুর রহমান জানান, বন্যা পর্যটনের অনেক ক্ষতি করেছে। পানি নেমে গেছে কিন্তু পর্যটকের দেখা মিলছে না। দোকানপাট গুছিয়ে পর্যটকের অপেক্ষায় এখানকার ব্যবসায়ীরা। বিশেষ করে বন্যার পরে শুক্রবার ও শনিবার দুই ছুটির দিন গেলেও পর্যটক নেই বললেই চলে। এতে ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে। উপজেলা প্রশাসন, ট্যুরিস্ট পুলিশ সবাই প্রস্তুত পর্যটকবরণে। 

ঈদের ছুটিতে জাফলংয়ে পর্যটকদের সঙ্গে ঘটে যাওয়া অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই বন্যা হানা দেয়। জাফলং পর্যটনকেন্দ্র ঘিরে পরিচালিত ব্যবসা বাণিজ্যে ভাটা পড়েছে। জাফলং ও লালখাল হয়ে পড়েছে পর্যটকশূন্য। বর্তমানে বন্যার পানি কমলেও পর্যটক উপস্থিতি বাড়ছে না। পাংথুমাই ঝরনা দেখতেও পর্যটকের আগের আনাগোনা নেই।

জাফলংয়ের মামার দোকানের ব্যবসায়ী আব্দুর রকিব বলেন, তারা অলস সময় পার করছেন। ঈদ-পরবর্তী প্রতিদিন গড়ে ৫০ হাজারেরও অধিক পর্যটকের সমাগম ঘটেছিল। বন্যার কারণে প্রায় ১৫ দিন পর্যটকের আগমন নেই বললেই চলে। এতে তাদের বেশ ক্ষতি হয়েছে।

সীমান্তবর্তী অন্য উপজেলা কানাইঘাটের লোভাছড়া একটি সম্ভাবনাময় পর্যটন কেন্দ্র। কানাইঘাটের নিম্নাঞ্চল এখনো প্লাবিত রয়েছে। বন্যার ক্ষত এখনো শুকায়নি। সেখানেও পর্যটক নেই।

সিলেট নগরীঘেঁষা পর্যটন কেন্দ্র এশিয়ার অন্যতম জলাবন রাতারগুল। ভরা মৌসুম হলেও এখনো পর্যটকের আনাগোনা বাড়েনি। শুধু রাতারগুলো নয় বন্যার কারণে পুরো পর্যটন খাতে স্থবিরতা দেখা দিয়েছে।

বন্যায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে হোটেল-মোটেলের। সিলেটে ঘুরতে আসতে অনেকে আগে থেকে হোটেল-মোটেল বুকিং দিয়ে রেখেছিলেন। বন্যার কারণে তা বাতিল করেন পর্যটকরা।

এফবিবিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক ও সিলেট চেম্বারের সাবেক সভাপতি খন্দকার সিপার আহমদ বলেন, সিলেটে রাতারগুল, হাওর-বাঁওড়, জাফলং, সাদাপাথর ঘুরে বেড়ানোর ভরা মৌসুম চলছে। চলমান বন্যার কারণে আমাদের পর্যটন খাতের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এমনিতেই করোনার কারণে গত দুই বছরে সিলেট অঞ্চলের পর্যটন খাত অনেক পিছিয়ে পড়েছে। আবারো ধাক্কা খেল গুরুত্বপূর্ণ এ খাত।

সিলেট ট্যুরিজম ক্লাবের সভাপতি হুমায়ুন কবীর লিটন বলেন. বন্যায় পর্যটনের অনেক ক্ষতি হয়েছে। অথচ পর্যটনের সঙ্গে জড়িত ক্ষতিগ্রস্তদের কোনো তালিকা করা হয়নি। তাদের সহায়তায় কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। তার মতে, অন্তত পর্যটনসংশ্লিষ্ট নিম্ন আয়ের মানুষের পাশে প্রশাসনের দাঁড়ানো প্রয়োজন।

সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবর রহমান বলেন, চলমান বন্যার কারণে শিল্প-বাণিজ্যের সব খাত কোনো না কোনোভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এখন বন্যার্তদের পাশে দাঁড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, পর্যটনসমৃদ্ধ উপজেলাগুলোর নির্বাহী কর্মকর্তাদের পর্যটকবরণের প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে নির্দেশ দেয়া হয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে পর্যটন কেন্দ্রগুলো আবার মুখর হয়ে উঠবে।