সরকার হিমাগারের গেটে আলুর ন্যূনতম মূল্য কেজিপ্রতি ২২ টাকা নির্ধারণ করলেও রংপুরে তার কোনো প্রভাব পড়েনি। বরং ব্যাপক উৎপাদনের জন্য খ্যাত এ জেলার বাজারে আলু বিক্রি হচ্ছে নির্ধারিত মূল্যের প্রায় অর্ধেকে। গত ২৭ আগস্ট কৃষি মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে হিমাগারের গেটে আলুর সর্বনিম্ন মূল্য কেজিপ্রতি ২২ টাকা নির্ধারণ এবং ৫০ হাজার টন আলু কেনার ঘোষণা দেয়। কিন্তু ঘোষণার চারদিন পর গতকাল জেলার বিভিন্ন আড়তে আলু বিক্রি হয়েছে কেজিপ্রতি ১৩ থেকে ১৩ টাকা ৫০ পয়সায়। এমনকি খুচরা বাজারেও ভালো মানের আলু মিলছে প্রকারভেদে ১৮-২০ টাকায়।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, সরকার ঘোষিত ৫০ হাজার টন আলু ক্রয়ের সিদ্ধান্ত দ্রুত কার্যকর হলে কৃষক ও ব্যবসায়ীরা কিছুটা স্বস্তি পেতেন। পাশাপাশি রফতানির উদ্যোগও আলুর ন্যায্য মূল্য নিশ্চিতে সহায়তা করত। রংপুর সিটি বাজারের আড়তদার মো. নজরুল ইসলাম রাজু বলেন, ‘হিমাগার থেকে আড়ত পর্যন্ত পরিবহন ও খরচ যোগ হয়ে কেজিপ্রতি আলুর মূল্য দাঁড়াচ্ছে প্রায় ২৪ টাকা। অথচ এখন ১৪ টাকায় বিক্রি করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। তাছাড়া এ বছর হিমাগারে আলু রাখতে বস্তাপ্রতি ভাড়া পড়ছে ৩৮৫-৪০০ টাকা, যা গত বছর ছিল ৩০০-৩১০ টাকা।’

পাইকারি বিক্রেতা মো. মোকাদ্দেম রহমান বলেন, ‘চাষীদের কাছ থেকে কিনে পাইকারিতে আলু বিক্রি হচ্ছে প্রকারভেদে কেজিপ্রতি ১৫-১৬ টাকায়। তবু ক্রেতা সংকট রয়ে গেছে।’

আলুচাষী ভূপাল চন্দ্র রায় বলেন, ‘এ বছর ৪০ দোন (২৪ শতকে ১ দোন) জমিতে উৎপাদিত ৪০০ বস্তা আলুর জন্য মোট খরচ হয়েছে ৭০ হাজার ৫২৫ টাকা। এর মধ্যে উৎপাদন খরচ ৪৬ হাজার টাকা এবং হিমাগার ভাড়া ২৪ হাজার ৫২৫ টাকা। অথচ বর্তমান বাজারদরে (১২ টাকা কেজি) বিক্রি করলে আয় হবে মাত্র ২৭ হাজার টাকা। জমি বর্গা নেয়া হলে লোকসান আরো বাড়বে।’

রংপুর কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, জেলায় ৪০টি হিমাগারের ধারণক্ষমতা ৪ লাখ ৬১ হাজার ৭৪৭ টন। এর মধ্যে ৩১ জুলাই পর্যন্ত সংরক্ষণ করা হয়েছে ৪ লাখ ২৩ হাজার ৯১৮ টন।

মিঠাপুকুর উপজেলার উত্তমাশা কোল্ড স্টোরেজের মালিক মো. ওবায়দুল হক বলেন, ‘নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক কমে আলু বিক্রি হচ্ছে। কৃষক দাম না পেলে হিমাগার মালিকও সমস্যায় পড়বেন, কারণ অধিকাংশ হিমাগার ঋণনির্ভর। সাধারণত মার্চ থেকে কৃষকরা আলু হিমাগারে রাখেন এবং ডিসেম্বরের আগেই বের করে নেন। তবে বাজারে মূল্য ভালো না পেলে সহজে কেউ আলু বের করবে না। তখন বাধ্য হয়ে বেশিদিন হিমাগারে রাখতে হবে। এতে হিমাগারের খরচ বৃদ্ধি পাবে। এখন পর্যন্ত আমার হিমাগার থেকে ৩৫ হাজার বস্তা আলু বের হয়েছে, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় অর্ধেকেরও কম।’

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ মৌসুমে জেলায় ৬৬ হাজার ২৮০ হেক্টর জমিতে আলু আবাদ হয়েছে। উৎপাদন হয়েছে প্রায় ১৯ লাখ ৫৫ হাজার টন। গত বছর এ উৎপাদন ছিল ১৫ লাখ ৪২ হাজার টন। অতিরিক্ত উৎপাদনের কারণে বাজারে চাপ তৈরি হয়েছে। নভেম্বরের শেষদিকে নতুন আলু বাজারে এলে পুরনো আলুর চাহিদা আরো কমে যাবে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মৌসুমের শুরুতে চাহিদাভিত্তিক আবাদের পরিকল্পনা থাকলে বর্তমান সংকট তৈরি হতো না। কৃষক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বলেন, ‘চাহিদা বিবেচনা না করে উৎপাদনের প্রবণতা ক্রমেই বাড়ছে। প্রকৃত কৃষকের পাশাপাশি অনেক অনভিজ্ঞ বিত্তশালীও আলু আবাদে নেমে পড়ায় অসুস্থ প্রতিযোগিতা সৃষ্টি হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে। তাছাড়া সিন্ডিকেট ও অসাধু ব্যবসায়ীদের কারণে কৃষক ন্যায্য দাম পাচ্ছেন না। সরকারের উচিত চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ, প্রকৃত কৃষকদের সহায়তা প্রদান এবং মানহীন বীজ ও কীটনাশকের নিয়ন্ত্রণে কঠোর বাজার মনিটরিং করা। কৃষককে বাঁচাতে কৃষি উপকরণের দাম কমানো, উৎপাদিত ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত এবং সহজ শর্তে কৃষি ঋণের ব্যবস্থা করা জরুরি।’

বিএডিসি (বীজ বিপণন) রংপুর অঞ্চলের উপপরিচালক মো. মাসুদ সুলতান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আলুর দাম না পাওয়ার নেতিবাচক প্রভাব আগামী মৌসুমেও পড়তে পারে। আবার আমাদের প্রবণতা হচ্ছে, কোনো ফসলের দাম ভালো গেলে ওই ফসল আবাদে আমরা হুমড়ি খেয়ে পড়ি। ফলে অনেক কৃষক খাওয়ার জন্য রাখা আলু বিক্রি না করে বীজ হিসেবে ব্যবহার করতে পারেন। এতে ফলনে বিপর্যয়ের ঝুঁকি রয়েছে। তাই সবাইকে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত থাকতে হবে।’