রেজিন এক ধরনের তরল প্লাস্টিক, যা দিয়ে তৈরি হয় গহনা বা তৈজসপত্র। দেশে রেজিনের প্রচলন থাকলেও এ থেকে তৈরি জুয়েলারির তেমন প্রচলন নেই। তবে শিল্পটি এগিয়ে নিতে কাজ করে যাচ্ছেন বগুড়ার নারী উদ্যোক্তারা। পণ্য তৈরি ও বিক্রির সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন এ অঞ্চলের অর্ধশত নারী।

উদ্যোক্তারা বলছেন, রেজিন দেখতে মূলত স্বচ্ছ কাচের মতো। কেমিক্যাল মিশ্রিত থাকায় পানিতে অদ্রবণীয় জৈব মিশ্রণ তৈরি করে। রেজিন একধরনের আঠা বা বার্নিশের মতো কাজ করে। তরল রেজিন বিভিন্ন পণ্যের ছাঁচে ফেলে রেখে তা জমাট করতে হয়। জমাটের সময় ফুল বা নকশাও দিতে হয়। প্রায় ২৪ ঘণ্টা জমাটের পর সেটি কাচের মতো মসৃণ হয়। সেটিকে একটু ঘষেমেজে জুয়েলারি বা প্রয়োজনীয় পণ্য তৈরি করতে হয়। পণ্য তৈরি করতে প্রায় তিন-চারদিন সময় লেগে যায়। সিলিকন মল্ড বা পণ্যের ছাঁচ অনুযায়ী একসঙ্গে অসংখ্য পণ্য তৈরি করা সম্ভব। তরল রেজিন ব্যবহার করে নকশা করা যায়। যা দিয়ে পরে গহনা, ঘর সাজানোর তৈজসপত্র, ঘড়ি, ওয়ালম্যাট, আংটি, চুড়িসহ বিভিন্ন পণ্য তৈরি করা যায়। এসব পণ্য বিভিন্ন শোরুম, জুয়েলারি দোকান, কসমেটিকসের দোকান, মেলা ও উৎসবে কেনাবেচা করা যায়।

অনার্স পড়ছেন বগুড়ার ফারিয়া রহমান। তিনিও রেজিনের কাজ শিখেছেন। আরো ভালো করে শেখার জন্য প্রশিক্ষণও নিয়েছেন। প্রতি মাসে ১৮-২০ হাজার টাকার পণ্য বিক্রি করেন তিনি। তার অনলাইন পেজের মাধ্যমে ঢাকা, বগুড়া, সিলেট, নারায়ণগঞ্জের ক্রেতারা এ পণ্য কেনাকাটা করেন। একটি মানসম্মত রেজিনের আংটি বিক্রি হয় ৩০০-৪০০ টাকায়। ডিজাইন ও মান অনুযায়ী একটি ব্রেসলেট ২০০ থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায় বিক্রি হয়। এ পরিমাণ বিক্রির পর তিনি প্রতি মাসে আয় করেন ৬-৭ হাজার টাকা। ফারিয়ার সঙ্গে সহযোগী হিসেবে কাজ করেন তার বোন ফারহানা রহমান। প্রতি মাসে যা আয় করেন তাতে তাদের লেখাপড়ার খরচ চলে যায়।

‘শখ সৌখিন’ নামে সুহাদা জামান মীমের একটি অনলাইন পেজ রয়েছে। তিনিও রেজিনের কাজ শিখেছেন। এখন তিনি জুয়েলারি পণ্য তৈরি করেন। এগুলো তিনি বিক্রি শুরু করবেন। সুহাদা জামান মীম জানান, বাজারে পণ্যটির চাহিদা আছে। অনেক নারীই রেজিনের জুয়েলারি পছন্দ করেন। বগুড়ায় এটা নিয়ে তেমন একটা কাজ হয়নি। কিন্তু এখন শুরুতেই বেশ সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। অনেক নারী খোঁজ করে জুয়েলারি পণ্য সংগ্রহ করছেন। অনেকেই আবার বিয়ের সময়কার ফুলের মালা, প্রথম পাওয়া ফুল স্মৃতি হিসেবে রাখতে অর্ডার দিয়ে কাজ করিয়ে নিচ্ছেন।

২০২০ সালে দেশে কভিড মহামারী শুরু হলে অনলাইন মাধ্যমকে ঘিরে অনেকেই নতুন নতুন উদ্যোক্তা হয়ে যান। বগুড়াতেও সেই হাওয়া লাগে। কেউ খাবার, কেউ হস্তশিল্প, কেউ গাছের চারা, গার্ডেনিং, তৈজসপত্র, পোশাক বিক্রি শুরু করেন। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বেশকিছু পরিবর্তন ঘটলে কিছু উদ্যাক্তা অনলাইন মাধ্যমে সফলতা পাননি। কেউ কেউ ভিন্ন পেশায় চলে যান। কেউ কেউ ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করে যাচ্ছেন। ঘুরে দাঁড়ানো এসব নারীকে স্বল্প মূল্যে প্রশিক্ষণ দিয়ে রেজিন জুয়েলারিকে প্রতিষ্ঠার জন্য চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন বগুড়ার বেশকিছু নারী উদ্যাক্তা।

রেজিন নিয়ে কাজ করা অন্যতম নারী হলেন শহরের শিববাটি এলাকার মোস্তারি মেহজাবিন মীম। তিনি চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে আর্কিটেকচার বিষয়ে পড়ালেখা শেষ করেছেন। পেশাজীবী স্থাপত্য প্রকৌশলীর পাশাপাশি তিনি রেজিন নিয়ে কাজ করছেন। আর্নস্ট তার প্রতিষ্ঠানের নাম। স্বল্পমূল্যে নারীদের প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।

বগুড়ার সারা বুটিক হাউজের জুয়েলারি শাখার প্রধান এলিনা জাহান দিপু। শিক্ষাজীবন শেষ করে উদ্যাক্তা হয়ে যান। স্বাধীনচেতা এ নারী নিজের স্বপ্ন বাস্তবায়নে কাঠ, কাপড় ও অন্যান্য ধাতব দিয়ে গহনা তৈরি করতেন। রেজিনের গহনার চাহিদা সৃষ্টি হলে তিনিও প্রশিক্ষণ নেন।

আর্নস্ট প্রতিষ্ঠানের প্রধান মোস্তারি মেহজাবিন মীম জানান, নারীদের আর্থিকভাবে এগিয়ে নিতে কাজ করে যাচ্ছেন তিনি। নারীরা যাতে নিজের আয় দিয়ে পরিবার পরিচালনা করতে পারেন, নিজের লেখাপড়ার খরচ মেটাতে পারেন সেই চেষ্টা করছেন তিনি। রেজিন জুয়েলারি নিয়ে অনেকেই কাজ করছেন। যার কাজে যতটা ফিনিশিং আছে তার কাজের চাহিদা তত বেশি। ভালো করতে পারলে এ শিল্প দিয়ে ভালো কিছু করা সম্ভব।