দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় গত বছর কাতার ও ওমান থেকে ৬৩ কার্গো তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস (এলএনজি) আমদানি করেছিল বাংলাদেশ। বিশ্ববাজারে দর বৃদ্ধির পরিপ্রেক্ষিতে চলতি বছর জ্বালানি পণ্যটির চুক্তিভিত্তিক সরবরাহ কমানোর কথা আগেই জানিয়ে দিয়েছিল দেশ দুটির সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলো। সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর কাতার ও ওমান থেকে এলএনজিবাহী কার্গো আগমন কমতে পারে ১৫-২০টি।

যদিও এবার কাতার ও ওমান থেকে ৫৬ কার্গো এলএনজি আমদানির পরিকল্পনা করেছিল পণ্যটি আমদানিতে নিয়োজিত প্রতিষ্ঠান রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আরপিজিসিএল)। কিন্তু এলএনজি বাজারের বর্তমান পরিস্থিতিতে পেট্রোবাংলার লক্ষ্য হলো অন্তত ৪৮টি কার্গোর আগমন নিশ্চিত করা।

স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি আমদানি করতে হচ্ছে উচ্চমূল্যে। সে সুযোগও সংকুচিত করে তুলছে ইউক্রেন সংকট। এর মধ্যেই আবার দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ কমাতে যাচ্ছে কাতার ও ওমানের প্রতিষ্ঠানগুলো। এ ঘাটতি পূরণে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আমদানির নতুন উৎস খুঁজছে জ্বালানি বিভাগ। যদিও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর পক্ষ থেকে এখন পর্যন্ত এ বিষয়ে ইতিবাচক কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

দেশে এলএনজি আমদানির কাজটি সম্পন্ন হয়ে থাকে পেট্রোবাংলার সাবসিডিয়ারি আরপিজিসিএলের তত্ত্বাবধানে। সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, ২০২০ সালে দেশে কাতার ও ওমান থেকে এলএনজিবাহী কার্গো এসেছিল মোট ৬৬টি। এর মধ্যে কাতার থেকে ৪০টি ও ওমান থেকে ২৬টি কার্গো এসেছে। গত বছর দেশ দুটি থেকে আসা ৬৩টি এলএনজিবাহী কার্গোর মধ্যে ৩৯টি কাতার ও ২৪টি ওমান থেকে এসেছে। চলতি বছরে দেশ দুটি থেকে মোট ৫৬টি কার্গো আনার পরিকল্পনা রয়েছে আরপিজিসিএলের। এর মধ্যে ৪০টি কাতার ও ১৬টি ওমান থেকে আনার পরিকল্পনা রয়েছে কোম্পানিটির। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে এ পরিকল্পনাও উচ্চাভিলাষী হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে দেশ দুটি থেকে প্রতি মাসে গড়ে চারটি করে অন্তত ৪৮টি কার্গো আমদানির বিষয়টি নিশ্চিত করতে চায় পেট্রোবাংলা।

সংস্থাটির চেয়ারম্যান নাজমুল আহসান বণিক বার্তাকে বলেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় কাতার ও ওমান থেকে আমরা প্রতি মাসে চারটি করে এলএনজিবাহী কার্গো আমদানির পরিকল্পনা করছি। কোনো কোনো সময় বেশিও হতে পারে। তবে গড়ে চারটি করে কার্গো আমদানি নিশ্চিত করতে চাই।

দেশে গ্যাসের সরবরাহ সংকট ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠছে। এ সংকট মোকাবেলার জন্য এলএনজি আমদানির ওপরই নির্ভরশীল বাংলাদেশ। স্পট মার্কেটে পণ্যটির দাম আকাশচুম্বী হয়ে ওঠায় গত বছর স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কেনা কমিয়ে দেয় বাংলাদেশ। এতেই দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদন থেকে শুরু করে পরিবহনসহ অন্যান্য খাত অস্থিতিশীল হয়ে ওঠে। একপর্যায়ে উচ্চমূল্যেই স্পট মার্কেট থেকে এলএনজি কিনতে বাধ্য হয় বাংলাদেশ। বতর্মানে স্পট মার্কেট থেকে উচ্চমূল্যেও জ্বালানি পণ্যটি ক্রয়ের সুযোগ একেবারে সংকুচিত করে ফেলেছে ইউক্রেন সংকট। বাংলাদেশের জন্য পরিস্থিতি আরো সঙিন করে তুলেছে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় সরবরাহ কমে আসার খবর। বর্তমান প্রেক্ষাপটে সামনের দিনগুলোয় দেশের শিল্প ও বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ গোটা অর্থনীতির প্রায় প্রতিটি খাতেই বড় ধরনের ঝুঁকি তৈরি করেছে এলএনজি বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি।

এলএনজির দীর্ঘমেয়াদি সরবরাহ নিশ্চিতে ২০১৭ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর কাতারের রাস লাফান লিকুইফায়েড ন্যাচারাল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেডের সঙ্গে চুক্তি করে পেট্রোবাংলা। ১৫ বছর মেয়াদি এ চুক্তি শেষ হচ্ছে আগামী ২০৩২ সালে। চুক্তি অনুযায়ী, প্রতি বছর বাংলাদেশে ১৮ থেকে ২৫ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করার কথা কোম্পানিটির।

দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে এলএনজি সরবরাহকারী আরেক প্রতিষ্ঠান ওমানের ওকিউ ট্রেডিং লিমিটেড। ২০১৮ সালের ৬ অক্টোবর পেট্রোবাংলার সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তি অনুযায়ী কোম্পানিটির ২০২৮ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশে বছরে ১০ থেকে ১৫ লাখ টন এলএনজি সরবরাহ করার কথা।

গত কয়েক বছরে দেশ দুটি থেকে এলএনজি আমদানির পরিমাণে তারতম্যও দেখা গিয়েছে। এ সময়ের মধ্যে কাতার থেকে আগত এলএনজিবাহী কার্গোর সংখ্যায় নিম্নমুখিতা দেখা গেলেও ওমান থেকে কার্গো আসার সংখ্যা কিছুটা বেড়েছে। সামনের বছরগুলোয় দেশে এলএনজিবাহী কার্গো আগমনের সংখ্যা আরো কমতে পারে কিনা জানতে চাইলে আরপিজিসিএলের এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, চুক্তির পরিমাণ অনুযায়ী কার্গো সরবরাহ করে রফতানিকারক দেশগুলো। তবে মাঝেমধ্যে নানা কারণে দু-একটি কার্গো কমবেশি হয়। তবে আগামীতে কার্গো সরবরাহ কমার বিষয়ে কোনো তথ্য নেই। সেটি হলে সরবরাহকারী কোম্পানিগুলো আগেই জানিয়ে দেয়।

তবে এর পরও সামনের দিনগুলোয় দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি সরবরাহ নিয়ে আরো আশঙ্কা থেকেই যাচ্ছে বলে মনে করছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের ভাষ্যমতে, দেশে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজি আসছে ভূরাজনৈতিকভাবে বিশ্বের অন্যতম নাজুক অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য থেকে। এছাড়া জ্বালানি বাজারের অভ্যন্তরীণ ও বহিঃ উপাদানগুলোর যেকোনোটি যেকোনো সময়ে মারাত্মক প্রতিকূল কারণ হয়ে দেখা দিতে পারে। স্পট মার্কেটের বর্তমান পরিস্থিতিতে এরই মধ্যে বিষয়টির প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির ক্ষেত্রেও বিকল্প একাধিক উৎস নিশ্চিত করার পাশাপাশি দেশেও গ্যাসের অনুসন্ধান কার্যক্রম জোরালো করতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও ভূতত্ত্ববিদ অধ্যাপক বদরূল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, দীর্ঘমেয়াদির আওতায় যেসব চুক্তি করা হয়েছে সেগুলোর বিষয়ে এখনই তত্পরতা চালানো উচিত। যেহেতু আমরা গভীর অনুসন্ধান কার্যক্রম চালাতে পারিনি, সেক্ষেত্রে বিকল্প ব্যবস্থা দ্রুতই করা উচিত। ইউক্রেন নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়ার সংকট দীর্ঘ হলে গ্যাসের ওপর তার প্রভাব পড়বে।

এলএনজির স্পট মার্কেটে এরই মধ্যে বড় প্রভাবক হয়ে উঠেছে ইউক্রেন সংকট। রুশ এলএনজি ও প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর অনেকটাই নির্ভরশীল ইউরোপীয় দেশগুলো।  ইউক্রেন সংকটে এসব দেশকে পাশে আনতে মরিয়া যুক্তরাষ্ট্র এখন ইউরোপকে রুশ গ্যাসের নির্ভরশীলতা থেকে বের করে আনতে চাইছে। স্পট মার্কেটের সরবরাহকৃত এলএনজিবাহী কার্গোগুলোর মুখ ইউরোপের দিকে ঘুরিয়ে দিতে রীতিমতো কূটনৈতিক তত্পরতা চালাচ্ছে বৈশ্বিক পরাশক্তি দেশটি।

সম্প্রতি ইউরোপে গ্যাস রফতানির জন্য কাতারের আমিরকে অনুরোধ জানিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন। আন্তর্জাতিক বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ বলছে, কাতারের পক্ষে মার্কিন প্রেসিডেন্টের এমন অনুরোধ উপেক্ষা করার সম্ভাবনা কম। কারণ মধ্যপ্রাচ্যের ভূরাজনীতিতে মার্কিন মিত্র দেশগুলো এখন কাতারের প্রতি অনেকটাই বৈরী হয়ে উঠেছে। এ অবস্থায় ভূরাজনৈতিক লাভের প্রত্যাশায় মার্কিন অনুরোধ ইতিবাচকভাবেই বিবেচনা করে দেখতে পারে দেশটি। সেক্ষেত্রে বিপাকে পড়ে যেতে পারে কাতারের গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল এশিয়ার উদীয়মান অর্থনীতিগুলো, যার অন্যতম বাংলাদেশ।

বার্তা সংস্থা রয়টার্সে প্রকাশিত সাম্প্রতিক এক প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, এশিয়ায় সরবরাহ কমিয়ে তা ইউরোপে পাঠানোর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা চাইতে পারে কাতার। এক্ষেত্রে এশীয় আমদানিকারকদের রাজি করাতে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক সহায়তাকে কাজে লাগানোর কথা ভাবা হচ্ছে। যদিও দেশটির জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী সাদ শেরিদা আল-কাবি বলেছেন, ইউরোপে গ্যাসের চাহিদার ৩০-৪০ শতাংশ একা রাশিয়াই পূরণ করছে। দেশটি ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করে দিলে যে ঘাটতি তৈরি হবে, তা পূরণের সক্ষমতা কাতারের নেই। এছাড়া এশিয়ায় রফতানীকৃত এলএনজিবাহী কার্গো ইউরোপের দিকে ঘুরিয়ে দেয়ার বিষয়েও এখন পর্যন্ত আমদানিকারক কোনো দেশের সঙ্গে কোনো আলোচনা করেনি কাতার।

পেট্রোবাংলা-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় এলএনজির আমদানি হ্রাসের বিষয়টি মাথায় রেখে স্পট থেকে জ্বালানি পণ্যটির ক্রয়ের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ নিয়ে একটি পরিকল্পনাও করা হয়েছে। তবে এখনই তা কেনা হবে কিনা তা নিশ্চিত করতে পারেননি পেট্রোবাংলার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।

আরপিজিসিএলের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তার বরাত দিয়ে জ্বালানির বাজার পর্যবেক্ষণকারী সংবাদমাধ্যম এসঅ্যান্ডপি গ্লোবাল প্ল্যাটস জানিয়েছে, চলতি মাসে সরবরাহের জন্য স্পট থেকে সর্বনিম্ন দরদাতা একটি কোম্পানির প্রস্তাব পেয়েছে জ্বালানি বিভাগ। সেটি মূল্যায়ন করা হচ্ছে। প্রতি এমএমবিটিইউ ৩০ ডলার প্রস্তাব করে দরপত্র জমা দিয়েছে ফ্রান্সের টোটাল এনার্জি। এছাড়া প্রতি এমএমবিটিইউ ৩৫ ডলার করে প্রস্তাব দিয়েছে আরেকটি কোম্পানি।