ফরিদপুরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ (বিএসএমএমসি) হাসপাতালের স্টোর রুমসহ বিভিন্ন কক্ষে দুই মাসে তিনবার অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। তবে হতাহতের ঘটনা না ঘটলেও প্রতিটি অগ্নিকাণ্ড মানবসৃষ্ট ছিল বলে জেলা প্রশাসনের তদন্তে উঠে এসেছে। বারবার এমন অগ্নিকাণ্ড রোধ করা না গেলে যেকোনো সময় বড় ধরনের অঘটনের শঙ্কা প্রশাসন, রোগী ও সংশ্লিষ্টদের।

জানা গেছে, দক্ষিণাঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এ স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে ৫৪ দিনের ব্যবধানে তিনটি অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে। যদিও একটিতেও থানায় কোনো জিডি বা মামলা করা হয়নি। তবে ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে গঠন করা হয় তদন্ত কমিটি। চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে প্রতিবেদন স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে জেলা প্রশাসন।

তবে হাসপাতালের পরিচালক ডা. মো. হুমায়ুন কবীর বণিক বার্তাকে বলেন, ‘অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও তারা এখনো প্রতিবেদন জমা দেয়নি। কমিটির সদস্যরা আমার কাছে সময় বাড়ানোর দাবি জানালে তা বাড়িয়েছি। প্রতিবেদন পেলে অগ্নিকাণ্ডের কারণ জানাতে পারব।’

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, ১৬ মে সকাল পৌনে ৯টার দিকে হাসপাতালটির নতুন ভবনের দ্বিতীয় তলার ভাণ্ডার কক্ষে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে। কক্ষটি গ্রিল ও থাই গ্লাস দিয়ে সুরক্ষিত। অগ্নিকাণ্ডের সময় ৩ হাজার ৬০০ বর্গফুটের ওই কক্ষটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ ছিল। আগুনে কক্ষে থাকা যন্ত্রপাতি, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পুড়ে যায়। পরে ফায়ার সার্ভিসের সদস্যরা আগুন নিয়ন্ত্রণে আনে।

এর আগে ২২ মার্চ প্রথম দফায় হাসপাতালের মর্গে আগুন লাগে। মর্গে মৃতদেহ ছিল এবং মর্গটির মূল ফটক বাইরে থেকে বন্ধ ছিল। কক্ষটিতে কোনো বৈদ্যুতিক সংযোগ ছিল না। এর নয়দিন পর দ্বিতীয় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে হাসপাতালের নতুন ভবনের ষষ্ঠ তলায়। এসব অগ্নিকাণ্ডের পর অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ আলী সিদ্দিকীকে প্রধান করে সাত সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন পুলিশ সুপারের প্রতিনিধি, হাসপাতাল পরিচালকের প্রতিনিধি, গণপূর্ত বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, স্বাস্থ্য ও প্রকৌশল বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী, ওজোপাডিকোর নির্বাহী প্রকৌশলী ও ফরিদপুর দমকল বাহিনীর সহকারী পরিচালক।

এক প্রশ্নের জবাবে জেলা প্রশাসক মো. কামরুল আহসান তালুকদার বণিক বার্তাকে বলেন, ‘তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। এগুলো যাচাই-বাছাই করে আরো বিশদ তদন্তের জন্য স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে টিম আসবে বলে আশা করছি। হাসপাতাল পরিচালনার ক্ষেত্রে সমন্বয়হীনতা রয়েছে। এ বিষয়টিও আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়কে জানিয়েছি। এখানে সেবার মান বাড়ানোর জন্য, দায়িত্বরত চিকিৎসকদের আচরণ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় পৌঁছানোর জন্য যদি প্রশিক্ষণসহ অন্যান্য ব্যবস্থা গ্রহণের প্রয়োজন হয়, সেটি স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নেবে।’

হাসপাতালটিতে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীর স্বজনরা জানান, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটলে সরু সিঁড়ি দিয়ে হুড়োহুড়ি করে নিচে নামতে বেগ পেতে হয় তাদের।

গণতান্ত্রিক আইনজীবী সমিতির ফরিদপুর জেলা শাখার সভাপতি অ্যাডভোকেট মানিক মজুমদার ও সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) বোয়ালমারী উপজেলা শাখার সদস্য সচিব গাজী শাহিদুজ্জামান লিটন জানান, জেলা প্রশাসনের তদন্তে যেহেতু অগ্নিকাণ্ড মানবসৃষ্ট বলে প্রতীয়মান হয়েছে, কারা এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতে তা তদন্ত করে বের করা জরুরি। অন্যথায় বারবার এমন ঘটনার আশঙ্কা থেকে যায়। এখানে হাজার হাজার মানুষ প্রতিনিয়ত চিকিৎসা নিতে আসেন। তাই এমন দুর্ঘটনা ঘটলে বড় ধরনের হতাহতের আশঙ্কা থাকে। ফলে দ্রুততম সময়ের মধ্যে এসব ঘটনা তদন্ত করে জড়িতদের আইনের আওতায় আনা দরকার।

শহরের পশ্চিম খাবাসপুর মহল্লায় ঢাকা-বরিশাল মহাসড়কের পূর্ব পাশে ১৯৯১ সালে ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ স্থাপিত হয়। ২০১২-১৩ অর্থবছরে শয্যা বাড়িয়ে ৫০০-তে উন্নীত করা হয়। এরপর ২০২১ সালের ৪ এপ্রিল ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নাম পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল করে সরকার। ২০২৩ সালের ১৭ মে জারীকৃত এক প্রজ্ঞাপনে হাসপাতালকে ৫০০ শয্যা থেকে ১ হাজার শয্যায় উন্নীত করা হয়। ফরিদপুরের বিভিন্ন উপজেলা ছাড়াও মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, নড়াইল, মাগুরা, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া ও রাজবাড়ীর রোগীরা নিয়মিত চিকিৎসা নিতে আসেন এখানে। প্রতিদিন গড়ে এক হাজারের বেশি রোগী ভর্তি থাকেন। দুটি বহির্বিভাগে প্রতিদিন গড়ে দুই হাজারের বেশি রোগী চিকিৎসা নেন। তবে হাসপাতালটিতে এমআরআই, সিটিস্ক্যান, এন্ডোস্কপি, কোলনোস্কপি, এনজিওগ্রামের মতো গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র স্থাপন করা হলেও অধিকাংশই অকেজো পড়ে রয়েছে।