মাইলস্টোন স্কুল ভবনে বিমান বিধ্বস্তের ঘটনায় গতকাল প্রাণ হারিয়েছে স্কুলটির তৃতীয় শ্রেণীর শিক্ষার্থী মো. জুনায়েত হাসান। প্রতিদিনের মতো গতকাল সকালে সে স্কুলে গিয়েছিল। পরে বেলা ১টায় ক্লাস শেষে চলছিল কোচিং ক্লাসের প্রস্তুতি। এর কিছু সময় পর বিকট শব্দে স্কুল ভবনে বিধ্বস্ত হয় বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর একটি প্রশিক্ষণ বিমান। ঘটনাস্থলে মারাত্মকভাবে পুড়ে যায় শিশু জুনায়েত। উদ্ধারকারীরা তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে পাঠান। জরুরি বিভাগে চিকিৎসা শেষে একসময় কর্তব্যরত চিকিৎসক শিশুটির মৃত্যুর খবর নিশ্চিত করেন।
জুনায়েত উত্তরার দিয়াবাড়ি এলাকার ব্যবসায়ী মো. আসলাম ও ঝর্ণা বেগমের ছেলে। জুনায়েত প্রথম শ্রেণী থেকেই মাইলস্টোন স্কুলে পড়াশোনা করছিল। অন্যদিনের মতো গতকাল সকালে স্কুলে যায় জুনায়েত। স্কুল ও কোচিং শেষে বেলা ৩টায় বাসায় ফেরার কথা ছিল তার। ছেলে ফেরার অপেক্ষায় ছিলেন মা ঝর্ণা বেগম। কিন্তু আর ঘরে ফেরা হয়নি এ শিশুর। ছেলের এমন মৃত্যুতে পাগলপ্রায় বাবা আসলাম ও মা ঝর্ণা বেগম। ছেলের মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রয়েছে এমন খবরে ছুটে আসেন তারা। এসে দেখেন ছেলের মরদেহ হাসপাতালের মর্গে পড়ে আছে। ছেলের মরদেহ দেখে বারবার জ্ঞান হারাচ্ছিলেন তারা। জুনায়েতের মৃত্যুর খবর পেয়ে ঢামেক হাসপাতালে ছুটে এসেছেন তার স্বজনরা। জুনায়েতের ফুপু বণিক বার্তার প্রতিবেদককে বলেন, ‘ছোটবেলা থেকে জুনায়েত পড়াশোনায় খুব আগ্রহী ছিল। প্রতিদিনের মতো গতকালও স্কুলে যায়। বিকালে তার মা ছেলের জন্য অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু এ দুর্ঘটনা ওর মায়ের বুক খালি করে দিল।’ কথা বলতে গিয়ে বারবার কান্না ভেঙে পড়েন তিনি।
জুনায়েতের আরেক আত্মীয় বলেন, ‘সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জুনায়েতের আইডি কার্ডের ছবি দেখে আমরা ওর বাবা-মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করি। প্রথমে ভেবেছিলাম ছেলেটা নিখোঁজ, পরে শুনতে পাই ওর মরদেহ হাসপাতালে আনা হয়েছে। সেজন্য আমরা ছুটে এসেছি।’
গতকাল সন্ধ্যায় এ প্রতিবেদন লেখার সময় জুনায়েতের মরদেহ ঢামেকের জরুরি বিভাগের মর্গে রাখা ছিল। সেখান আইনি প্রক্রিয়া শেষে পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে বলে জানিয়েছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এ বিষয়ে জানতে চাইলে শাহবাগ থানার উপপুলিশ পরির্দশক বলেন, ‘এ ঘটনায় অনেকে হতাহত হয়েছে। অ্যাম্বুলেন্সে অনেককে আনা হচ্ছে। কতজনের মৃত্যু হয়েছে সেটা বলতে পারছি না। জুনায়েতের মরদেহ মর্গে রাখা আছে। ঘটনাটি তুরাগ থানা এলাকায় হওয়ায় সেখানকার অফিসার ইনচার্জ আসবেন, এ বিষয়ে তিনি সিদ্ধান্ত নেবেন।’
জুনায়েতের স্কুলের পঞ্চম শ্রেণীর শিক্ষার্থী ইউশা মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে। ইউশার সঙ্গে একই স্কুলের দশম শ্রেণীতে পড়ে তার ভাই তাহসিন। বোন ইউশাকে আহত অবস্থায় উদ্বার করে তাহসিন। সে বলে, ‘দুপুরে স্কুলের ক্লাস শেষে হঠাৎ একটা বিকট শব্দ শুনতে পাই। তখন সবাই ছোটাছুটি করে বের হয়ে যাই। ঘটনাস্থলে গিয়ে আমার বোনকে দেখি। বোনকে আহত অবস্থায় দেখে আমার শরীর অসাড় হয়ে যায়। তখন ইউশার মাথা থেকে রক্ত পড়ছিল। এরপর হাসপাতালে নিয়ে আসি।’
তাহসিনের পাশাপাশি হাসপাতালের বাইরে ইউশার জন্য উদ্বেগ নিয়ে অপেক্ষা করছেন তার মা ও স্বজনরা। ইউশার কথা বলতে গিয়ে তারা বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন।
মাইলস্টোনের চতুর্থ শ্রেণীর শিক্ষার্থী আফিয়ানের শরীরের ৮০ শতাংশ পুড়ে গেছে বলে জানান তার বড় ভাই সৈকত। সন্তানের অবস্থা দেখে মায়ের আহাজারিতে কান্নায় চোখে পানি আসছিল উপস্থিত সবার। বার্ন ইনস্টিটিউটের পঞ্চম তলায় মা, ভাই ও স্বজনেরা আফিয়ানের জন্য আহাজারি করছিলেন। তার ভাই সৈকত বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমার ভাইয়ের শরীরের প্রায় ৮০ শতাংশ পুড়ে গেছে। জানি না কী হবে। আমার মা ভেঙে পড়েছেন।’
গতকাল বেলা ১টা ৫ মিনিটে মাইলস্টোন স্কুলে বিমান দুর্ঘটনার পর থেকে ঢামেকের বার্ন ইউনিট ও জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে একের পর এক আসতে থাকে হতাহতদের বহন করা অ্যাম্বুলেন্স। আহত, পুড়ে যাওয়া শিশুদের স্বজনদের আহাজারিতে ভারি ছিল এলাকা। কেউ নিহত বা আহত শিক্ষার্থীর জন্য কাঁদছিলেন। আবার কেউ খুঁজতে এসেছিলেন তার সন্তান এ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন কিনা জানতে।
হতাহতদের কারো পুড়ে গেছে হাত-পা, কারো মুখমণ্ডল, আবার কারো শরীরের বেশির ভাগ অংশ। অ্যাম্বুলেন্স আর স্ট্রেচারে একের পর এক আসতে থাকে আহত, যাদের অনেকেই শিশু। স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে চারপাশ। কারো ছেলের নাম কাব্য, কারো মেয়ে শ্রেয়া, কারো বা বীথি। সন্তানের নাম শুনে ছুটে আসছেন বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজন। কেউ শনাক্ত করছেন, আবার কেউবা দেখে চিনতে পারছেন ছেলেমেয়েকে। সন্তানের পোড়া শরীর দেখে বাবা-মা ও স্বজনরা ভেঙে পড়ছিলেন।
এদিকে আহতদের কারো কারো জন্য জরুরি ভিত্তিতে প্রয়োজন হচ্ছিল বিভিন্ন গ্রুপের রক্ত, কারো বা স্যালাইনসহ ওষুধসামগ্রী। রক্ত সংগ্রহে হাসপাতালের আশপাশের এলাকায় রেড ক্রিসেন্ট, বন্ধনসহ বিভিন্ন সংগঠন, শিক্ষার্থী ও স্বাস্থ্যকর্মীরা সক্রিয় ছিলেন। তবে উৎসুক জনতার ভিড়ে ব্যাহত হয়েছে অ্যাম্বুলেন্সের চলাচল ও চিকিৎসাসেবা।
আহতদের দেখতে বার্ন ইনস্টিটিউটে ছুটে এসেছিলেন সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, রাজনৈতিক নেতারা। তাদের সঙ্গী হয়েছেন দলীয় নেতাকর্মীরা। নেতাকর্মীদের ভিড়ে ভোগান্তিতে পড়তে হয় চিকিৎসক, স্বেচ্ছাসেবকসহ জরুরি সেবা দেয়া অনেককে।















