জঙ্গলে হাঁটতে বের হওয়া দুই বন্ধু পড়েছে ভালুকের মুখে। এক বন্ধু চড়েছে গাছে। আরেক বন্ধু অগত্যা মরার ভান করে শুয়ে থাকে। এ গল্পের মাধ্যমে শৈশবে অনেকেরই ভালুকের সঙ্গে প্রথম পরিচয় ঘটে। তবে এখন বাস্তবে ভালুকের দেখা মেলা ভার। একটা সময় পাহাড়ি অঞ্চলে প্রচুর ভালুক দেখা গেলেও দিন দিন সে সংখ্যাটা কমে আসছে। বাংলাদেশে তিন ধরনের ভালুকের মধ্যে সূর্য ভালুক বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলেও ধারণা ছিল প্রাণিবিজ্ঞানীদের। তবে গত এক দশকে চট্টগ্রামে গুটিকয়েক সূর্য ভালুকের দেখা পান গবেষকরা। ফলে বিষয়টি নিয়ে আবার আলোচনা শুরু হয়। গবেষকরা বলছেন, খুব একটা দেখা না গেলেও বাংলাদেশে সূর্য ভালুক পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়নি। সংরক্ষণের উদ্যোগ নিলে বিপন্ন এ ভালুক টিকিয়ে রাখা সম্ভব।
গবেষকরা বলছেন, বাংলাদেশে তিন ধরনের ভালুক রয়েছে—কালো ভালুক, অলস ভালুক ও সূর্য ভালুক। বর্তমানে কালো ভালুক তুলনামূলক বেশি দেখা যায়। অলস ভালুক বিপন্ন হয়ে গেছে আর সূর্য ভালুককে বিপন্ন বলা হলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এর অস্তিত্ব পাওয়া গেছে বলে দাবি করেছেন গবেষকরা।
সূর্য ভালুকের বৈশ্বিক অবস্থা এবং এটি সংরক্ষণের কার্যকর উদ্যোগ সম্পর্কে একটি অ্যাকশন প্ল্যান প্রণয়ন করেছে ইন্টারন্যাশনাল ইউনিয়ন ফর কনজারভেশন অব নেচার (আইইউসিএন)। এতে বলা হয়, এশিয়ার দক্ষিণ-পূর্বে অবস্থিত অন্তত ১১টি দেশে সূর্য ভালুকের অস্তিত্ব পাওয়া যেত। এখনো অনেক দেশে উপযুক্ত পরিবেশে সূর্য ভালুকের অস্তিত্ব টিকে আছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ প্রজাতির ভালুক বিলুপ্ত হয়ে গেছে বলে ঘোষণা করা হয়। এ ঘোষণার পর সম্প্রতি বাংলাদেশের পাহাড়ি অঞ্চলে সূর্য ভালুকের অস্তিত্ব মেলে।
দেড় দশক আগে বাংলাদেশ থেকে সূর্য ভালুকের অস্তিত্ব বিলুপ্ত হয়েছে বলে মনে করা হয়। কিন্তু ২০১৪ সালে আবার সূর্য ভালুকের অস্তিত্ব ক্যামেরায় ধরা পড়ে। গবেষকরা দাবি করেন, সম্ভবত প্রতিবেশী দেশ থেকে আসা গুটিকয়েক এ ভালুক ক্যামেরায় ধরা পড়েছে। ক্যামেরায় একটি ভালুককে তার বাচ্চাসহ ঘুরতেও দেখা গেছে। ধারণা করা হয়, ভালুকটি মিয়ানমার থেকে এসেছে। কিন্তু সাম্প্রতিক বছরে সূর্য ভালুকের উপস্থিতি কেবল চট্টগ্রামেই নয়, সিলেট ও রাঙ্গামাটিতেও দেখা গেছে।
সূর্য ভালুক বাংলাদেশ থেকে পুরোপুরি বিলুপ্ত না হলেও বিপন্ন প্রজাতির প্রাণীর তালিকায় রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের অধ্যাপক ড. মনিরুল এইচ খান। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ‘সূর্য
ভালুক পুরোপুরি বিলুপ্ত হয়ে যায়নি। বন্যপ্রাণী নিয়ে গবেষণায় যখন প্রযুক্তির ব্যবহার বেড়েছে তখন বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলে সূর্য ভালুকের অস্তিত্ব ধরা পড়ে। তবে ক্যামেরা আসার আগে যে সার্ভেগুলো হয়েছে সেগুলোর ফলাফলে বলা হয়েছে প্রাণীটি বিলুপ্ত হয়ে গেছে। কিন্তু ২০২১ সালের মাঝামাঝিতে যখন আমরা বন্যপ্রাণী নিয়ে কাজ করি তখনো সূর্য ভালুকের দেখা পেয়েছি। এটা রাঙ্গামাটির কাসালং বনের ঘটনা।’
প্রাণিবিদরা জানান, সূর্য ভালুকের প্রকৃত আবাস দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায়। অর্থাৎ চীনের দক্ষিণ অংশ, থাইল্যান্ড থেকে শুরু করে একদম অস্ট্রেলিয়ার আগ পর্যন্ত যেখানেই বন-জঙ্গল আছে, সেখানেই সূর্য ভালুকের দেখা মেলে। ভালুকের বাকি প্রজাতির তুলনায় একটু ছোটখাটোই হয় এরা। মাত্র পাঁচ ফুটের মতো উচ্চতা। আর ওজন হয় ১৫০ পাউন্ডের ধারে-কাছে। আকার ছোট হওয়ায় সূর্য ভালুক খুব গেছো স্বভাবের। তুলনামূলক কম ওজন নিয়ে ওরা তরতর করে গাছে উঠে যেতে পারে। এ ভালুকের প্রজাতিটা যেমন শক্তিশালী তেমনই চটপটে। সূর্য ভালুকদের খাওয়াও খুব অভিনব। ওরা সর্বভুক, মানে উদ্ভিদ-প্রাণী উভয়ই খায়। সূর্য ভালুকের প্রিয় খাবারের তালিকায় আছে পোকামাকড়, টিকটিকির মতো ছোট সরীসৃপ, বেরি জাতীয় সব ফল। তবে ওদের সবচেয়ে প্রিয় খাবার হচ্ছে মধু। মধুর সঙ্গে মৌমাছিও চেটে খেয়ে ফেলতে পারে সূর্য ভালুক।
একটা সময় বাংলাদেশের বন-জঙ্গলে সহজেই সূর্য ভালুকের দেখা মিলত। তবে প্রতিনিয়ত বন ও পাহাড় উজাড় হওয়ার কারণে বাসস্থান সংকটে প্রাণীটি বিপন্ন হয়ে পড়েছে বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণিবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মো. নিয়ামুল নাসের। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সূর্য ভালুক আমাদের দেশে বিপন্ন প্রাণীর তালিকায় রয়েছে। বাসস্থান ও আবাস সংকটই এর বড় কারণ। খাবার সংকটও প্রাণীটি বিলুপ্তির জন্য দায়ী। এ তিন কারণের পেছনে দায়ী মানুষ, যারা প্রতিনিয়ত পাহাড় ও বন উজাড় করে চলেছে। দেদার পাহাড় ও বন কাটার কারণে প্রাণীটির যেমন বসবাসের জায়গা সংকুচিত হয়েছে, তেমনি খাদ্যের জোগানও কমেছে। আরো একটি কারণে সূর্য ভালুক বিপন্ন হয়েছে—মানুষের শিকারের আক্রোশ। মানুষ সরাসরি হত্যা করেও প্রাণটিকে বিপন্ন করে তুলেছে। সূর্য ভালুক টিকে থাকলে প্রকৃতি ও পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’










