দেশের উত্তরের কৃষিনির্ভর জেলা ঠাকুরগাঁও। আশপাশের জেলার তুলনায় এখানে প্রায় সব ধরনের ফসলই ভালো হয়। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় এখানে দিন দিন বেড়ে চলেছে মাল্টার চাষ। মাল্টা চাষ করে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্ন দেখছেন এ জেলার কৃষকরা।

এমনই একজন কৃষক ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলার সীমান্ত এলাকা বৃদ্ধিগাঁও গ্রামের ওয়াজেদ আলী। সাত একর জায়গায় মাল্টার চাষ করে প্রতি বছর কোটি টাকার ফল বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি।

কৃষক ওয়াজেদ আলী জানান, এ বাগান করতে প্রাথমিকভাবে তার খরচ হয়েছিল ২৫ লাখ টাকা। বর্তমানে তার বাগানে চার হাজার মাল্টার গাছ আছে। এর মধ্যে দুই হাজার গাছে এবার ফল এসেছে। এ ফলের বাজারমূল্য প্রায় ৫০ লাখ টাকা। আগামী বছর এ দাম দ্বিগুণ হয়ে যাবে, যা কয়েক বছরের মধ্যে চক্রাকার হারে কয়েক গুণ বাড়বে।

আড়াই বছর বয়সী একেকটি গাছে দুই মণ পর্যন্ত মাল্টা ধরেছে। গাছের বয়স ও আকার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মাল্টার পরিমাণ ও স্বাদ বাড়তে থাকে। একেকটি মাল্টার গাছ ৩০-৪০ বছর পর্যন্ত ফল দেবে।

ওয়াজেদ আলী বলেন, মাল্টার চাহিদা অনেক। এ বাগান থেকে উৎপাদিত মাল্টা সরাসরি চলে যায় যাত্রাবাড়ীর আড়তে। সেখান থেকে দেশের অন্যান্য স্থানে চলে যাচ্ছে। এ বছর প্রতি মণ মাল্টা ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে।

চাহিদার ব্যাপারে তিনি বলেন, এ ফলের ব্যাপক চাহিদা। মানুষ এখনো দেশী মাল্টার ব্যাপারে ভালোভাবে জানে না। জানলে অবশ্যই ফরমালিন দেয়া বিদেশী মাল্টার বদলে দেশী মাল্টা খাবে।

ওয়াজেদ আলীর শুরুটা সুখকর ছিল না। টেলিভিশনের পর্দায় মাল্টার বাগান দেখে তিনিও বাগান করতে আগ্রহী হন। এ নিয়ে পরিবার থেকেও খুব একটা সম্মতি পাননি। কয়েক দফায় উপজেলা কৃষি অফিসে যোগাযোগ করেও কোনো ধরনের সহায়তা পাননি। এর পর চট্টগ্রামে থাকা বন্ধুর সঙ্গে যোগাযোগ করেন। তিনি তার সব কথা শুনে আগ্রহ প্রকাশ ও চারা কিনতে সাহায্য করেন। প্রথম দফায় ২১০ টাকা দরে এক হাজার চারা নিয়ে আসেন সিলেট থেকে। নিজস্ব জমি না থাকায় জায়গা বর্গা নিতে গিয়েও পোহাতে হয়েছে নানা বিপত্তি। তার মাল্টার বাগানের কথা শুনেই নিশ্চিত লোকসানের কথা ভেবে কেউ তাকে জমি দিতে চায়নি। এজন্য অধিক দামে চুক্তিতে জমি লিজ নিতে হয়েছে।

তবে বর্তমান চিত্র আলাদা। এখন সবকিছু বদলে গেছে। কৃষি অফিস থেকেও তার সঙ্গে সবসময় যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। এলাকার মানুষও তাকে নিয়ে গর্ব করে। জেলার কৃষি কর্মকতারাও তার ওপর খুশি।

ওয়াজেদ আলীর মতো এত বড় পরিসরে না হলেও ছোট ছোট আরো অনেক বাগান গড়ে উঠেছে জেলায়। জেলার রানীশংকৈল উপজেলার কর্নাইট এলাকায় আরেকটি বাগান গড়ে তুলেছেন সাদেকুল ইসলাম। তিনি বলেন, আমাকে উপজেলা কৃষি অফিস থেকে মাল্টার বাগান করতে উৎসাহ দেয়া হয়। সেখান থেকেই চারা ও সারসহ অন্যান্য জিনিস সরবরাহ করে। এক একর জায়গার ওপর আমার বাগানটিতে এখন পর্যন্ত ৪ লাখ টাকা খরচ করলেও এ বছরে আমি ১ লাখ টাকার মাল্টা বিক্রি করেছি। আগামী বছর এটা কয়েক গুণ বাড়বে।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, হরিপুর, পীরগঞ্জ, রানীশংকৈল, বালিয়াডাঙ্গী ও সদর উপজেলার প্রায় ৬০ হেক্টর এবং প্রায় তিন হেক্টর বসতবাড়ির জমিতে মাল্টার চাষ হচ্ছে। মার্চ-এপ্রিলে এসব গাছে ফুল আসে। আগস্ট-সেপ্টেম্বরে ফল পাকে। পাঁচ-ছয়টা মাল্টা ওজনে এক কেজি হয়। ঠিকভাবে পরিচর্যা করলে একটি পরিণত গাছে গড়ে ১৫০-৩০০টি পর্যন্ত ফল ধরে।

রানীশংকৈল উপজেলার চাংমারী ব্লকের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা রবিউল আযম পলাশ বণিক বার্তাকে বলেন, আমরা বাগানের শুরু থেকে তদারকি করি। কখন কী করা লাগবে আমরাই কৃষককে পরামর্শ এবং মাল্টা চাষে উৎসাহ দিই।

ঠাকুরগাঁওয়ের কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আবু হোসেন বণিক বার্তাকে বলেন, মাল্টা নিয়ে এ জেলার অপার সম্ভবনা রয়েছে। এখানকার মাটি মাল্টা চাষের জন্য উপযুক্ত হওয়ার একটা বিশেষ কারণ রয়েছে। ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড় এ দুই জেলার মাটি অম্লীয় বেলে দোআঁশ মাটি। তাই এখানকার মাটি ও আবহাওয়া মাল্টা চাষে উপযোগী বলেই চাষীদের উদ্বুদ্ধ করা হচ্ছে। একটি প্রকল্পের আওতায় জেলায় মাল্টার বাগানের সম্প্রসারণ করে যাচ্ছি। এছাড়া মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা প্রতিনিয়ত কাজ করে যাচ্ছেন।