রাজধানীর সবচেয়ে ব্যস্ত বাজারের নাম শ্যামবাজার। ১৭৪০ সালে ফরাসি বণিকদের হাতে পত্তন ঘটে পুরান ঢাকার এ বাজারটির। বর্তমানে রাজধানীর সবজি ও কাঁচাবাজারের ৮০ শতাংশ পণ্যই সরবরাহ হয় শ্যামবাজার থেকে। পাশাপাশি ফলমূলের বড় আড়তও রয়েছে এখানে। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) তত্ত্বাবধানে পরিচালিত বাজারটিতে সাপ্তাহিক কোনো বন্ধ নেই। প্রতিদিন ভোর থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আসা ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণায় মুখর থাকে বাজার।
শ্যামবাজার ও কাছের বাদামতলী ঘাটের ফলপট্টির ক্রেতা-বিক্রেতা আর পণ্য আনা-নেয়ার চাপ গিয়ে পড়ে গোটা পুরান ঢাকার ওপরে। এমনিতেই যানজটসহ বিভিন্ন ধরনের নাগরিক ভোগান্তির কারণে বিপর্যস্ত ঢাকার পুরনো অংশটি। তাই পুরান ঢাকার ওপর এ চাপ কমাতে শ্যামবাজার ও বাদামতলী ঘাটের ফলপট্টি স্থানান্তরের কথা ভাবছে ডিএসসিসি। এ বিষয়ে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, পুরান ঢাকার চাপ কমাতে আমরা মেগা প্রকল্প নিয়ে কাজ করছি। এর মধ্যে বড় একটি প্রকল্প হলো, দেশের বৃহত্তম কাঁচাবাজার তথা শ্যামবাজার স্থানান্তর। সম্ভাব্য যাচাই-বাছাই শেষে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা গেলে পুরান ঢাকার ওপর চতুর্মুখী চাপ যেমন কমবে, তেমনি সেখানে অবস্থিত বিভিন্ন প্রত্নতাত্ত্বিক স্থাপনাগুলো সংরক্ষণও সহজ হবে।
শ্যামবাজার কোথায় স্থানান্তর হবে তা জানতে চাইলে সংস্থাটির আরেক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, শ্যামবাজারসহ কয়েকটি বাজার স্থানান্তরের বিষয়ে প্রাথমিক সমীক্ষা চলছে। তবে এখনো নির্দিষ্ট করে বলা কঠিন যে কোথায় এসব স্থানান্তর হবে। সম্ভাব্য স্থান হিসেবে কামরাঙ্গীরচরের কথা বলেন তিনি। এ কর্মকর্তা জানান, সেখানে ডিএসসিসির ৫০ তলা বাণিজ্যিক হাব নির্মাণের ব্যাপারে কথা চলছে। সবকিছু ঠিক থাকলে সেখানেই শ্যামবাজার, চকবাজার, ইসলামপুর স্থানান্তর করে পুরান ঢাকাকে চাপমুক্ত নগরী হিসেবে উপহার দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।
ব্রিটিশ আমল থেকেই বুড়িগঙ্গার তীরে গড়ে উঠেছে দেশের বৃহত্তম সব পাইকারি বাজার। শ্যামবাজার ছাড়াও এখানে রয়েছে দেশের বৃহত্তম কাপড়ের বাজার ইসলামপুর। এছাড়া আছে স্বর্ণ বেচাকেনার তাঁতীবাজার, দেশের অন্যতম পাইকারি বাজার চকবাজার। এমনকি দেশের প্রকাশনা শিল্পের মূল কেন্দ্র বাংলাবাজারও এখানে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, কবি নজরুল সরকারি কলেজ, সোহরাওয়ার্দী কলেজ, মুসলিম গভর্নমেন্ট স্কুল, সেন্ট জোসেফ স্কুল, বাংলাবাজার বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়সহ বেশ কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী বিদ্যাপীঠও রয়েছে এ এলাকায়। প্রশাসনিক দিকে থেকে বিবেচনা করলে ঢাকা জেলা জজকোর্ট ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয় পুরান ঢাকাতেই অবস্থিত। বাণিজ্যিক, প্রশাসনিক ও শিক্ষা কেন্দ্রের পাশাপাশি দেশের বৃহত্তম নদীবন্দর ঢাকা নদীবন্দর বা সদরঘাট পুরান ঢাকার প্রয়োজনীয়তা ও নাগরিক চাপ দুটোই বাড়িয়েছে।
বিভিন্ন দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠার পাশাপাশি পুরান ঢাকার জনভোগান্তিও চরমে পৌঁছেছে। প্রতিদিন লাখো মানুষের আনাগোনা ঢাকার এ প্রান্তে। অপ্রশস্ত সড়ক, পণ্যবাহী গাড়ি, মালপত্র ওঠানামাসহ নানা কারণে ওই এলাকায় দিন-রাত যানজট লেগেই থাকে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। শ্যামবাজার, ইসলামপুর ও চকবাজারের একাধিক ব্যবসায়ী বলেন, দেশের বৃহত্তম বাজার হওয়ার কারণে এখানে ব্যবসা করেন তারা। কিন্তু যানজটসহ নানা ধরনের ভোগান্তি উল্টো লোকসান করছে তাদের।
এ প্রসঙ্গে নগর পরিকল্পনাবিদ বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক আদিল মুহাম্মদ খান বণিক বার্তাকে বলেন, পুরান ঢাকা আমাদের ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই এ অংশ নিয়ে একেবারেই ভিন্ন ধরনের পরিকল্পনা করতে হবে। নতুন ঢাকার মতো ঝলমলে শহর বা সুবৃহৎ অবকাঠামো নির্মাণের চিন্তা করলে এখানের ঐতিহ্য ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার শঙ্কা রয়েছে। ডিএসসিসি যে পরিকল্পনাই করুক তা যেন পুরান ঢাকার মেজাজকে ব্যাহত না করে, সেই বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি এটিও নিশ্চিত করতে হবে, বাজার স্থানান্তরের পর যেন নতুন কোনো ভোগান্তির শিকার না হয় পুরান ঢাকাবাসী। অর্থাৎ, এমনভাবে সম্ভাব্যতা যাচাই করতে হবে, যেন নগরবাসী স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতে পারে; আবার ঐতিহ্যও টিকে থাকে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) যুগ্ম পরিচালক (ঢাকা নদীবন্দর) মো. গুলজার আলী বণিক বার্তাকে বলেন, পুরান ঢাকার চাপ কমানোর জন্য অবশ্যই ডিএসসিসিকে কার্যকর ভূমিকা নিতে হবে। এক্ষেত্রে শ্যামবাজার স্থানান্তরের পাশাপাশি কয়েকটি মার্কেটের অবকাঠামোও স্থানান্তর করা যেতে পারে। তবে সেসব পরিকল্পনা বাস্তবায়নের আগে আপাতত সংশ্লিষ্ট এলাকা হকারমুক্ত করার মাধ্যমে পুরান ঢাকাবাসীকে কিছুটা স্বস্তি দেয়া যেতে পারে।










