গড়ে তোলা হচ্ছে একের পর এক অবকাঠামো। আশা একদিন উন্নত বিশ্বের শহরগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠবে মেগা সিটি ঢাকা। যদিও মৌলিক নাগরিক সুযোগ-সুবিধাই নিশ্চিত করা যায়নি এখনো। যাপিত জীবন অস্বাস্থ্যকর। শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসে যানজট-মশা-ধোঁয়া-ধুলায়। ঢাকার সংকট-সমস্যা নিয়ে ধারাবাহিক প্রতিবেদন। পর্ব ২
ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বাস্তবায়িত হচ্ছে একের পর এক মেগা প্রকল্প। ইউটার্ন, ইউলুপ, সিগন্যাল বাতি, ফুটপাত, বৃত্তাকার নৌপথ, ফুটওভারব্রিজ, আন্ডারপাসসহ নানা খাতে ব্যয় করা হয়েছে কয়েক হাজার কোটি টাকা। তৈরি হয়েছে সাতটি ফ্লাইওভার। চলমান আছে মেট্রোরেল, বাস র্যাপিড ট্রানজিট, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো প্রকল্প। পরিকল্পনায় রয়েছে সাবওয়ে নির্মাণ, যার কাজ শেষের লক্ষ্য ধরা হয়েছে ২০৫০ সাল।
গত দুই দশকে ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে বিপুল বিনিয়োগ সত্ত্বেও গড়ে ওঠেনি কার্যকর গণপরিবহন ব্যবস্থা। যাতায়াতে চরম জনদুর্ভোগ ঢাকাবাসীর নিত্যসঙ্গী। সাতটি ফ্লাইওভার তৈরি করতে প্রায় সাড়ে ৪ হাজার কোটি টাকা খরচ হলেও সেগুলো ঢাকার যানজট নিরসনে ভূমিকা রাখতে পারছে না। উল্টো ফ্লাইওভারের আশপাশের ইন্টারসেকশনে তৈরি করছে তীব্র যানজট। এ অবস্থায় চলমান প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হলে নগরবাসীর সড়কে দুর্ভোগ লাঘব হবে বলে প্রত্যাশা সংশ্লিষ্টদের। যদিও বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবায়নের পরও এসব প্রকল্প নগরবাসীর যাতায়াতের চাহিদা পূরণে সক্ষম হবে না। মেগা প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন হচ্ছে অনেক ধীরগতিতে। একটি প্রকল্প শেষ হওয়ার আগে আরেকটির কাজ শুরু হয়ে যাচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব প্রকল্পের পরিকল্পনায় ঢাকার বর্ধিষ্ণু জনসংখ্যার বিষয়টি উপেক্ষিত থেকে যাচ্ছে। প্রকল্পগুলো বাস্তবায়নের পরও পাবলিক বাসের মতো যানবাহনের প্রয়োজনীয়তা থাকবে সবচেয়ে বেশি। যদিও প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করতে গিয়ে সংকুচিত হয়ে পড়ছে এ ধরনের যানবাহন চলাচলের পথ। রাজধানীর সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নেও থেকে যাচ্ছে নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি। বিপুলসংখ্যক মোটরসাইকেল বা ব্যক্তিগত যানবাহনের চাপ সামলানোর সক্ষমতা এসব অবকাঠামোর নেই। প্রকল্পগুলো ভবিষ্যতে নগরবাসীর দুর্ভোগ মোচনে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারবে, সে বিষয়ে এখনো সন্দেহের যথেষ্ট অবকাশ থেকে যাচ্ছে।
বাস্তবায়নাধীন মেগা প্রকল্পগুলোর মধ্যে ঢাকায় বর্তমানে একটি মেট্রো লাইনের কাজ চলমান। আরো পাঁচটি লাইন ২০৩০ সালের মধ্যে নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। একটি বাস র্যাপিড ট্রানজিট গড়ে তোলা হচ্ছে বিমানবন্দর-গাজীপুরের মধ্যে। গাজীপুর-নারায়ণগঞ্জের মধ্যে আরো একটি বিআরটি রয়েছে পরিকল্পনায়। সমীক্ষার তথ্য বলছে, ছয়টি মেট্রোরেল ও দুটি বিআরটি ২০৩৫ সাল নাগাদ ঢাকার মোট যাত্রীর মাত্র ১৭ শতাংশ পরিবহনে সক্ষম হবে। সরকারের সেতু বিভাগ ঢাকাকে ঘিরে ২৫৮ কিলোমিটার সাবওয়ে (পাতালরেল) নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার পরিকল্পনা করছে। তিন ধাপে ২০৫০ সাল নাগাদ সাবওয়ের এ নেটওয়ার্কের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। যদিও এসব সাবওয়ে ঢাকার কত শতাংশ যাত্রী পরিবহনে সক্ষম হবে, তা স্পষ্ট করতে পারেননি সেতু বিভাগের কর্মকর্তারা। অন্যদিকে এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের মতো প্রকল্পগুলো বাস্তবায়ন করা হচ্ছে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে ঢাকায় আসা মানুষের যাতায়াত সহজ করার উদ্দেশ্যে। ফলে ঢাকাবাসীর প্রতিদিনকার যাতায়াতে এসব প্রকল্প সেভাবে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে না বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রকল্পগুলো দুর্ভোগেরও কারণ হয়ে উঠছে। ঢাকায় প্রথম মেট্রোরেলের একাধিক স্টেশনের সিঁড়ি নামানো হয়েছে ফুটপাতে। একের পর এক ফ্লাইওভার বানিয়ে ফুটপাত ছোট করে ফেলা হয়েছে। ইউটার্নকে কার্যকর করতে গিয়ে ফুটপাত কমানো হয়েছে।
অপরিকল্পিত, সমন্বয়হীনভাবে করা এসব উন্নয়ন এখন ঢাকার গলার কাঁটায় পরিণত হয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার বর্তমান বিশৃঙ্খলা ও অসহনীয় তীব্র যানজটের জন্য অপরিকল্পিত উন্নয়নকে দায়ী করে তারা বলছেন, যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব পাওয়ার কথা ছিল পাবলিক বাসের। কিন্তু ফ্লাইওভার, ইউটার্ন, ইউলুপের মতো অপরিকল্পিত প্রকল্প বাস্তবায়ন করে বাস চলাচলের ক্ষেত্রটিই সীমিত করে আনা হয়েছে। অদূরদর্শী পরিকল্পনাই ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থাটিকে ক্রমেই মৃতপ্রায় অবস্থার দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
পরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়নে ঢাকার জন্য প্রথম মহাপরিকল্পনা তৈরি করা হয় ২০০৫ সালে। এ কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনাটিকে (এসটিপি) ঢাকার পরিবহন ব্যবস্থার বাইবেল হিসেবে অভিহিত করেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. সামছুল হক। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, এসটিপিতে ৭১টা সুপারিশ করা হয়েছিল। স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদে এসব সুপারিশ বাস্তবায়নের কথা বলা হয়। এগুলো ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের কথা বলা হয়। স্বল্পমেয়াদের সুপারিশগুলো শেষ করে মধ্য মেয়াদেরগুলো বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়। সুপারিশে সবার শেষে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা বলা হয়।
অধ্যাপক সামছুল হক জানান, প্রথম ধাপে পথচারীবান্ধব ফুটপাত তৈরি, সড়কের সক্ষমতা বাড়ানো, সুশৃঙ্খল গণপরিবহন ব্যবস্থার জন্য কোম্পানিভিত্তিক বাস ব্যবস্থা চালুর সুপারিশ ছিল। এসব বাস্তবায়নের পর ফ্লাইওভার, মেট্রোরেল, বিআরটি, এক্সপ্রেসওয়ের মতো প্রকল্প বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয় এসটিপিতে। কিন্তু আমরা হাঁটছি এসটিপির ঠিক উল্টোপথে। আগে ফ্লাইওভার করেছি। এখন মেট্রোরেল, বিআরটি করছি। কিন্তু ফুটপাত, সড়ক আর বাস ব্যবস্থার উন্নতি করিনি। ধারাবাহিকতা মেনে কাজগুলো না করায় বিনিয়োগগুলো কাজে তো লাগছেই না, উল্টো জটিলতা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।
রাজধানীর সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নে ত্রুটি-বিচ্যুতির সবচেয়ে বড় উদাহরণ ১০টি ইউটার্ন। ২০১৬ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ইউটার্নগুলো নির্মাণ করা হয়। ঢাকার জন্য তৈরি করা সরকারের কৌশলগত পরিকল্পনায় না থাকলেও দৃশ্যমান উন্নয়ন দেখাতে গিয়ে অনেকটা জোর করেই ইউটার্নগুলো তৈরি করেছে সিটি করপোরেশন। প্রায় ৩২ কোটি টাকা খরচ করে তৈরি করা ইউটার্নগুলো যানজট কমানোর বদলে উল্টো বাড়িয়ে দিয়েছে।
গণপরিবহন ব্যবস্থা ভালো না হওয়ায় বাড়ছে মোটরসাইকেল ও ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা। বিশেষ করে গত এক দশকে ঢাকায় মোটরসাইকেলের সংখ্যা বেড়েছে প্রায় সাড়ে চার গুণ। রাজধানীতে চলমান যানবাহনের অর্ধেকই মোটরসাইকেল। অতিরিক্ত পরিমাণে মোটরসাইকেল সড়কে বিশৃঙ্খলা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রাণঘাতী দুর্ঘটনারও কারণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য বলছে, গত ছয় বছরে রাজধানীতে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনা প্রায় তিন গুণ বেড়েছে।
দুর্বল গণপরিবহন ব্যবস্থা মোটরসাইকেলের পাশাপাশি ঢাকায় ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা বৃদ্ধিতেও বড় ভূমিকা রেখেছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) তথ্য বলছে, ১০ বছর আগেও ঢাকা মহানগরে নিবন্ধিত ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যা ছিল (প্রাইভেট কার) ১ লাখ ৭০ হাজারের মতো। বর্তমানে এ সংখ্যা সোয়া তিন লাখের কাছাকাছি চলে এসেছে।
লাগামহীনভাবে যানবাহনের সংখ্যা বৃদ্ধিকে ঢাকার যানজটের প্রধান কারণ হিসেবে অভিহিত করছেন বিশেষজ্ঞরা। ১০ বছরের ব্যবধানে পৌনে ৬ লাখ থেকে ১৮ লাখে উন্নীত হয়েছে ঢাকার নিবন্ধিত মোটরযান। যদিও এ সময় নগরীতে গণপরিবহন বাড়েনি। এক দশকে ঢাকায় মিনিবাসের সংখ্যা বেড়েছে মাত্র দেড় হাজার। বিপরীতে এ সময়ে আয়ুষ্কাল শেষ হয়ে ‘অফ রোড’ হয়েছে কয়েক হাজার বাস। পরিবহন মালিকদের হিসাবে বর্তমানে ঢাকায় চলাচল করা পাবলিক বাসের সংখ্যা কম-বেশি পাঁচ হাজার।
ঢাকার সিংহভাগ মানুষের যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম পাবলিক বাস। সমীক্ষার তথ্য বলছে, ঢাকায় প্রতিদিন যত ট্রিপ হয়, তার ৬৪ শতাংশই হয় বাসে। যানজট কমিয়ে ঢাকা শহরে মানুষের যাতায়াতের গতি আনতে বাস ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানোর কথা বলে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। এমনকি ২০০৫ সালে ঢাকার জন্য যে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) তৈরি করা হয়েছিল, তাতেও বাস ব্যবস্থাপনাটি আধুনিকায়নের সুপারিশ ছিল। একই সঙ্গে ছিল বাসবান্ধব যোগাযোগ অবকাঠামো তৈরির সুপারিশ। কিন্তু ঢাকার প্রধান গণপরিবহন পাবলিক বাসের আধুনিকায়ন বরাবরই থেকেছে উপেক্ষিত। এর জন্য পুলিশ-প্রশাসন-রাজনীতিবিদ-বাস মালিকদের সমন্বিত প্রভাবশালী সিন্ডিকেটকে দায়ী করছেন সংশ্লিষ্টরা।
রাজধানীর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ গণপরিবহন সিএনজিচালিত অটোরিকশা। সরকার ব্যক্তিগত গাড়ির সংখ্যায় কোনো নিয়ন্ত্রণ আরোপ না করলেও সিএনজিচালিত অটোরিকশার সংখ্যা ১৫ হাজারের মধ্যে সীমিত রেখেছে। চাহিদার চেয়ে সংখ্যায় কম হওয়ায় এসব বাহনও ঢাকার মানুষের যাতায়াতে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। ট্যাক্সিক্যাব সেবাও এখন মৃতপ্রায়। গণপরিবহনের এ সংকটের কারণে সামর্থ্যবানরা এখন ব্যক্তিগত গাড়ির দিকে ঝুঁকে পড়েছেন।
ঢাকার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন করছে সরকারের একাধিক মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও সংস্থা। উন্নয়নকাজগুলো সমন্বয়ের জন্য গঠন করা হয়েছে ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষ (ডিটিসিএ)। ঢাকার উন্নয়নের জন্য যে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা তৈরি করা হয়েছে, তার প্রধান বাস্তবায়নকারীও এ সংস্থা।
ঢাকার বিশৃঙ্খল গণপরিবহন ব্যবস্থা ও অসহনীয় যানজটের বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে ডিটিসিএর নির্বাহী পরিচালক ও মহাসড়ক বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (আরবান ট্রান্সপোর্ট) নীলিমা আখতার বণিক বার্তাকে বলেন, ঢাকার যানজট ও বিশৃঙ্খল পরিবহন ব্যবস্থাটি যেমন একদিনে তৈরি হয়নি, তেমনি এটাকে একদিনের মধ্যে ঠিক করাও সম্ভব নয়। যানজট পরিস্থিতির উন্নয়ন করে ঢাকার জন্য একটি কার্যকর পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও সেগুলোর বাস্তবায়ন। সরকার কিন্তু এগুলো করে যাচ্ছে। এসটিপি সংশোধন করে আসএসটিপি করা হয়েছে। মেট্রোরেল, বিআরটির মতো একসঙ্গে অনেক মানুষ যাতায়াত করতে পারে, এমন যাতায়াত ব্যবস্থা গড়ে তোলা হচ্ছে। ট্রাফিক ব্যবস্থার উন্নয়নে কাজ করা হচ্ছে। আবার যোগাযোগ ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে আবাসন পরিকল্পনাও করা হচ্ছে। আমি মনে করি এগুলোর যথাযথ বাস্তবায়নের মাধ্যমে ঢাকার বিদ্যমান সমস্যাগুলো অনেকটাই সমাধান করা সম্ভব হবে।










