বরিশালে এ বছর ৩ হাজার ৬৭২ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে গত দেড় মাসে আক্রান্ত হয়েছেন প্রায় দুই হাজার। এখন পর্যন্ত ২০ জন মারা গেছেন। আক্রান্তে ৮৭ শতাংশ রোগীই গ্রাম থেকে আসা। তবে রোগীরা সুস্থ হওয়ার পরও শরীরে থেকে যাচ্ছে ভাইরাস। আর এ ধরনের ডেঙ্গুর নতুন ভ্যারিয়েন্ট বলছেন চিকিৎসকরা। এসব বিষয় ভাবিয়ে তুলেছে চিকিৎসাসংশ্লিষ্টদের। এ নিয়ে আরো গবেষণার দরকার রয়েছে বলে মনে করেন চিকিৎসকরা।

বরিশাল শের-ই-বাংলা চিকিৎসা মহাবিদ্যালয় (শেবাচিম) হাসপাতালের সহকারী পরিচালক (প্রশাসন) ডা. মো. রেজওয়ানুর আলম বলেন, ‘ডেঙ্গুর ভ্যারিয়েন্ট আমরা রোগীর রোগ থেকে নির্ধারণ করে থাকি। এবার বেশির ভাগ রোগী ক্লাসিক্যাল ডেঙ্গুতে আক্রান্ত। এদের জ্বর থাকে কম সময়, কিন্তু ডায়রিয়া, বমি ও তীব্র মাথাব্যথা থাকছে বেশি। রোগ সেরে যাওয়ার পরও রোগীর শরীরে ডেঙ্গুর আলামত পাওয়া যাচ্ছে। এটা ডেঙ্গুর নতুন ভ্যারিয়েন্টের হলেও হতে পারে। এটা এখন গবেষণার বিষয়। তা ছাড়া শহরের চেয়ে ৮৭ শতাংশ রোগী মিলছে গ্রামের।’

এদিকে চিকিৎসকদের এমন তথ্যের মিল পাওয়া গেছে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অফিসের সাম্প্রতিক মাঠ পর্যায়ের গবেষণায়। সম্প্রতি ১০টি স্পটে ডেঙ্গুর সন্ধান চালিয়ে ছয়টিতে ডেঙ্গুর লার্ভা পাওয়া গেছে। গবেষণায় অংশ নেয়া ব্যক্তিরা জানান, আগের মতো নির্ধারিত কিছু স্থান যেমন পরিত্যক্ত টায়ার, ফুলের টব কিংবা টিনের চালে ডেঙ্গুর লার্ভা মিলছে না। বরং কেটে ফেলা গাছের গর্তে জমে থাকা খোলা স্বচ্ছ পানিতেও লার্ভা মিলছে। তাদের মতে, বৃষ্টি বেশি হওয়ায় জমে থাকা সব পানিতেই লার্ভা মিলছে।

এ ব্যাপারে বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য অফিসের কীটতত্ত্ববিদ মাহফুজা পারভীন বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমরা আমাদের গবেষণার সময় এমন বাড়িও পেয়েছি, যেখানে তিন থেকে চার ধারেই ডেঙ্গুর লার্ভা ছিল। আমরা আগে নির্দিষ্ট কিছু স্থানে জমে থাকা পানিতে লার্ভা পেতাম, কিন্তু এবার সদ্য কেটে ফেলা নারিকেল গাছের গর্তে জমে থাকা পানিতেও লার্ভা পেয়েছি। লার্ভা মেরে ফেলার বিষয়ে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে সচেতনতা রয়েছে, কিন্তু অবহেলা ও অলসতার কারণে পানি পরিষ্কার করছে না। পানি পরিষ্কার করলেও সঠিক নিয়মে করছে না।’

বরিশাল বিভাগের বরগুনা জেলায় এ পর্যন্ত সবচেয়ে বেশি ১ হাজার ২৬ জন ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়েছেন। বরিশাল মেডিকেলে সবচেয়ে বেশি ২০ জন মারা গেলেও প্রত্যেকে বরগুনা ও পটুয়াখালী জেলার গ্রামাঞ্চলের।

রোগীর স্বজনরা বলেছেন, মেডিকেল বা সরকারি হাসপাতাল পর্যন্ত অনেক রোগী আসতে পারছেন না। গ্রামে এখনো বহু লোক ডেঙ্গু আক্রান্ত। জ্বর হওয়ার পর ডেঙ্গু ধরা পড়ে। সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় ডায়রিয়া। একসঙ্গে দুটি রোগের দিকে নজর দিতে গিয়ে রোগীর অবস্থা সংকটপূর্ণ হয়ে পড়ছে।

ডেঙ্গু আক্রান্ত এক রোগীর স্বজন বলেন, ‘ঢাকা থেকে জ্বর নিয়ে আমার স্বামী বরিশালে এসেছিলেন। পরীক্ষার পর ডেঙ্গু ধরা পড়ে। তার সারা শরীর ঘামছিল। গ্রাম থেকে শহরে চিকিৎসার জন্য আনতে গিয়ে আরো দুর্বল হয়ে পড়েন।’

বিভাগীয় স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্যমতে, এবার অতিবৃষ্টির কারণে রাস্তাঘাটে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়া ডেঙ্গুর বিস্তারের কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে। গত দুই মাসে ১ হাজার ৪০০ মিলিমিটার বৃষ্টির রেকর্ড করা হয়েছে বরিশাল অঞ্চলে। রোগীর চিকিৎসা করছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। তবে ডেঙ্গু প্রতিরোধে দরকার সমন্বিত প্রচেষ্টা।

এ ব্যাপারে বরিশাল স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. শ্যামল চন্দ্র মণ্ডল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বরিশালে যেহেতু এডিস মশা রয়েছে, তাই এবার অতিবৃষ্টির কারণে সৃষ্ট জলাবদ্ধতায় এদের প্রজননও হচ্ছে বেশি। সংগত কারণে রোগীও মিলছে বেশি। আমরা সবাই মিলে কাজ করলে ডেঙ্গু প্রতিরোধ সম্ভব। সচেতন থাকলে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে। স্বাস্থ্য বিভাগ এ নিয়ে কাজ করছে। তবে বরিশালে ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে সন্মিলিত কোনো উদ্যোগ গ্রহণ বা বাস্তবায়নের কোনো খবর এখন পর্যন্ত পাওয়া যায়নি।’