যশোরের অভয়নগর উপজেলার নওয়াপাড়া বাণিজ্যিক এলাকা হিসেবে পরিচিত। নৌ, স্থল আর রেলপথ তিন যোগাযোগ সুবিধার কারণে নওয়াপাড়ায় গড়ে উঠেছে ব্যবসা কেন্দ্র। কিন্তু যে নদ ঘিরে চলছে সবকিছু, সেই ভৈরব নদ নাব্য হারিয়ে এখন মৃতপ্রায়। নদের মধ্যে জেগে উঠেছে চর। এসব কারণে নৌ-বন্দর অচল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। নদ খনন ও অবৈধ দখলমুক্ত করা না গেলে নৌযান চলাচল বন্ধ হতে পারে বলে আশঙ্কা ব্যবসায়ীদের।

তবে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডাব্লিউটিএ) বলছে, নদের নাব্য সংকট নিরসনে ৪৫৪ কোটি টাকার প্রকল্প অর্থ মন্ত্রণালয় ছাড় করেছে। এ প্রকল্পে বদলে যাবে নওয়াপাড়া নৌ-বন্দর।

‘নওয়াপাড়া নদীবন্দর এলাকায় টার্মিনালসহ বন্দর সুবিধাদী নির্মাণ’ নামের এ প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশীদ বলেন, ‘একনেকে প্রকল্প পাস হলেই যত দ্রুত সম্ভব বন্দরের কাজ শুরু হবে।’

নদের প্রাণ ফেরাতে দীর্ঘদিন আন্দোলন করছেন বলে জানিয়েছেন বন্দরের হ্যান্ডলিং শ্রমিক নেতা ফাল্গুন মণ্ডল। তিনি বলেন, ‘ভৈরবে নাব্য নেই। নদের মধ্যে জেগে উঠেছে চর। নামকাওয়াস্তে চলছে ড্রেজিং, দৃশ্যমান কিছুই হচ্ছে না। নওয়াপাড়া নৌ-বন্দরে এখন জাহাজের সংখ্যা দিন দিন কমছে। এমন চলতে থাকলে আগামী দু-এক বছরের মধ্যে নওয়াপাড়া নৌ-বন্দর শুধু নামেই থাকবে। ১০ বছর ধরে নদ খনন করে দুই পাশে গাইড ওয়াল নির্মাণ করে বন্দরকে বাঁচাতে আন্দোলন সংগ্রাম করছি আমরা।’

যশোরের অভয়নগর উপজেলা শহর নওয়াপাড়ার ওপর দিয়ে বয়ে গিয়েছে ভৈরব নদ এবং যশোর-খুলনা রেলপথ ও মহাসড়ক। এ তিন পথ নওয়াপাড়ায় সমান্তরালে ১৫০-২০০ মিটার দূরত্বে রয়েছে। তিন পথের যোগাযোগ সুবিধার কারণে নওয়াপাড়া ব্যবসা-বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে। বছরে বিদেশ থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকার আমদানি পণ্য এখানে খালাস হয়। এখান থেকে সারা দেশে যায় রাসায়নিক সার, কয়লা, খাদ্যশস্য ও পাথর। শুধু আমদানি পণ্য নয়, প্রায় হাজার কোটি টাকার অভ্যন্তরীণ পণ্যের বড় বাজার নওয়াপাড়া। যে নদ ঘিরে গড়ে উঠেছে এ ব্যবসাকেন্দ্র, সেই ভৈরব এখন ধুঁকছে। দখল ও ভরাটের কারণে নদটি সরু হয়ে গিয়েছে। ব্যবসায়ী ও শ্রমিকদের দাবির পরও দখলমুক্ত হচ্ছে না নদ, হচ্ছে না নিয়মিত খনন।

অভয়নগর নওয়াপাড়া পৌর হ্যান্ডলিং শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি ফাল্গুন মণ্ডল জানান, এ নৌ-বন্দরে ৩০ হাজারের বেশি শ্রমিক কাজ করেন। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে অভয়নগর, মণিরামপুর, কেশবপুর ও বাঘারপাড়াসহ আশপাশের অসংখ্য মানুষের জীবন-জীবিকা। বন্দরে ৫০০-১ হাজার ৫০০ টন পণ্যবাহী জাহাজ নোঙর করে, কিন্তু নাব্য সংকটে এখন আগের মতো জাহাজ ভেড়ে না। এভাবে চলতে থাকলে আগামী দু’এক বছরের মধ্যে নওয়াপাড়া নৌ-বন্দর অচল হয়ে যাবে।

নদের মধ্যে জেগে উঠেছে চর। এসব কারণে নৌ-বন্দর অচল হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।

নাব্য হারিয়ে ভৈরব নদ এখন নালায় পরিণত হয়েছে বলে জানিয়েছেন নওয়াপাড়া সার, সিমেন্ট ও খাদ্যশস্য ব্যবসায়ী সমিতির সাধারণ সম্পাদক শাহ জালাল হোসেন। তিনি বলেন, ‘এ নৌ-বন্দরের অন্যতম সমস্যা ভৈরব নদের নাব্যতা নেই। নদের ভেতরে পলি জমে তা ভরাট হয়ে গেছে। আগে যে সংখ্যক জাহাজ ভিড়ত; এখন তার অর্ধেকে নেমে এসেছে। জেটি থেকে দুই-আড়াইশ ফিট দূরে জাহাজ ভিড়ে। বাঁশের সাঁকো তৈরি করে শ্রমিকদের দিয়ে মালপত্র আনলোড করা হচ্ছে। এতে ব্যয় বাড়ছে, প্রক্রিয়াও বিলম্ব হচ্ছে। আগে মালপত্র খালাস করতে ১৫-২০ দিন লাগলেও এখন তা মাস ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ফলে জাহাজের জন্য আলাদা ক্ষতিপূরণ দিতে হচ্ছে। সে কারণে অনেকে এখন আগ্রহ হারাচ্ছেন এ বন্দর ব্যবহারে। আগে প্রতিদিন ঘাটে চার শতাধিক কার্গো থাকত; এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে।’

জরুরি ভিত্তিতে নদের ড্রেজিং প্রক্রিয়া সম্পন্নের তাগিদ দিয়ে তিনি আরো বলেন, ‘এখন নদে দু-একটি ড্রেজিং মেশিন রয়েছে। সেগুলো দিয়ে কাজের কাজ হচ্ছে না। পরিকল্পিতভাবে দ্রুত নদের ড্রেজিং করতে হবে।’

একই কথা জানিয়েছেন অভয়নগর উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও ব্যবসায়ী এনামুল হক বাবুল। তিনি বলেন, ‘ভৈরব নদের বুকে বিভিন্ন স্থানে চর জেগে উঠেছে। নদের মূল চ্যানেল খালের চেয়ে সরু হয়ে গিয়েছে। বিআইডাব্লিউটিএ বলছে, ড্রেজিংয়ের স্পয়েল ফেলার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। আসলে কথাটি ঠিক নয়। নতুন ব্রিজের ওপর দাঁড়ালে দেখা যায় জোয়ারের সময় বার্জগুলো কাদার ওপরে পড়ে রয়েছে। অর্থাৎ পলি পড়ে নদের বুক ভরাট হয়ে গিয়েছে।’

অবিলম্বে নদের পলি অপসারণে ড্রেজিং চালু ও নদের জায়গা দখলমুক্ত করার দাবি জানিয়ে এনামুল হক বাবুল বলেন, নদ না থাকলে এ অঞ্চলের ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাবে। এছাড়া অভয়নগরে এক্সপোর্ট প্রসেসিং জোন (ইপিজেড) নির্মাণ হচ্ছে। আধুনিক নৌ-বন্দরের যে প্রকল্প এরই মধ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ছাড় করা হয়েছে, তা দ্রুত বাস্তবায়নের দাবি জানাই।

নওয়াপাড়া নৌ-বন্দরে পর্যাপ্ত ড্রেজিং ব্যবস্থা চালুর কথা উল্লেখ করেছেন যশোর চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সাবেক সভাপতি ও আমদানিকারক মিজানুর রহমান খান। তিনি বলেন, ‘যেন বড় বড় জাহাজ এ বন্দরে আসতে পারে সেজন্য একটি অবকাঠামো তৈরি করা দরকার। ব্রিজের ওপাশের সড়কের অবস্থা করুণ। সেখানে সংস্কার ও প্রশস্ত করে ভারী ট্রাক চলাচলের ব্যবস্থা করা না গেলে এখানকার ব্যবসার বাজার নষ্ট হয়ে যাবে। বন্দরের অবকাঠামো ও সেবার মান বাড়ালে ব্যবসায়ীরা আরো আগ্রহী হবেন। ব্যবসা-বাণিজ্য আরো বাড়বে।’

ভৈরব নদে ড্রেজিং চলছে জানিয়ে নওয়াপাড়া নদীবন্দর কর্তৃপক্ষের উপপরিচালক মাসুদ পারভেজ বলেন, ‘সমস্যা হচ্ছে ড্রেজিংয়ের ফলে স্পয়েল ফেলার জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। সে কারণে ড্রেজিংয়ে ধীরগতি। নৌ-বন্দরের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের স্পয়েল ফেলার জায়গার বিষয়ে বলা হয়েছে। কিন্তু জায়গা পাওয়া যাচ্ছে না। এরই মধ্যে অনেক নিচু এলাকা ভরাট হয়ে গিয়েছে। তবে প্রকল্পের কাজ শুরু করা হলে ড্রেজিংয়ের জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন মেশিন আনা গেলে স্পয়েল ফেলার সুবিধা হবে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, নৌ-পরিবহনের মাধ্যমে মালপত্রের সুষ্ঠু নিরাপদ ও নিরবচ্ছিন্ন ওঠানামা নিশ্চিতকরণ এবং পরিবহন খাতে নৌ-পরিবহনের অংশীদারত্ব বৃদ্ধিকরণের লক্ষ্যে ‘নওয়াপাড়া নদীবন্দর এলাকায় টার্মিনালসহ বন্দর সুবিধাদি নির্মাণ’ শীর্ষক একটি প্রকল্প সম্প্রতি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে ছাড় করা হয়েছে। নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের অধীন এ প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয়েছে ৪৫৪ কোটি ১৩ লাখ টাকা, যা বাস্তবায়ন করবে বিআইডাব্লিউটিএ। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল জুলাই ২০২১ থেকে জুন ২০২৪। নিজস্ব অর্থায়নে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করা হবে। প্রকল্পের অধীনে নিরাপদ নৌ-চলাচলের জন্য প্রায় দুই লাখ ঘনমিটার ড্রেজিং, ১৮ দশমিক পাঁচ একর ভূমি অধিগ্রহণ ও দশমিক আট লাখ ঘনমিটার ভূমি উন্নয়ন, ৯ হাজার ৬০০ বর্গমিটার আরসিসি কি ওয়াল, ২২ হাজার বর্গমিটার পার্কিং ইয়ার্ড, ১২ হাজার বর্গমিটার স্লোপ প্রটেকশন নির্মাণ, ৫৪০ বর্গমিটার বন্দর ভবন, প্রায় সাত হাজার ১৬৮ বর্গমিটার মালপত্র মজুদ এলাকা এবং শ্রমিক বিশ্রামাগার নির্মাণ করা হবে। এর ফলে নওয়াপাড়া পূর্ণাঙ্গ নৌ-বন্দর হিসেবে যাত্রা শুরু করতে পারবে।

নওয়াপাড়া নদীবন্দর এলাকায় টার্মিনালসহ বন্দর সুবিধাদি নির্মাণ প্রকল্পের কাজে নিয়োজিত দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মামুন উর রশীদ বলেন, ‘সম্পূর্ণ নিজস্ব অর্থায়নে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে পাস হয়েছে। এটি একনেকে ছাড় পেলেই নওয়াপাড়া নৌ-বন্দর এলাকায় টার্মিনালসহ বন্দর সুবিধাদি; বিশেষ করে নদের ড্রেজিং ব্যবস্থা দ্রুত সম্পন্ন করার ব্যবস্থা নেয়া হবে।’

অভয়নগর উপজেলার তালতলার নওয়াপাড়ায় নদীবন্দরের কার্যক্রম শুরু হয় ২০০৭ সালের মে মাসে।