ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথকে ডাবল লাইনে উন্নীত করার লক্ষ্যে কিশোরগঞ্জে মেঘনা নদীতে ভারতীয় নমনীয় ঋণে (এলওসি) তৈরি করা হয়েছে দ্বিতীয় ভৈরব সেতু। ২০১৭ সালে চালু হওয়া সিঙ্গেল লাইনের সেতুটি নির্মাণে খরচ হয়েছে ৫৬৮ কোটি টাকা। নতুন ভৈরব সেতু ও পুরনো ভৈরব সেতুর মাধ্যমে মেঘনা নদীতে ডাবল লাইন হয়েছে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলপথ। তবে পুরনো সেতুটির আয়ুষ্কাল শেষ পর্যায়ে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে পাঁচ বছর আগে তৈরি করা সিঙ্গেল লাইনের সেতুটির উপযোগিতা নিয়ে উঠছে প্রশ্ন। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) বলছে, নতুন সেতুটি সিঙ্গেল লাইনের হওয়ায় ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে করিডোরটি নিরবচ্ছিন্ন হবে না। নতুন করে আরেকটি সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তার কথাও জানিয়েছে আইএমইডি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নতুন সেতুটি ডাবল লাইন করে তৈরি করলেই এ সমস্যায় পড়তে হতো না। এতে হয়তো নির্মাণ ব্যয় কিছু বাড়ত, কিন্তু সেই বিনিয়োগটি হতো টেকসই। আর রেললাইনে বিনিয়োগ অন্তত ১০০ বছরের হিসাব করে করতে হয়। সেখানে চার-পাঁচ বছরের মাথায় সেতুর উপযোগিতা শেষ হয়ে গেলে তা হবে মারাত্মক রকমের অদূরদর্শী পরিকল্পনা। এর মাধ্যমে একদিকে যেমন রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থের অপচয় হবে, তেমনি জনগণ পড়বে চরম ভোগান্তিতে। কারণ নতুন করে সেতু তৈরি করতে গেলে ট্রেন চলাচল বিঘ্নিত হয়ে বাড়বে জনদুর্ভোগ।

দ্বিতীয় ভৈরব সেতুটি নির্মাণ করা হয় রেলওয়ে অ্যাপ্রোচসহ দ্বিতীয় ভৈরব ও দ্বিতীয় তিতাস সেতু নির্মাণ প্রকল্পের মাধ্যমে। ভারতে ঋণের এ প্রকল্পটি ২০১০ সালে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে অনুমোদিত হয়। নির্মাণ ব্যয় ধরা হয় ৯৫৯ কোটি টাকা। ২০১৪ সালে কাজ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সেতুটি চালু হয় ২০১৭ সালের নভেম্বরে।

প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য ছিল মেঘনা নদীর ওপর দ্বিতীয় ভৈরব সেতু ও ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তিতাস নদীর ওপর দ্বিতীয় তিতাস সেতু নির্মাণের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে করিডোরকে নিরবচ্ছিন্ন ডাবল লাইনে উন্নীত করা। চালুর পর থেকেই নতুন ও পুরনো সেতু দুটি আপ ও ডাউন ট্রেন চলাচলের জন্য পৃথকভাবে ব্যবহার হয়ে আসছে।

কিন্তু আইএমইডির পর্যবেক্ষণ বলছেন, স্বাধীনতা যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পর মেরামত করে চালু করা পুরনো ভৈরব সেতুটির আয়ুষ্কাল শেষ পর্যায়ে চলে এসেছে। এমন পরিপ্রেক্ষিতে পুরনো সেতুর ওপর দিয়ে ট্রেন চলাচল দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। দ্রুতই পুরনো সেতু অকার্যকর হয়ে যাবে। ফলে ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন ডাবল লাইন করার যে উদ্দেশ্য নিয়ে নতুন দ্বিতীয় ভৈরব সেতুটি তৈরি করা হয়েছে, সেই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন হবে না। নতুন সেতু নির্মাণ করা না হলে ঢাকা-চট্টগ্রাম রেলওয়ে করিডোরে নিরবচ্ছিন্ন ডাবল লাইন নিশ্চিত হবে না। এমন পরিপ্রেক্ষিতে রেলপথ মন্ত্রণালয়কে ঢাকা-চট্টগ্রাম করিডোর নিরবচ্ছিন্ন ডাবল লাইন নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে আইএমইডি।

রেলওয়ে অ্যাপ্রোচসহ দ্বিতীয় ভৈরব ও দ্বিতীয় তিতাস সেতু নির্মাণ প্রকল্পে সর্বশেষ প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন আফজাল হোসেন, যিনি বর্তমানে পদ্মা সেতু রেল সংযোগ প্রকল্পে প্রকল্প পরিচালকের দায়িত্বে আছেন। আফজাল হোসেনও মনে করেন ভৈরব ও তিতাস রেলসেতু দুটি ডাবল লাইনে তৈরি করা হলে সবচেয়ে ভালো হতো। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, এ ধরনের একটি সেতু নির্মাণের জন্য অনেক আয়োজন লাগে। সময় ও অর্থের প্রয়োজন হয়। শুরুতেই ডাবল লাইন করে তৈরি করা হলে আজকে এখানে নতুন করে সেতু নির্মাণের প্রয়োজন হতো।

ভৈরব সেতু ডাবল লাইন না করার কারণ সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি প্রকল্পটির দায়িত্বে ছিলাম একেবারে শেষ পর্যায়ে। তখন সেতুটি চালুর পর ঠিকাদারদের ডিফেক্ট লায়াবিলিটি পিরিয়ড চলমান ছিল। সে সময় আসলে ডাবল লাইন করার কোনো সুযোগই ছিল না। আর কোনো সেতু ডাবল লাইন নাকি সিঙ্গেল লাইন হবে সেটা নির্ভর করে বাজেটের ওপর। হয়তো নির্মাণ শুরুর সময় পর্যাপ্ত বাজেট ছিল না বলেই সেতুটি সিঙ্গেল লাইনে তৈরি করা হয়েছে।