দেশের বন্ড মার্কেটকে গতিশীল ও জনপ্রিয় করে তোলার লক্ষ্যে ২০২০ সালের মে মাসে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (বিএসইসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক শিবলী রুবাইয়াত-উল-ইসলামের নেতৃত্বাধীন কমিশন। বিএসইসির এ উদ্যোগের ফলে আগের তুলনায় বন্ডের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের পরিমাণ বেড়েছে। বেড়েছে তালিকাভুক্ত বন্ডের সংখ্যাও। তবে তালিকাভুক্ত হলেও স্টক এক্সচেঞ্জে করপোরেট বন্ডের লেনদেনের গতি অত্যন্ত ধীর।

ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) বর্তমানে পাঁচটি করপোরেট বন্ড তালিকাভুক্ত রয়েছে। এগুলো হচ্ছে এআইবিএল মুদারাবা পারপেচুয়াল বন্ড, এপিএসসিএল নন-কনভার্টিবল অ্যান্ড ফুললি রিডিমেবল কুপন বিয়ারিং বন্ড, আইবিবিএল সেকেন্ড পারপেচুয়াল মুদারাবা বন্ড, আইবিবিএল মুদারাবা পারপেচুয়াল বন্ড এবং এসজেআইবিএল মুদারাবা পারপেচুয়াল বন্ড। এর মধ্যে এআইবিএল মুদারাবা পারপেচুয়াল বন্ড, আইবিবিএল সেকেন্ড পারপেচুয়াল মুদারাবা বন্ড ওএসজেআইবিএল মুদারাবা পারপেচুয়াল বন্ড গত বছর স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হয়েছে। এপিএসসিএল নন-কনভার্টিবল অ্যান্ড ফুললি রিডিমেবল কুপন বিয়ারিং বন্ড ২০২০ সালে এবং আইবিবিএল মুদারাবা পারপেচুয়াল বন্ডটি ২০০৭ সালে তালিকাভুক্ত হয়। তালিকাভুক্ত পাঁচ করপোরেট বন্ডের মধ্যে এপিএসসিএল নন-কনভার্টিবল অ্যান্ড ফুললি রিডিমেবল কুপন বিয়ারিং বন্ড ও আইবিবিএল মুদারাবা পারপেচুয়াল বন্ড দুটি স্টক এক্সচেঞ্জে অভিহিতমূল্যের চেয়ে বেশি দরে লেনদেন হচ্ছে। আর বাকি তিনটি বন্ডের দর বর্তমানে অভিহিত মূল্যের নিচে রয়েছে।

স্টক এক্সচেঞ্জে এ পাঁচ বন্ডের লেনদেনের পরিমাণ অনেক কম। গত সপ্তাহের শেষ কার্যদিবস বৃহস্পতিবার এআইবিএল মুদারাবা পারপেচুয়াল বন্ডের ১৫ হাজার, এপিএসসিএল নন-কনভার্টিবল অ্যান্ড ফুললি রিডিমেবল কুপন বিয়ারিং বন্ডের ১১ হাজার, আইবিবিএল সেকেন্ড পারপেচুয়াল মুদারাবা বন্ডের ৫৮ হাজার, আইবিবিএল মুদারাবা পারপেচুয়াল বন্ডের ২১ হাজার এবং এসজেআইবিএল মুদারাবা পারপেচুয়াল বন্ডের ২৪ হাজার কোটি টাকার লেনদেন হয়েছে। গত বছর তালিকাভুক্ত তিন বন্ডের এখন পর্যন্ত লেনদেনের পরিমাণ ছিল খুবই কম। অন্যদিকে এর আগের তালিকাভুক্ত দুই বন্ড এপিএসসিএল নন-কনভার্টিবল অ্যান্ড ফুললি রিডিমেবল কুপন বিয়ারিং বন্ড ও আইবিবিএল মুদারাবা পারপেচুয়াল বন্ডের ক্ষেত্রে গত দুই বছরে মাঝে মধ্যে কিছু পরিমাণে লেনদেন হতে দেখা গেছে।

দেশে একটি কার্যকর ও গতিশীল বন্ড মার্কেট গড়ে তোলার জন্য বিশ্বব্যাংক, এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকসহ (এডিবি) বিদেশী দাতাগোষ্ঠীরা দীর্ঘদিন ধরেই তত্পর রয়েছে। এডিবির সহায়তার বাস্তবায়িত পুঁজিবাজার উন্নয়ন প্রকল্পের অন্যতম শর্ত ছিল বন্ড মার্কেটকে গতিশীল করা। শিবলী কমিশন দায়িত্ব নেয়ার পর বন্ড মার্কেটকে গতিশীল করতে আইনি ও কাঠামোগত বেশকিছু সংস্কারমূলক উদ্যোগ গ্রহণ করে। বিশেষ করে পারপেচুয়াল বা বেমেয়াদি বন্ডের মাধ্যমে মূলধন উত্তোলনের ক্ষেত্রে বাধ্যতামূলকভাবে এর ১০ শতাংশ স্টক এক্সচেঞ্জে পাবলিক অফারের মাধ্যমে সংগ্রহের শর্ত দেয়া হয়। এ শর্তের কারণেই তালিকাভুক্ত করপোরেট বন্ডের সংখ্যা বর্তমানে পাঁচটিতে দাঁড়িয়েছে। এছাড়া বিদ্যমান ১১টি পারপেচুয়াল বন্ডকেও এ শর্ত পরিপালনের জন্য ডিরেক্ট লিস্টিংয়ের মাধ্যমে ১০ শতাংশ ইউনিট বিদ্যমান বাজার দরে অফলোড করতে হবে।

বন্ড মার্কেটকে জনপ্রিয় করতে বিএসইসির নেয়া আরেকটি বড় উদ্যোগ হচ্ছে পুঁজিবাজার মধ্যস্থতাকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বন্ডে বিনিয়োগ বাধ্যতামূলক করে দেয়া। কমিশনের নির্দেশনা অনুসারে, মার্চেন্ট ব্যাংকার, পোর্টফোলিও ম্যানেজার, সম্পদ ব্যবস্থাপক ও স্টক ডিলারদের তাদের তহবিলের ন্যূনতম ৩ শতাংশ তালিকাভুক্ত বন্ডে বিনিয়োগ করতে হবে। এজন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে এ বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত সময় দেয়া হয়েছে।

বন্ডের লেনদেনের জন্য প্লাটফর্ম গড়ে তুলতেও বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে বিএসইসি। এর মধ্যে পুঁজিবাজারের আলোচিত ওভার দ্য কাউন্টার (ওটিসি) মার্কেট বিলুপ্তির মাধ্যমে এ মার্কেটের ১৮টি কোম্পানি, ১৪টি বন্ড এবং বেশকিছু বেমেয়াদি মিউচুয়াল ফান্ড তালিকাভুক্তির মাধ্যমে অল্টারনেটিভ ট্রেডিং বোর্ড (এটিবি) চালুর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। একটি উন্নত ও কার্যকর বন্ড মার্কেট প্রতিষ্ঠার জন্য এরই মধ্যে বহুল প্রতীক্ষিত সরকারি ট্রেজারি বন্ডের পরীক্ষামূলক লেনদেন সম্পন্ন হয়েছে। প্রয়োজনীয় সিস্টেম ডেভেলপমেন্টের মাধ্যমে সর্বজনীনভাবে দ্রুতই স্টক এক্সচেঞ্জে সরকারি ট্রেজারি বন্ডের লেনদেন শুরুর পরিকল্পনা রয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের তুলনায় বন্ড অনুমোদনের পরিমাণ ও ট্রেডিং প্লাটফর্মের সুবিধা বেড়েছে। কিন্তু তা সত্ত্বেও বন্ডের প্রতি সাধারণ বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা সম্ভব হয়নি। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরাই বন্ডের প্রধান বিনিয়োগকারী। এর বাইরে কিছু ব্যক্তিশ্রেণীর সম্পদশালী বিনিয়োগকারীরা কিছু বন্ড কিনে থাকেন। কিন্তু সাধারণ বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ এক্ষেত্রে নেই বললেই চলে। প্রচার-প্রচারণার ঘাটতিকেই সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বন্ড বিমুখিতার মূল কারণ বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তাছাড়া বন্ডের কিছু বিষয়ে সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশ ব্যাংক ও বিএসইসির মতপার্থক্যের বিষয়টিও স্টক এক্সচেঞ্জে বন্ডের লেনদেনের ক্ষেত্রে প্রভাব রেখেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএসইসির কমিশনার অধ্যাপক ড. শেখ শামসুদ্দিন আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, বন্ডের মতো পণ্যের প্রতি বিনিয়োগকারীরা এখনো অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি। এ কারণেই বন্ডের লেনদেন কম হচ্ছে। এ ঘাটতি দূর করার জন্য বন্ডের বিষয়ে প্রচার-প্রচারণা চালানো প্রয়োজন। বন্ড ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠান এবং স্টক এক্সচেঞ্জের এক্ষেত্রে দায় রয়েছে। তাদের পক্ষ থেকে এ বিষয়ে যথাযথ প্রচার-প্রচরণার ঘাটতি রয়ে গেছে। স্টক এক্সচেঞ্জ এখনো তার গতানুগতিক কার্যক্রমের বাইরে আসতে পারেনি।

তবে বন্ডে লেনদেন কম হওয়ার বিষয়টিকে সাময়িক উল্লেখ করে তিনি বলেন, সরকারি বন্ডের লেনদেন চালু করাসহ আমরা বেশকিছু পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছি। এগুলো বাস্তবায়িত হয়ে গেলে সবকিছু ঠিক হয়ে যাবে। তাই এখন বন্ডে লেনদেন কম হচ্ছে বলে হতাশ হওয়ার কিছু নেই।