দেশে গ্যাস সরবরাহ কমে যাওয়ায় সংকটে পড়েছে শিল্প-কারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর উৎপাদন। বিশেষ করে গ্যাসের অভাবে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় তীব্র হয়েছে লোডশেডিং। এমন পরিস্থিতিতে বিদ্যুৎকেন্দ্র ও শিল্পে গ্যাসের ঘাটতি মেটাতে সিএনজি আকারে ভোলার গ্যাস ব্যবহারের পরিকল্পনা করছে পেট্রোবাংলা। এরই মধ্যে একটি কমিটিও গঠন করা হয়েছে।
পেট্রোবাংলার নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, ভোলা থেকে সিএনজি আকারে গ্যাস ব্যবহার করতে মূলত ‘ক্যাসকেড’ পদ্ধতির পরিকল্পনা করা হচ্ছে। ক্যাসকেড হচ্ছে উচ্চচাপের গ্যাস সিলিন্ডার স্টোরেজ সিস্টেম, যেখানে অনেকগুলো ছোট ছোট সিলিন্ডার থাকে। কম্প্রেসার দিয়ে সেগুলো রিফিল করে অন্যত্র পরিবহন করা হয়। এরপর সেই গ্যাস বিতরণ কোম্পানির পাইপলাইনে কিংবা সরাসরি শিল্প এলাকায় বিতরণ করা হয়। তবে এ পরিকল্পনা এখনই চূড়ান্ত কোনো কিছু নয় বলে জানিয়েছেন পেট্রোবাংলা সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা। সিএনজি আকারে গ্যাস সরবরাহের এ পরিকল্পনা কতটুকু বাস্তবসম্মত, ব্যবহার উপযোগী ও বৈশ্বিকভাবে কীভাবে সরবারাহ করা হয়—সেসব দিক খতিয়ে দেখতেই পেট্রোবাংলার কমিটি কাজ করছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা বণিক বার্তাকে বলেন, সিএনজি প্রযুক্তিতে গ্যাস ব্যবহার, পরিবহন, ঝুঁকিসহ নানা ধরনের বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী এ পদ্ধতিতে গ্যাস ব্যবহারে কী ধরনের প্র্যাকটিস চলছে, সে বিষয়গুলো প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে। এমনকি এ বিষয়ে দায়িত্বশীলরা বৈশ্বিক স্ট্যান্ডার্ডে কীভাবে কাজ করবে, সে বিষয়গুলো নিয়েও পর্যালোচনা চলছে। কেননা সিএনজি সিস্টেমে বৃহৎ পরিসরে গ্যাস ব্যবহার বাংলাদেশে এখনো হয়নি। তাই যারা কাজটি করবে তাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কেমন হবে, সে বিষয়গুলো এখনো পরিষ্কার নয়। ফলে প্রত্যেকটি ধাপ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যবেক্ষণ করে এ ধরনের কাজে এগোতে হবে বলে জানান এ কর্মকর্তা।
দ্বীপ জেলা ভোলায় ১৯৯৫ সালে গ্যাসের মজুদ আবিষ্কার হওয়ার আড়াই দশক পেরিয়ে গেলেও সেই জ্বালানি উত্তোলন নিয়ে বৃহৎ কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি। বিভিন্ন সময় নানামুখী পরিকল্পনা করা হলেও কখনো অর্থনৈতিক আবার কখনো রাজনৈতিক কারণে তা মুখ থুবড়ে পড়ে। ভোলার শাহবাজপুরে বাপেক্সের বর্তমানে পাঁচটি গ্যাসকূপ উৎপাদনে রয়েছে। কূপগুলোর দৈনিক উৎপাদন সক্ষমতা ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট। যদিও এখন ৬৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ হচ্ছে দৈনিক। সেই গ্যাস স্থানীয় বিদ্যুৎকেন্দ্র ও আবাসিকে সরবরাহ করছে বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান সুন্দরবন গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড।
ঢাকা থেকে ভোলার দূরত্ব ১৯০ কিলোমিটার। সেখান থেকে শাহবাজপুর গ্যাসফিল্ড আরো অন্তত ২০-২৫ কিলোমিটার দূরে। সেই গ্যাস ক্যাসকেড পদ্ধতিতে বড় ট্রাকে করে শিল্প এলাকায় বিতরণের পরিকল্পনা করছে পেট্রোবাংলা। কেননা দেশের বিদ্যমান গ্যাস সংকটে শিল্প-কারখানাগুলোই সবচেয়ে বেশি ভুগছে। তাই অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এ খাতে গ্যাস দেয়া গেলে তা গ্রিডের ওপর কিছুটা হলেও চাপ কমাবে বলে মনে করছে তেল, গ্যাস ও খণিজ সম্পদ নিয়ে কাজ করা সরকারের এ সংস্থা।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠান (বিআইডিএস) আয়োজিত গতকালের এক সেমিনারে প্রধানমন্ত্রীর জ্বালানিবিষয়ক উপদেষ্টা ড. তৌফিক-ই-ইলাহী চৌধুরী বলেন, ভোলায় আমাদের কিছু গ্যাস আছে। সেটি সিএনজিতে রূপান্তর করে নিয়ে আসার চেষ্টা চলছে। আশা করা হচ্ছে দৈনিক ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস ভোলা থেকে আনা যাবে। এছাড়া আমাদের যে কূপগুলো রয়েছে, সেখান থেকে আরো ১০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে কাজ চলছে।
বিশ্বের বহু দেশেই সিএনজি প্রযুক্তিতে গ্যাসের ব্যবহার রয়েছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র, চীন, পাকিস্তান, ইরান এমনকি নাইজেরিয়ার মতো দেশেও এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করা হচ্ছে। এক্ষেত্রে কারিগরি দিক, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক মান ও ব্যবহার বাংলাদেশে কী ধরনের হতে পারে তা খতিয়ে দেখছে পেট্রোবাংলার কমিটি। সিএনজি আকারে গ্যাস ব্যবহারকে যদিও ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, বাংলাদেশে এ ধরনের প্র্যাকটিস না থাকলেও দ্রুত সময়ের মধ্যে গ্যাস উত্তোলনে এ ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার হতে পারে।
ভূতত্ত্ববিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক বদরূল ইমাম বণিক বার্তাকে বলেন, ভোলায় গ্যাস সিএনজি করে আনা গেলে সেটি হবে একটি ভালো সিদ্ধান্ত। যেহেতু আমাদের এ মুহূর্তে গ্যাসের সংকট, ফলে সেই গ্যাস আনা গেলে তা অনেক কাজে আসবে। তাছাড়া ভোলায় দীর্ঘদিন গ্যাস ফেলে রাখার কোনো মানেই হয় না। অর্থনৈতিকভাবে সেটি আনতে যেভাবে সাশ্রয়ী হয় সেভাবেই আনা যেতে পারে।
ভোলার গ্যাসকে ব্যবহারের জন্য এক বছর আগেও দুটি পরিকল্পনার কথা জানা গিয়েছিল। প্রথমত, সেখানকার গ্যাস এলএনজিতে রূপান্তর করে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত করা যায় কিনা। দ্বিতীয়ত, ভোলা থেকে ফেনী পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণ করার পরিকল্পনা। এ-সম্পর্কিত একটি প্রতিবেদন গত ফেব্রুয়ারিতে পাওয়ার কথা ছিল জ্বালানি বিভাগের। যদিও সেই প্রতিবেদনের বিষয়ে আর এগোয়নি সরকার।
ভোলায় গ্যাস উত্তোলনে নিয়োজিত রয়েছে রাষ্ট্রায়ত্ত তেল-গ্যাস ও খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান বাপেক্স। ভোলার গ্যাস নিয়ে পেট্রোবাংলার নতুন পরিকল্পনার বিষয়টি অবহিত করলে বাপেক্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মোহাম্মদ আলী বণিক বার্তাকে বলেন, দেশের গ্যাস সংকটে পেট্রোবাংলা যেভাবে গ্যাস নিতে চায় সেভাবেই সরবরাহ দিতে আমরা প্রস্তুত। বর্তমানে শাহবাজপুরে পাঁচটি কূপ উৎপাদনে রয়েছে। সেখানে আমাদের দৈনিক ১২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেয়ার সক্ষমতা রয়েছে। আরো কয়েকটি কূপের কাজ চলছে। ফলে নিকটভবিষ্যতে বড় সরবরাহ চাইলে সেটিও দেয়া সম্ভব হবে।










