অস্ত্রোপচারে রোগীকে পুরোপুরি অচেতন করার ক্ষেত্রে হ্যালোথেন নামে একটি ওষুধ ব্যবহার করে যশোর আড়াইশ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ওষুধটি বিনামূল্যে রোগীদের শরীরে প্রয়োগ করা হতো। দুই মাস ধরে হ্যালোথেন সরবরাহ বন্ধ রয়েছে হাসপাতালটিতে। অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে বিকল্প ওষুধ এখন রোগীদেরই বাইরে থেকে কিনতে হচ্ছে। দেড়-দুই হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হচ্ছে ১০-৩০ গুণ বেশি দামে। এতে রোগীদের খরচও বেড়েছে।

বিকল্প ওষুধের দুষ্প্রাপ্যতা, অধিক দাম এবং রোগীর শরীরে প্রয়োগের আগে বাষ্প করার মেশিনের অপর্যাপ্ততার কারণে এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, কাঁচামাল সংকটের কারণে ছয় মাস ধরে হ্যালোথেন উৎপাদন বন্ধ রেখেছে দেশের উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান। সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় কোনো কোনো সরকারি হাসপাতালের রোগীরা নিজ উদ্যোগে বিকল্প ওষুধ সংগ্রহ করছে। দেড়-দুই হাজার টাকার ওষুধ কিনতে হচ্ছে ১০-৩০ গুণ বেশি দামে। এতে নাক, কান ও গলা (ইএনটি), সি সেকশন, অর্থপেডিক সার্জারি, বাইপাস সার্জারিসহ বড় ধরনের অস্ত্রোপচারের ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ হ্যালোথেন ছাড়া একই গোত্রের বিকল্প ওষুধ দেশে দুষ্প্রাপ্য এবং স্থানীয় কোনো ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান বিকল্প ওষুধগুলো উৎপাদন শুরু করেনি।

যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের অ্যানেস্থেসিয়া চিকিৎসক জাফর ইকবাল বণিক বার্তাকে বলেন, ‘হ্যালোথেন ওষুধের বিষয়ে বহু আগে থেকেই কথা হয়েছে। এর কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে। একই সঙ্গে পরিবেশের জন্য ওষুধটি নিরাপদ নয়। বাংলাদেশে হ্যালোথেন ওষুধ সহজলভ্য। এ জেনেরিকের অন্য কোনো ওষুধ বাংলাদেশে উৎপাদিত হয় না। আমরা এখন আইসোফ্লুরেন ও সেভোফ্লুরেন ওষুধের কথা বলছি। তবে আইসোফ্লুরেন হ্যালোথেন ওষুধের চেয়ে প্রায় তিন গুণ বেশি দামে কিনতে হয়। আর সেভোফ্লুরেন কিনতে হয় হ্যালোথেনের প্রায় ৩০ গুণ দামে। ওষুধটি পরিবেশ ও রোগীর লিভারে ক্ষতি করে। তবে হ্যালোথেনের প্রভাবে বাংলাদেশের রোগীদের লিভারে ক্ষতি হচ্ছে বলে আমরা কোনো তথ্য পায়নি। ছয় মাস ধরে উৎপাদক প্রতিষ্ঠান ওষুধটি উৎপাদন করছে না। ভ্যাপোরাইজার অ্যানেস্থেসিয়া মেশিন দিয়ে হ্যালোথেন ওষুধকে বাষ্পের মাধ্যমে রোগীর ফুসফুসে পৌঁছানো হয়। হ্যালোথেনের জন্য যে ভ্যাপোরাইজার রয়েছে তা অন্যান্য ওষুধের জন্য উপযোগী নয়। ওষুধের জন্য ভ্যাপোরাইজারের ভিন্নতা রয়েছে। অস্ত্রোপচারের সময় একজন রোগীর কী পরিমাণে ওষুধ লাগবে তা অস্ত্রোপচারের সময়ের ওপর নির্ভর করে।’

তিনি বলেন, ‘হাসপাতালে দুই মাসেরও বেশি সময় জেনারেল অ্যানেস্থেসিয়ার জন্য হ্যালোথেনের সরবরাহ বন্ধ রয়েছে। বাইরে থেকে রোগীর স্বজনরা ওষুধ আনার পর আমরা সেটিকে কাজে লাগাচ্ছি। আবার হাসপাতালে পাঁচটি ওটি মেশিনের মধ্যে তিনটি সচল রয়েছে। এর মধ্যে দুটি মেশিন অন্য অ্যানেস্থেসিয়ার ওষুধ ব্যবহারের উপযোগী না। যে কারণে বিকল্প অ্যানেস্থেসিয়ার ওষুধ ব্যবহার করতে হলে নতুন মেশিন প্রয়োজন হবে।’

সরজমিন দেখা গেছে, হ্যালোথেন ওষুধ না পাওয়ায় বিপাকে পড়েছে রোগী ও তাদের স্বজনরা। বিনামূল্যের এ ওষুধ এখন মোটা অংকের অর্থে কিনতে হচ্ছে নিজ উদ্যোগে। বাজারেও সংকট থাকায় বাড়ানো হয়েছে দাম।

যশোর সদর উপজেলার এড়েন্দা গ্রামের টিপু সুলতান বলেন, ‘১৪ ডিসেম্বর পায়ের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে আমার ভাগ্নে মারুফ হোসেনের অস্ত্রোপচার করা হয়েছে। অচেতন করার ওষুধ আমরা বাইরে থেকে কিনে এনেছি। এতে আমাদের মতো দরিদ্র মানুষের ওপর বাড়তি চাপ পড়ছে।’

যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক হারুন অর রশিদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘রোগীকে একই গোত্রের বিকল্প ওষুধ কেনার পরামর্শ দেয়া হচ্ছে। এ সমস্যা শুধু এক হাসপাতালে নয়, সারা দেশের সব হাসপাতালেই হ্যালোথেন সংকট দেখা দিয়েছে। অন্য ওষুধের দাম বেশি এবং সহজপ্রাপ্য নয়।’

এদিকে হ্যালোথেনের বিষয়ে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, উন্নয়নশীল দেশগুলোয় হ্যালোথেন ব্যাপকভাবে প্রয়োগ করা হয়। এর বেশকিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া রয়েছে এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতির কারণও এটি। উন্নত দেশগুলো এসব পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া এড়াতে ওষুধটির প্রয়োগ বন্ধ করেছে। একই কথা বলেছে, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের ন্যাশনাল লাইব্রেরি অব মেডিসিন এবং এফডিএ।

সংস্থাটি বলছে, হ্যালোথেনের বিকল্প ওষুধ হিসেবে একই গোত্রের অন্যান্য ওষুধ ব্যবহারের পরামর্শ রয়েছে। স্বাভাবিকভাবে অ্যানেস্থেসিয়ার ফলে রোগীর শরীরে বিভিন্ন প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে। এর মধ্যে লিভার ও কিডনির ক্ষতির আশঙ্কা বেশি। তিন বছরের কম বয়সী শিশু বা গর্ভবতী নারীদের অস্ত্রোপচারে সাধারণ চেতনানাশক ও নিরাময় ওষুধের বারবার ব্যবহার মস্তিষ্কের বিকাশকে প্রভাবিত করতে পারে। হ্যালোথেন প্রাপ্তবয়স্ক ও শিশুর জন্য শতভাগ নিরাপদ না হওয়ায় উন্নত দেশগুলোয় আইসোফ্লুরেন, এনফ্লুরেন, ডেসফ্লুরেন ও সেভোফ্লুরেন ব্যবহার করা হচ্ছে।