দেশে বেসরকারি খাতে উচ্চশিক্ষার যাত্রা ১৯৯২ সালে। তিন দশকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১০৮-এ। সংখ্যার এ উল্লম্ফনের সঙ্গে বেসরকারি খাতে উচ্চশিক্ষার গুণগত মানের বিস্তর ফারাক দেখা যাচ্ছে। গবেষণা ও গ্রন্থাগার উন্নয়নের মতো উচ্চশিক্ষার মৌলিক বিষয়গুলো থাকছে একদমই অবহেলিত। ন্যূনতম অবকাঠামো ও শিক্ষক নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে সিংহভাগ বিশ্ববিদ্যালয়। দেশের বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে ধারাবাহিকের আজ দ্বিতীয় পর্ব 

বেসরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান ইউরোপিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) তথ্যমতে, বিশ্ববিদ্যালয়টিতে অধ্যয়নরত শিক্ষার্থী সংখ্যা ১৩ হাজার ১৫৯ জন। এসব শিক্ষার্থীর পাঠদানে শিক্ষক রয়েছেন মাত্র ২৬২ জন। সে হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে প্রতি ৫০ শিক্ষার্থীর বিপরীতে একজন শিক্ষক রয়েছেন। যদিও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মানদণ্ড অনুযায়ী, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থী অনুপাত হবে ১:২০।

বেসরকারি খাতের আরেকটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান চুয়াডাঙ্গার ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ (এফসিইউবি)। আইন অনুযায়ী, কোনো বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সাময়িক অনুমতি পেতে হলেও সর্বনিম্ন ২৫ হাজার বর্গফুট আয়তনের নিজস্ব বা ভাড়াকৃত ভবন থাকতে হয়। যদিও এফসিইউবির ভাড়া করা ভবনের মোট আয়তন ১৫ হাজার বর্গফুটেরও কম। এছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়টিতে কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই), ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই), ব্যাচেলর অব পাবলিক হেলথ ও মাস্টার্স অব পাবলিক হেলথ প্রোগ্রাম থাকলেও এসব বিষয়সংশ্লিষ্ট কোনো ল্যাব নেই। উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির অবকাঠামোর এমন দুরবস্থার চিত্র উঠে এসেছে খোদ ইউজিসির পরিদর্শনে।

শুধু ইউরোপিয়ান কিংবা এফসিইউবি নয়; শিক্ষার্থী অনুপাতে শিক্ষক সংখ্যা ও অবকাঠামো সুবিধার দিক থেকে দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থানই স্বীকৃত মানদণ্ডের নিচে।

উচ্চশিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় আইন, ২০১০-এ একটি উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক সংখ্যা কিংবা অবকাঠামোর যে মানদণ্ড নির্ধারণ করে দেয়া হয়েছে, তা ন্যূনতম। অর্থাৎ মানদণ্ডের নিচে কোনোভাবেই প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করা সম্ভব নয়। যদিও উল্লেখযোগ্যসংখ্যক বিশ্ববিদ্যালয়ই ন্যূনতম সে মানদণ্ডও অনুসরণ করছে না।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ইউজিসির সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক আবদুল মান্নান বণিক বার্তাকে বলেন, আইনে যে-সংখ্যক শিক্ষক ও অবকাঠামোর আকারের কথা বলা হয়েছে, সেটি যে খুব পর্যাপ্ত তা বলা যাবে না। যদিও দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, আইনে বর্ণিত ন্যূনতম সে সুযোগ-সুবিধাও নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে অনেক বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। আমার মতে, বিশ্ববিদ্যালয়গুলো গুণগত উচ্চশিক্ষায় মনোনিবেশ করছে না। তারা কোনোমতে পাঠদানের মধ্য দিয়ে ডিগ্রি প্রদান করছে। মানসম্মত পাঠদান ও গবেষণার জন্য যে মৌলিক অবকাঠামো সুবিধা দরকার, তা গড়ে তোলা হচ্ছে না।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক এ উপাচার্য আরো বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অবকাঠামো উন্নয়ন না হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে, এ খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ নেই। ট্রাস্টিরা প্রাথমিকভাবে স্বল্প পরিমাণে কিছু অর্থ বিনিয়োগ করলেও তার ধারাবাহিকতা রক্ষা হয় না। শিক্ষার্থীদের ফি থেকে প্রাপ্ত আয় দিয়ে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকদের বেতন দেয়াও সম্ভব হয় না। তাহলে অবকাঠামো উন্নয়ন হবে কীভাবে?

এদিকে অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ই কাগজে-কলমে শিক্ষক সংখ্যা ও অবকাঠামোর আকার পর্যাপ্ততার ইউজিসিকে জানালেও বাস্তবের সঙ্গে তার কোনো মিল নেই। ফার্স্ট ক্যাপিটাল ইউনিভার্সিটি গত বছর ইউজিসিকে জানিয়েছে তাদের পূর্ণকালীন শিক্ষক সংখ্যা ৫৭ জন। যদিও কমিশনের একটি পরিদর্শক দল পরিদর্শনে গিয়ে দেখতে পায়, বিশ্ববিদ্যালয়টির পূর্ণকালীন শিক্ষকের প্রকৃত সংখ্যা মাত্র ৩৩, যা আইনের স্পষ্ট লঙ্ঘন। কেননা ইউজিসির নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি প্রোগ্রামে কমপক্ষে চারজন স্থায়ী শিক্ষক থাকতে হবে। এর মধ্যে একজন কমপক্ষে সহযোগী অধ্যাপক পদমর্যাদার হতে হবে। সে হিসেবে বিশ্ববিদ্যালয়টির ১৪টি প্রোগ্রামের বিপরীতে কমপক্ষে ৫৬ জন শিক্ষক থাকার কথা। যার মধ্যে অন্তত ১৪ জন সহযোগী অধ্যাপক পদের।

শিক্ষক ও অবকাঠামো সংকট বিষয়ে জানতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়টির উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. হযরত আলী বণিক বার্তাকে বলেন, উপাচার্যের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকে ক্রমান্বয়ে বিশ্ববিদ্যালয়কে এগিয়ে নেয়ার চেষ্টা করছি। কিছু সংকট রয়েছে, তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। আমরা বেশকিছু উদ্যোগ ও কর্মপরিকল্পনা হাতে নিয়েছি, করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাবের কারণে অগ্রগতি কিছুটা ধীর প্রক্রিয়ায় চলছে। স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তোলা হচ্ছে। সেখানে স্থানান্তর হলে অনেক সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে।

আইনে অবকাঠামোর উন্নয়নের অংশ হিসেবে সাময়িক অনুমতি পাওয়ার নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাস গড়ে তোলার নির্দেশনা রয়েছে। যদিও সাময়িক সনদের মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ার পরও বছরের পর বছর অস্থায়ী ভিত্তিতে কার্যক্রম পরিচালনা করছে বেশকিছু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়। আইন অমান্য করে অস্থায়ী ক্যাম্পাস পরিচালনাকারী ২৩টি বিশ্ববিদ্যালয়কে স্থায়ী ক্যাম্পাসে স্থানান্তরের জন্য সম্প্রতি আলটিমেটাম দিয়েছে ইউজিসি। কমিশন বলছে, চলতি বছরের ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে স্থায়ী ক্যাম্পাসে সম্পূর্ণ শিক্ষা কার্যক্রম স্থানান্তর করা না হলে এ ২৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থী ভর্তি বন্ধসহ আইনি পদক্ষেপ নেয়া হবে।

আলটিমেটামের আওতাধীন ২৩টি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় হলো দ্য পিপলস ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, মানারাত ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব ডেভেলপমেন্ট অল্টারনেটিভ, সাউথইস্ট ইউনিভার্সিটি, ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, স্টামফোর্ড ইউনিভার্সিটি, স্টেট ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, নর্দান ইউনিভার্সিটি বাংলাদেশ, গ্রীন ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, শান্ত-মারিয়াম ইউনিভার্সিটি অব ক্রিয়েটিভ টেকনোলজি, দ্য মিলেনিয়াম ইউনিভার্সিটি, প্রেসিডেন্সি ইউনিভার্সিটি, ইউনিভার্সিটি অব সাউথ এশিয়া, উত্তরা ইউনিভার্সিটি, ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, প্রাইম এশিয়া ইউনিভার্সিটি, রয়েল ইউনিভার্সিটি অব ঢাকা, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস, আশা ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ ও সিটি ইউনিভার্সিটি।

সার্বিক বিষয়ে জানতে চাইলে ইউজিসির সদস্য অধ্যাপক ড. বিশ্বজিৎ চন্দ বণিক বার্তাকে বলেন, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সংখ্যা ও অবকাঠামো সুবিধার বিষয়ে আইনে বেশকিছু সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে এর ব্যত্যয় খুঁজে পেলে কমিশন দ্রুততম সময়ের মধ্যে আইনের আলোকে পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এ ধরনের সমস্যা চিহ্নিত করতে অনেক সময় আকস্মিক পরিদর্শনও করা হয়। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের পর্যাপ্ত সুযোগ-সুবিধা সর্বোপরি উচ্চশিক্ষার মানসম্মত পরিবেশ নিশ্চিতে কমিশন কাজ করে যাচ্ছে। এক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষগুলোর উচিত, আইন ও কমিশনের নির্দেশনার আলোকে নিজেদের মানোন্নয়ন করা।