বেসরকারি ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে (এফআইইউ) নীতিমালা ভেঙে শিক্ষক নিয়োগ ও পদায়নের অভিযোগ উঠেছে। দেশের বেসরকারি উচ্চ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে শিক্ষা, গবেষণা এবং অন্যান্য বিচারে সামগ্রিকভাবে পিছিয়ে থাকলেও আওয়ামী সরকারের প্রভাব খাটিয়ে সবসময়ই আইন ও নীতিমালার বাইরে থাকার সুযোগ পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। 

এর মধ্যে দেশত্যাগী সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চাচা ও দেশের বেসরকারি উচ্চ শিক্ষালয়গুলোর মালিকদের সংগঠন বাংলাদেশ বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সমিতির (এপিইউবি) সদ্য সাবেক চেয়ারম্যান শেখ কবির হোসেনের তত্ত্বাবধানে এসব অনিয়ম সংঘটিত হয়েছে। এছাড়া এফআইইউতে নিয়ম ভেঙে শিক্ষক ও কর্মকর্তার নিয়োগ হয়েছে পরিবারের সদস্যদের প্রতিষ্ঠানটিতে অবৈধ সুযোগ দেয়ার জন্য।

বিশ্ববিদ্যালয়টির কয়েকটি নিয়োগ ও সংশ্লিষ্ট প্রমাণাদি বিশ্লেষণে দেখা দেখা গেছে, ফলাফলে অযোগ্যতা থাকলেও পারিবারিক ও দলীয় প্রভাবের কারণে বিশ্ববিদ্যালয়টিতে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ, পদায়ন এবং দায়িত্ব বণ্টন হয়েছে। এমন তিনজন শিক্ষক-কর্মকর্তার তথ্য নিশ্চিত হওয়া গেছে।

বর্তমানে এফআইইউর ইংরেজি বিভাগের প্রধান ও সহকারী অধ্যাপক হিসেবে রয়েছেন ফারিয়া সুলতানা। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজের আরেক সদস্য মোহাম্মদ আব্দুল আজিজের মেয়ে। ফলে শর্ত ভেঙে বিশ্ববিদ্যালয়ে চাকরি ও পদায়নে তার কোথাও আটকাতে হয়নি।

দেশের উচ্চ শিক্ষার তদারক প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) শর্ত মতে, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হতে ন্যূনতম ৩.৫ সিজিপিএ থাকা আবশ্যক হলেও তার স্নাতকের অর্জন সিজিপিএ ২.৬৪। এছাড়া পূর্ববর্তী একাধিক ফলাফলে দারুণ পিছিয়ে ছিলেন তিনি। তার মাধ্যমিকে এবং উচ্চ মাধ্যমিকে যথাক্রমে জিপিএ ছিল ৩.৪৪ ও ৩.৫। যদিও শিক্ষক নিয়োগে ইউজিসির আরেকটি শর্ত ছিল শিক্ষাজীবনে কোনো তৃতীয় বিভাগ অর্জন না থাকা।

এছাড়া তার প্রভাষক থেকে সহকারী অধ্যাপক হিসেবে পদায়নেও দেখা হয়নি কোনো শর্ত বা নীতিমালা। শিক্ষাজীবনে পিছিয়ে থাকা এ শিক্ষার্থী আলো ছড়াতে পারেননি শিক্ষকতায়ও। তার বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ক্লাসে পড়াতে পারেন না তিনি। ফলে শিক্ষার্থীদের হয়রানির ঘটনাও ঘটেছে তার হাতে।

শিক্ষার্থীদের পড়াতে না পারার এ অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে এফআইইউর প্রাক্তন শিক্ষার্থীদের বক্তব্যে। একই বিভাগ থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করা এক শিক্ষার্থী নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌ফারিয়া সুলতানা ক্লাসে কখনো লেকচার দিতে পারতেন না। তিনি এসে বই খুলে ১০ মিনিটের মতো পড়িয়ে চলে যেতেন। কোনো শিক্ষার্থী প্রশ্ন করলে তিনি রাগান্বিত হতেন ও পরে তাদের ফলসহ বিভিন্ন বিষয়ে হয়রানি করতেন।’

অভিযোগের বিষয়ে জানতে যোগাযোগ করা হয় ফারিয়া সুলতানার সঙ্গে। তিনি জানান, অভিযোগ সত্য নয়। তিনি যখন নিয়োগ পান তখন ইউজিসির এসব শর্ত ছিল না। এছাড়া তার গবেষণা ও প্রকাশনা থাকায় তিনি এসব শর্ত উতরে যান বলে জানান।

এর বাইরে এফআইইউতে ২০১৮ সালের ফেব্রুয়ারিতে ডিরেক্টর অব ফাইন্যান্স হিসেবে নিয়োগ পান শেখ মোসাদ্দেক কবির। তিনি শেখ কবির হোসেনের ছেলে বিধায় কোনো ধরনের প্রবিধান অনুসরণ না করেই নিয়োগ পেয়েছেন বলে নিশ্চিত করেছেন বিশ্ববিদ্যালয়সংশ্লিষ্টরা। শিক্ষক-কর্মকর্তাদের হয়রানি ও বিভাগের বাইরে খবরদারির কারণে বিশ্ববিদ্যালয়ে নির্বিঘ্নে কাজ করতে না পারার অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে। তবে একাধিকবার চেষ্টা করেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

এফআইইউর আইন ও নিয়ম ভেঙে নিয়োগের ঘটনা ঘটেছে খোদ আইন বিভাগেই। উচ্চ শিক্ষালয়টির ‘আইন ও বিচার’ নামের এ বিভাগে কোনো রকম পূর্ব অভিজ্ঞতা ছাড়াই সহকারী অধ্যাপক বনে যান রিসাত নূর।

ইউজিসির শর্ত মতে, সরাসরি সহকারী অধ্যাপক পদে নিয়োগে পিএইচডি ডিগ্রির পাশাপাশি তিন বছরের শিক্ষকতার অভিজ্ঞতা বাধ্যতামূলক হলেও সেটি দেখা হয়নি। কোনো রকম অভিজ্ঞতা ছাড়াই তাকে এ পদে নিয়োগ দেয়া হয়েছে। একই বিভাগের প্রভাষক হিসেবে নিবেদিতা তালুকদারের নিয়োগেও মানা হয়নি কমিশনের বিধিমালা। আর এসব অনিয়মে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে জড়িয়েছেন শেখ কবির হোসেন।

এসব বিষয়ে জানতে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয় রিসাত নূরের সঙ্গে। তবে এ বিষয়ে তার কোনো সাড়া পাওয়া যায়নি।

২০২০ সালে করোনার সময় ট্রাস্টি বোর্ডের এক্সিকিউটিভ ডিরেক্টর মো. আব্দুল্লাহ অসুস্থ হওয়ার পর নানা অনিয়ম ও পুরো ইউনিভার্সিটিতে একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তার করেন শেখ কবির ও শেখ মোসাদ্দেক। এরপর হতে থাকে পছন্দের মানুষের নিয়োগ। ২০১৮ সালে শেখ কবিরের নির্দেশেই তখনকার রেজিস্ট্রার মোহাম্মদ আলীকে একদিনের নোটিসে ইউনিভার্সিটি ছাড়তে বাধ্য করা হয়। কারণ তিনি ইউনিভার্সিটির ট্রাস্টি বোর্ডের সমালোচনা করেছিলেন।

বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়টির জনসংযোগ কর্মকর্তা ও উপাচার্যের ব্যক্তিগত সহকারী খন্দকার আরাফাত ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য মতিউর রহমানের (বাবু) শ্যালক।

সামগ্রিক বিষয় নিয়ে শেখ কবির হোসেনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া সম্ভব হয়নি।

এফআইইউর উপাচার্য অধ্যাপক ড. রাকিব আহমেদ বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি অভিযোগের বিষয়ে শুনেছি। এগুলো কিছু আমার দায়িত্ব গ্রহণের পূর্বে হয়েছে। তার পরও আমি বিষয়গুলো খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা গ্রহণের উদ্যোগ নেব।’

বিশ্ববিদ্যালয়টির রেজিস্ট্রার মো. মশিউর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘আমি দায়িত্বে থাকাকালে নিয়োগগুলো হয়নি। এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না। নিয়োগ নিয়ে যেসব অভিযোগ উঠেছে তা আমরা পুনর্মূল্যায়ন ও পর্যালোচনা করব। নিয়োগ বিদ্যমান নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য আছে কিনা খতিয়ে দেখা হবে। তারপর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া হবে।’