গত বছর দফায় দফায় তিস্তা নদীর ভাঙনে রংপুরের গঙ্গাচড়া উপজেলার লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের শংকরদহ গ্রামটি বিলীন হয়ে গেছে। একাধিক গ্রামে ভাঙন দেখা দিলেও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় কোলকোন্দ ইউনিয়নের বিনবিনাচর গ্রামটি। বর্তমানে এ গ্রামের তিন ভাগের দুই ভাগ নদীতে বিলীন হয়েছে। গত বর্ষা মৌসুমের পর থেকে এখন পর্যন্ত নদীভাঙন রোধে পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ কার্যকর কোনো ব্যবস্থা না নেয়ায় আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন ভাঙনের মুখে থাকা বাসিন্দারা। তাই আসন্ন বর্ষায় নদীভাঙন থেকে রক্ষা পেতে বিনবিনাচরের বাসিন্দারা স্বেচ্ছায় ১ হাজার ফুট বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করেছেন।
এদিকে শুষ্ক মৌসুমে নদী ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে এমন আশায় থাকলেও শিগগিরই কাজ শুরু করার কোনো উদ্যোগ না থাকায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন নদীভাঙনপ্রবণ এলাকার বাসিন্দারা।
সরেজমিনে বিনবিনাচর ঘুরে দেখা গেছে, নবগঠিত কোলকোন্দ ইউনিয়নের ৫ নং ওয়ার্ডের সদস্য মো. মনোয়ার হোসেনের নেতৃত্বে চলছে বাঁধ নির্মাণ কার্যক্রম। তিনি বলেন, বর্তমানে ফাল্গুন মাস এসে গেছে। নদীভাঙন থেকে বাঁচতে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য লিখিতভাবে আবেদন করেছে এলাকাবাসী। কিন্তু অদ্যাবধি কোনো ব্যবস্থা নেয়নি সরকারি এ দপ্তর। এদিকে তিস্তা নদী ভাঙতে ভাঙতে আমাদের গ্রামের আড়াইশ গজের মধ্যে এসে গেছে। আর কয়েক মাস পর বর্ষাকাল শুরু হবে। তাই এখন ব্যবস্থা না নিলে বিনবিনাচরের অবশিষ্ট অংশ শংকরদহ গ্রামের মতো বিলীন হয়ে যাবে। সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে আছে বিনবিনাচর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ভবন।
ইউপি সদস্য মনোয়ার বলেন, গ্রামবাসীর আর্থিক সহায়তা ও স্বেচ্ছাশ্রমে বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু করেছি। বিনবিনা নারকেল তলা থেকে দক্ষিণ পাশে বাঁধের অবস্থান। গত ১ ফেব্রুয়ারি থেকে বাঁধের কাজ শুরু হয়েছে। এ বাঁধের উচ্চতা হবে ১০ ফুট ও প্রস্থ হবে ৮০ ফুট। এছাড়া বাঁধের দুই পাশ দিয়ে প্রায় ৪০ ফুট বাঁশ পোঁতার পাশাপাশি লাগানো হবে ইউক্যালিপটাস গাছ।
দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বলেন, তিস্তা নদী সর্বোচ্চ ২৫ ফুট পর্যন্ত ভাঙে। ফলে অনায়াসে রক্ষা পাবে বিনবিনাচর। এছাড়া তিনি দাবি করেন, বাঁধটির নির্মাণকাজ শেষ হলে নদীতে বিলীন হওয়া শংকরদহ গ্রাম পুনরায় চাষাবাদ ও বসতের উপযোগী হয়ে উঠবে। বাঁধটি গ্রামবাসীর আর্থিক সহায়তা এবং স্বেচ্ছাশ্রমে তৈরি হলেও তিনি পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষের কাছে ১০ হাজার জিও ব্যাগ সহায়তা হিসেবে চেয়েছেন। তবে তাদের কোনো সাড়া মেলেনি।
বিনবিনাচরের বাসিন্দা সাইদুল ইসলাম বলেন, তার সাড়ে ছয় একর জমি তিস্তার ভাঙনে বিলীন হয়েছে। এখন তিনি নিঃস্ব হয়ে পরিবার-পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। শুধু সাইদুল ইসলাম নয়, কোলকোন্দ ইউনিয়নের মটকপুর চিলাখালসহ একাধিক গ্রামের মানুষ তিস্তার ভাঙনে নিঃস্বপ্রায়। বর্তমানে নদী আড়াইশ গজের মধ্যে আসায় গ্রামবাসীর দিন কাটছে প্রতিনিয়ত ভাঙন আতঙ্কে।
লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের শংকরদহ গ্রামটি গত বছর (২০২১) বর্ষা মৌসুমে তিস্তা নদীর ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে। প্রায় আড়াই হাজার মানুষ বাস্তুভিটা হারিয়ে উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। লক্ষ্মীটারী ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল হাদী বলেন, বিনবিনাচরে স্বেচ্ছায় বাঁধ নির্মাণের বিষয়টি তিনি জানেন। তবে তিনি দাবি করেন, আগামী বর্ষার আগে যদি বিনবিনা থেকে ভাটিতে ৬ কিলোমিটার বাঁধ নির্মাণে পানি উন্নয়ন বোর্ড এগিয়ে না আসে তাহলে শংকরদহের মতো পরিণত হতে চলেছে বিনবিনাচর, পশ্চিম ইচলি, পূর্ব ইচলি, চরইশ্বরপুর ও জয়রাম ওঝা গ্রামের। হুমকির মুখে পড়বে লালমনিহাট জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার কাকিনা ইউনিয়নের মহিষামুড়িসহ বেশ কয়েকটি গ্রাম। এতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে দুই লক্ষাধিক মানুষ।
কবে নাগাদ বাঁধ নির্মাণকাজ শুরু হবে জানতে চাইলে রংপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. আহসান হাবীব বলেন, আমরা রংপুর জেলার গঙ্গাচড়া উপজেলার নদীভাঙনে লক্ষ্মীটারী ও কোলকোন্দ ইউনিয়নসহ কাউনিয়া ও পীরগাছা উপজেলার ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নেয়ার অনুমোদনের জন্য ঢাকায় পাঠিয়েছি। কাজের নিয়ম অনুযায়ী এখন এটি তৃতীয় পক্ষ দিয়ে সার্ভে করে যদি সত্যতা মেলে তাহলে কাজ শুরু হবে। তাই কোনো এলাকা নদীতে ভেঙে গেলেও অনুমোদন না পেলে আমাদের করণীয় কিছু থাকে না। তবে কবে কাজ শুরু হবে তা তিনি নিশ্চিত করতে পারেননি। বিনবিনাচরে স্বেচ্ছায় বাঁধ নির্মাণে জিও ব্যাগের সহায়তা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, যখন কোথাও কাজ চলে শুধু তখন তাদের কাছে উপকরণ আসে। তাই বর্তমানে জিও ব্যাগের সহায়তা দেয়ার তাদের কোনো সুযোগ নেই। তবে তিনি বলেন, তিস্তা মহাপরিকল্পনা শুরু হলে এ অঞ্চলে পরিকল্পিত নদী শাসন হবে, তখন নদীভাঙনের কোনো আশঙ্কা থাকবে না।










