প্রায় ২০০ বছরের পুরনো বুড়িগঙ্গা তীরের রূপলাল হাউজ। ভবনটির ঠিক পাশেই নর্থব্রুক হল (লালকুঠি)। মোগল স্থাপত্যশৈলীতে নির্মাণ করা ভবনটির বয়সও ১৫০ বছরের কাছাকাছি। সম্মুখভাগে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলা নানা স্থাপনার কারণে এখন আর স্থাপনা দুটি নদী থেকে দেখা যায় না। ঐতিহাসিক ভবন দুটিকে নদী থেকে আরো দূরে ঠেলে দিয়েছে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) জেটি, টিকিট কাউন্টারসহ বিভিন্ন অবকাঠামো। রূপলাল হাউজ ও নর্থব্রুক হলের সৌন্দর্য রক্ষায় সম্প্রতি এসব অবকাঠামো সরিয়ে নিতে বিআইডব্লিউটিএকে আনুষ্ঠানিকভাবে চিঠি দিয়েছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএসসিসি)।

চিঠিতে বলা হয়, ঊনবিংশ শতকে বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে সূত্রাপুরের ফরাশগঞ্জ এলাকায় প্রায় ৫২ মিটার দীর্ঘ একটি দ্বিতল ভবন নির্মাণ করেন দুই ভাই রূপলাল দাস ও রঘুনাথ দাস। তখন ভবনটির নাম দেয়া হয় রূপলাল হাউজ। কারুকার্যখচিত দুইতলাবিশিষ্ট ভবনটির স্থাপত্যশৈলী অত্যন্ত মনোরম ও মনোমুগ্ধকর। সম্প্রতি ডিএসসিসির মেয়র ফজলে নূর তাপস ভবনটি পরিদর্শন করেন ও এটি সংস্কার করে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করার পরিকল্পনা করেন। অন্যদিকে মোগল নির্মাণশৈলী ও কৌশল অবলম্বনে ১৮৭২-১৮৭৯ সালে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে নর্থব্রুক হল (লালকুঠি) নির্মিত হয়। ভারতের তত্কালীন গভর্নর জেনারেল টমাস জর্জ ব্যারিং নর্থব্রুক ঢাকা সফরে এলে তার সফরকে স্মরণীয় করে রাখতেই এ ভবনের নাম নর্থব্রুক হল রাখা হয়।

আরো বলা হয়, প্রাচীন সৌন্দর্যময় স্থাপনাটির সম্মুখভাগে বিভিন্ন স্থাপনা থাকার কারণে এটি এখন নদী থেকে দেখা যায় না। স্থাপনা নির্মাণের ফলে পাশের রাস্তা, ভাসমান হকার, কুলি ও মালামাল বহনকারী পরিবহনের কারণে যানজট সৃষ্টি হয়। ফলে লালকুঠি হলের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। ভবনটির নির্মাণশৈলী অক্ষুণ্ন রেখে সংস্কারের জন্য ডিএসসিসি থেকে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। শিগগিরই ভবনটির চারপাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ করে এর সংস্কারকাজ শুরু হবে। সেজন্য লালকুঠি হলের দক্ষিণ পাশে অবস্থিত বিআইডব্লিউটিএর টার্মিনালসহ অন্যান্য স্থাপনা দ্রুত অন্য স্থানে সরিয়ে নিতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার জন্য চিঠিতে বলা হয়।


ডিএসসিসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বহির্বিশ্বের আদলে নদী থেকেই আহসান মঞ্জিল, নর্থব্রুক হল ও রূপলাল হাউজের সৌন্দর্য উপভোগের লক্ষ্যে বুড়িগঙ্গা-তীরবর্তী স্থাপনা উচ্ছেদের পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়েছে। যার মধ্যে রয়েছে বিআইডব্লিউটিএর টার্মিনালও। ঐতিহাসিক নিদর্শন রক্ষা ও সৌন্দর্যবর্ধনের ব্যাপারে পূর্ণ সহযোগিতার মৌখিক আশ্বাস দিলেও কার্যত সৌন্দর্য অবরুদ্ধের পথেই এগোচ্ছে সংস্থাটি। নির্মাণ করছে নতুন স্থপানা।

সরেজমিন লালকুঠি ঘাট গিয়ে দেখা যায়, রূপলাল হাউজ বরাবর নতুন একটি টিকেট কাউন্টার নির্মাণ সম্পন্ন করেছে বিআইডব্লিউটিএ। সাম্প্রতিক সময়ে নৌপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন পরিমাণের ক্রমবর্ধমান চাহিদা বিবেচনায় নিয়ে ঢাকা নদীবন্দরের সক্ষমতা বাড়াতে এ অবকাঠামো নির্মাণ করা হয়েছে জানিয়ে বিআইডব্লিউটিএর একজন কর্মকর্তা বলেন, এ বন্দর দিয়ে প্রতিদিন ৩০-৪০ হাজার যাত্রী চলাচল করে। মালামাল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথও এটি। লালকুঠি ও রূপলাল হাউজের সামনে থেকে চাঁদপুর, শরীয়তপুর, ঢাকা-বরিশাল, ঢাকা-ইলিশা রুটে লঞ্চ ও বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশনের (বিআইডব্লিউটিসি) স্টিমার চলাচল করে। এসব ঘাট দিয়ে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে শতাধিক নৌযান চলাচল করে। ফলে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নদীবন্দর।

তবে এরই মধ্যে রূপলাল হাউজ ও আহসান মঞ্জিলের সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শুরু হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে ডিএসসিসির একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, চিঠি দেয়ার পরও যদি বিআইডব্লিউটিএ পুরাকীর্তিগুলোর সৌন্দর্য বিনষ্ট বা হ্রাস করে, তবে ডিএসসিসির পক্ষ থেকে আইনগত সব ধরনের ব্যবস্থা নেয়া হবে।

ডিএসসিসির সূত্র আরো জানায়, বিআইডব্লিউটিএ সম্পূর্ণ অপরিকল্পিতভাবে ঢাকা নদীবন্দর তথা সদরঘাটে জেটির পর জেটির সংখ্যা বাড়িয়ে চলেছে। এতে করে সংশ্লিষ্ট এলাকায় তীব্র যানজটসহ নাগরিক সুবিধা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। সদরঘাট স্থানান্তর করা হলে ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণের পাশাপাশি নাগরিক ভোগান্তিও কমে যাবে বলে মনে করছেন নগর পরিকল্পনাবিদরাও।

জানা গেছে, স্থাপনাগুলোর সৌন্দর্য ফিরিয়ে এনে প্রকৃতি ও ইতিহাসপ্রেমী দেশ-বিদেশের পর্যটকদের জন্য তা উন্মুক্ত করার বিশদ পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে ডিএসসিসি। এজন্য রূপলাল হাউজ ও আহসান মঞ্জিলের সামনের ও নদী-তীরবর্তী স্থাপনা থেকে সব অবকাঠামো স্থানান্তর ও অপসারণ চায় তারা। সংস্থাটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফরিদ আহাম্মদ বণিক বার্তাকে বলেন, করপোরেশনের নিজস্ব তহবিল থেকে ১০ কোটি টাকা ব্যয়ে চলতি অর্থবছরেই এ কাজ শেষ হবে।

রূপলাল হাউজ ও নর্থব্রুক হলের সামনে থাকা বিআইডব্লিউটিএর স্থাপনাগুলোর বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সংস্থাটির চেয়ারম্যান কমোডর গোলাম সাদেক বণিক বার্তাকে বলেন, রূপলাল হাউজ, আহসান মঞ্জিল ও লালকুঠি হলের সামনের স্থাপনা না সরিয়েই দর্শনার্থীদের জন্য নদী থেকে এগুলোর সৌন্দর্য উপভোগের ব্যবস্থা করা সম্ভব। ঐতিহাসিক নিদর্শন সংরক্ষণ ও সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগের সঙ্গে আমরা পুরোপুরি একমত। এজন্য আমরা সদরঘাটের একাংশ অর্থাৎ রূপলাল হাউজের সামনে থেকে তিনটি জেটি স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছি। এছাড়াও সদরঘাট বেশির ভাগ সময় ভীষণ জনাকীর্ণ থাকে। ঘাটটির একাংশ পোস্তগোলা শ্মশানঘাটে সরিয়ে নেয়ার কাজ চলছে। সেটি বাস্তবায়ন করা গেলে এ অঞ্চলের ওপর চাপ কমবে।