ছাত্রজীবন থেকে তীক্ষ্ণ মেধার অধিকারী হিসেবে সুনাম ছিল আলমগীর কবিরের। পেশাদার হিসাববিদ হিসেবেও খ্যাতি রয়েছে তার। মেধা আর পরিশ্রমের সংমিশ্রণে সাউথইস্ট ব্যাংককে তিনি বেসরকারি খাতের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকে রূপান্তর করেছেন।
টানা ১৮ বছর ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদে অধিষ্ঠিত রয়েছেন তিনি। বিষয়টি নিয়ে তার মধ্যে এক ধরনের অহমও কাজ করছে বলে দাবি করছেন তার সমালোচকরা। তাদের ভাষ্যমতে, তার হাবভাবে প্রকাশ পায়, ব্যাংকটি তিনি নিজেই গড়েছেন এবং এতে একচ্ছত্র কর্তৃত্বের অধিকারও শুধু তারই।
যদিও আলমগীর কবিরের একক নেতৃত্ব ও কর্তৃত্ব মেনে নিতে নারাজ সাউথইস্ট ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতারা। এ নিয়েই বিরোধের সূত্রপাত ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদে। বিরোধের বিষয়টি প্রকাশ্যে আসে গত বছর ব্যাংকটির বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) বয়কটের মাধ্যমে। চেয়ারম্যানের পদত্যাগ চেয়ে এজিএম বয়কট করেন ব্যাংকটির পাঁচজন উদ্যোক্তা পরিচালক। আলমগীর কবিরের বিরুদ্ধে ব্যাংক পরিচালনায় অনিয়ম, দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের নানা অভিযোগ তুলে বাংলাদেশ ব্যাংকে লিখিত অভিযোগ দেন তারা।
পরিচালকদের বিরোধ তুঙ্গে পৌঁছলে সাউথইস্ট ব্যাংকের ওপর নজর পড়ে আর্থিক খাতের প্রভাবশালীদের। গত ২২ মে উচ্চ আদালতে আগাম জামিন নিতে গিয়ে আটক হন সাউথইস্ট ব্যাংকের প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান এমএ কাশেম ও উদ্যোক্তা পরিচালক রেহানা রহমান। নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মামলায় আসামি হয়ে কারাগারে আছেন সাউথইস্ট ব্যাংকের এ দুই উদ্যোক্তা। একই মামলায় আসামি হয়ে পলাতক আছেন সাউথইস্ট ব্যাংকের আরেক পরিচালক আজিম উদ্দিন আহমেদ।
সাউথইস্ট ব্যাংকের দুই পরিচালক যেদিন আটক হন, সেদিনই পুঁজিবাজারে ব্যাংকটির শেয়ারের অস্বাভাবিক লেনদেন হয়। একদিনেই বেচাকেনা হয় ব্যাংকটির ৪ কোটি ৭৫ লাখ ৮৮ হাজার শেয়ার। হাতবদল হওয়া এ শেয়ারের সিংহভাগই কিনে নিয়েছে দেশের আর্থিক খাতের প্রভাবশালী এক ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান। এর আগেও ব্যাংকটির অন্তত ছয় কোটি শেয়ার প্রভাবশালী ওই ব্যক্তির প্রতিষ্ঠান কিনে নিয়েছিল। সব মিলিয়ে আর্থিক খাতের বড় প্রভাবক হয়ে ওঠা ওই পক্ষটি সাউথইস্ট ব্যাংকের ১০ শতাংশেরও বেশি শেয়ার নিজেদের মালিকানায় নিয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র নিশ্চিত করেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, চেয়ারম্যানের অহমবোধ থেকে পরিচালকদের মধ্যে সৃষ্ট বিরোধই সাউথইস্ট ব্যাংকের ওপর প্রভাবশালী গোষ্ঠীর শ্যেনদৃষ্টি ফেলতে সহায়তা করেছে। চেয়ারম্যানের বিরোধীরা অন্য মামলায় আসামি হয়ে কারাভোগ কিংবা পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। অন্যদিকে আলমগীর কবিরের ছেলে রাইয়ান কবির এরই মধ্যে বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক সাউথইস্ট ব্যাংকের পর্ষদ থেকে অপসারিত হয়েছেন। অভিযোগ প্রমাণ হলে আলমগীর কবির নিজেও বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক অপসারিত হতে পারেন। এ অবস্থায় সাউথইস্ট ব্যাংকের ভবিষ্যৎ তৃতীয় পক্ষের হাতেই চলে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
আলমগীর কবির নিজেও বলছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে তার খারাপ লাগছে। বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, ২০০৪ সাল থেকে আমি সাউথইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে আছি। ব্যাংকটির যখন দায়িত্ব নিয়েছিলাম, তখন এটি ছিল খুবই দুর্বল একটি ব্যাংক। কিন্তু গত ১৮ বছরে আমি এটিকে দেশের শীর্ষস্থানীয় ব্যাংকের কাতারে নিয়ে এসেছি। দায়িত্ব নেয়ার দুই বছর পর থেকেই আমি চেয়ারম্যান পদ ছেড়ে দিতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তখন সবাই বলেছে, আমাকেই চেয়ারম্যান থাকতে হবে। এখন তারা আমার বিরুদ্ধে বাংলাদেশ ব্যাংকে সাত পৃষ্ঠার লিখিত অভিযোগ দিয়েছে। সাউথইস্ট ব্যাংকের দুজন পরিচালক এখন কারাগারে। এটি একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠানের জন্য অবশ্যই দুঃখজনক ঘটনা।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩০৩ কোটি ৮২ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে গত ৫ মে বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টিদের বিরুদ্ধে মামলা করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ওই মামলায় ১ নম্বর আসামি করা হয় নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান আজিম উদ্দিন আহমদকে। একই মামলার আসামি হন বিশ্ববিদ্যালয়টির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য এমএ কাশেম ও রেহানা রহমান। তিনজনই সাউথইস্ট ব্যাংকের উদ্যোক্তা পরিচালক। গত ২২ মে উচ্চ আদালতে আগাম জামিন নিতে গিয়ে এমএ কাশেম ও রেহানা রহমান আটক হন। পরদিন আদালতের আদেশে তাদের দুজনকে কারাগারে পাঠানো হয়।
নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ঘটনায় মামলা দায়েরের পর গত ১৭ মে সাউথইস্ট ব্যাংকের পর্ষদ সভা হয়। বেলা ১১টায় বনানীতে অনুষ্ঠিত ওই সভায় ব্যাংকটির পরিচালক এমএ কাশেম, রেহানা রহমান, আজিম উদ্দিন আহমদ ও তার স্ত্রী দুলুমা আহমেদ অনুপস্থিত ছিলেন। এর মধ্যে দুলুমা আহমেদ বর্তমানে সাউথইস্ট ব্যাংকের ভাইস চেয়ারম্যান পদে রয়েছেন। পর্ষদের সভায় উপস্থিত হলে গ্রেফতার হতে পারেন, এমন শঙ্কা থেকেই তারা সভায় অংশ নেননি বলে জানা গিয়েছে। ২২ মে এমএ কাশেম ও রেহানা রহমান আটক হওয়ার পর ২৯ মে সাউথইস্ট ব্যাংকের আরেকটি পর্ষদ সভা হয়। পলাতক থাকায় ওই সভায় আজিম উদ্দিন আহমেদ ও তার স্ত্রী দুলুমা আহমেদ উপস্থিত হননি।
দুটি সভায়ই অনুপস্থিত থাকার ক্ষেত্রে এমএ কাশেম, রেহানা রহমান, আজিম উদ্দিন আহমদ ও তার স্ত্রী দুলুমা আহমেদের পক্ষ থেকে কোনো ছুটির আবেদন করা হয়নি বলে জানা গিয়েছে। তবে দুটি সভায়ই এমএ কাশেমের স্ত্রী ও ব্যাংকটির পরিচালক জোসনা আরা কাশেম অংশ নেন। এর মধ্যে সর্বশেষ সভায় অংশ নিয়ে তিনিও শারীরিক অসুস্থতার কথা বলে ছুটি নিয়েছেন।
সাউথইস্ট ব্যাংক সূত্র বলছে, চলতি সপ্তাহেই ব্যাংকটির পরিচালনা পর্ষদের আরেকটি সভা অনুষ্ঠিত হবে। ওই সভায়ও চারজন পরিচালক ছুটি ছাড়া অনুপস্থিত থাকলে তাদের পরিচালক পদ শূন্য হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। কোম্পানি আইনের ১০৮ ধারায় পরপর তিনটি সভায় কোনো পরিচালক অনুমতি ছাড়া অনুপস্থিত থাকলে পরিচালক পদ শূন্য হওয়ার বিধান রয়েছে। চেয়ারম্যান আলমগীর কবির আইনের ওই ধারাটি ব্যবহার করে এমএ কাশেম, রেহানা রহমান, আজিম উদ্দিন আহমেদ ও তার স্ত্রী দুলুমা আহমেদের পরিচালক পদ শূন্য করে দিতে চাইছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
যদিও কোম্পানি আইনের ওই ধারার পরপর তিনটি সভায় অনুপস্থিত থাকাই পরিচালক পদ শূন্য হওয়ার একমাত্র শর্ত রাখা হয়নি। আইনটির ১০৮ (১-চ) ধারায় বলা হয়েছে, ‘পরিচালনা পর্ষদের অনুমতি ব্যতীত পরপর তিনটি সভায় কিংবা ক্রমাগত তিন মাস ধরে পর্ষদের সব সভায়, তন্মধ্যে যে সময় দীর্ঘতর সেই সময়ব্যাপী কোনো পরিচালক অনুপস্থিত থাকলে তার পদ শূন্য হবে।’ কোম্পানি আইনের এ ধারা অনুসরণ করার জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের ‘ব্যাংকিং প্রবিধি ও নীতি’ বিভাগ থেকে ২০১৩ সালের ২৭ অক্টোবর প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়।
আইনের ব্যাখ্যা সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ডেপুটি গভর্নর আবু ফরাহ মো. নাছের বণিক বার্তাকে বলেন, আইনে পরপর তিনটি সভা কিংবা ক্রমাগত তিন মাসের মধ্যে যেটি বেশি দীর্ঘতর সেটি অনুসরণ করতে বলা হয়েছে। তিন মাসের মধ্যে যদি কোনো ব্যাংকের তিনটি সভা না হয়, তাহলে যখন সভা হবে, তখনকার সময় আমলে নেয়া হবে। আবার যদি এক মাসের মধ্যেই তিনটির বেশি সভা হয়, তাহলে তিন মাস সময় গণ্য হবে।
১৯৯৫ সালে দেশের দ্বিতীয় প্রজন্মের বেসরকারি ব্যাংক হিসেবে সাউথইস্টের যাত্রা। ব্যাংকটির প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন শিল্পোদ্যোক্তা এমএ কাশেম। এরপর ২০০৪ সাল পর্যন্ত সাউথইস্ট ব্যাংকের চেয়ারম্যান পদে অন্য উদ্যোক্তা পরিচালকরা নিয়মিতভাবে নির্বাচিত হয়েছেন। ধারাবাহিকভাবে ব্যাংকটির চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব পালন করেন শিল্পোদ্যোক্তা ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুন, রাগীব আলী ও আজিম উদ্দিন আহমেদ। ২০০২ সালে সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদে যুক্ত হন পেশাদার হিসাববিদ আলমগীর কবির। ২০০৪ সালে তিনি চেয়ারম্যান পদে দায়িত্ব নেয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত টানা ১৮ বছর পদটি ধরে রেখেছেন। উত্তরাধিকারী তৈরি করতে আলমগীর কবির তার ছেলে রাইয়ান কবিরকে সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিচালক করেন। ২০২০ সালের ২৮ অক্টোবর রাইয়ান কবিরকে পরিচালক করা হয়। তবে সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংক রাইয়ান কবিরকে সাউথইস্ট ব্যাংকের পরিচালক পদ থেকে অপসারণের নির্দেশ দিয়েছে।
সম্পদের আকারের দিক থেকে সাউথইস্ট এখন দেশের বেসরকারি খাতের বড় ব্যাংকগুলোর একটি। বর্তমানে ব্যাংকটির মোট সম্পদ ও দায়ের পরিমাণ প্রায় ৫০ হাজার কোটি টাকা। পরিচালনা পর্ষদে বিরোধ তুঙ্গে ওঠায় ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যেও হতাশা তৈরি হয়েছে। যোগ্য ও মেধাবী কর্মকর্তারা এরই মধ্যে সাউথইস্ট ব্যাংক ছাড়তে শুরু করেছেন।










