উত্তর আফ্রিকার দেশ লিবিয়ায় ১৯৭৬ সাল থেকে বাংলাদেশী কর্মীরা যেতে শুরু করেন। একসময় দেশের অন্যতম শ্রমবাজার হিসেবে পরিচিত ছিল লিবিয়া। তবে ২০১১ সালে আরব বসন্ত শুরু হলে বদলে যায় দেশটির পরিস্থিতি। যুদ্ধ-সংঘাতে বিপর্যস্ত লিবিয়ায় জনশক্তি রফতানি প্রয়োজনীয়তা হারায়। অভ্যন্তরীণ নানা সমস্যার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে লিবিয়াযাত্রা। কিন্তু এর পরও সেখানে যাওয়া পুরোপুরি বন্ধ করেননি বাংলাদেশীরা। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের এক প্রতিবেদনে উঠে এসেছে যে গত পাঁচ বছরে শ্রম ভিসায় লিবিয়ায় গিয়েছেন ৪৪৩ জন বাংলাদেশী। এদের মধ্যে ২০২২ সালে দেশটিতে পাড়ি জমিয়েছেন ৭১ জন বাংলাদেশী। ২০২১ সালে এ সংখ্যা ছিল তিন, ২০২০ সালে ৯৩, ২০১৯ সালে ২১৩ এবং ২০১৮ সালে ৬৩। সব মিলিয়ে এ পর্যন্ত মোট ১ লাখ ২২ হাজার ৫৬৯ জন কর্মী কর্মসংস্থানের উদ্দেশে লিবিয়ায় গিয়েছেন।
লিবিয়াসহ উত্তর আফ্রিকায় জনশক্তি রফতানির বর্তমান অবস্থা এবং প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের বিষয় নিয়ে সম্প্রতি প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়। সেই বৈঠকে মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে এ প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়।
উল্লেখ্য, লিবিয়ার অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির কারণে দেশটিতে ভ্রমণে নিজ দেশের নাগরিকদের সতর্ক করেছে যুক্তরাজ্য। যুক্তরাজ্য সরকারের বিদেশ ভ্রমণ সতর্কতাসংক্রান্ত ওয়েবসাইটে লিবিয়ায় ভ্রমণ না করার পরামর্শ দিয়েছে। সেখানে বলা হয়, ২০১৪ সাল থেকেই এ নিষেধাজ্ঞা দেয়া হচ্ছে। লিবিয়ার স্থানীয় নিরাপত্তা ব্যবস্থা খুবই দুর্বল। যেকোনো সময়, কোনো ধরনের সতর্কবার্তা ছাড়াই সেখানে যুদ্ধ বা সংঘাত শুরু হয়ে যায়। তাই কেউ যদি দেশটি ভ্রমণ করতে চান, তাহলে সম্পূর্ণ নিজের ঝুঁকিতে ভ্রমণ করতে হবে।
একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রও তার নাগরিকদের লিবিয়া ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছে। মার্কিন সরকারের দেয়া সবশেষ নির্দেশনা অনুযায়ী, অপরাধ, সন্ত্রাসবাদ, অস্থিরতা, অপহরণ ও সশস্ত্র সংঘাতের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিকদের লিবিয়া ভ্রমণে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। এছাড়া অস্ট্রেলিয়াসহ বেশকিছু দেশেও লিবিয়ায় ভ্রমণে সতর্কতা বা নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অভ্যন্তরীণ নানা সংকট ও সমস্যার কারণে দীর্ঘদিন বাংলাদেশ থেকেও লিবিয়ায় কর্মী পাঠানো বন্ধ ছিল। তবে এ বছর থেকে আবারো লিবিয়ায় কর্মী পাঠানো শুরু হয়েছে। দেশটিতে বিপুল পরিমাণ বাংলাদেশী কর্মীর কর্মসংস্থানের প্রত্যাশায় এরই মধ্যে লিবিয়ার সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। এটি স্বাক্ষর হলে বাংলাদেশী কর্মী পাঠানোর কার্যক্রম দ্রুততম সময়ের মধ্যে চালু হবে।
সংসদীয় কমিটির সভাপতি আনিসুল ইসলাম মাহমুদ বণিক বার্তাকে বলেন লিবিয়াসহ উত্তর আফ্রিকায় জনশক্তি রফতানির বর্তমান অবস্থা এবং প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়ার বিষয়ে সংসদীয় কমিটির বৈঠকে আলোচনা হয়েছে। আমরা কমিটির বৈঠক থেকে বিদেশে গমনেচ্ছু কর্মীদের নিরাপত্তাসহ অন্যান্য বিষয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়ার জন্য মন্ত্রণালয়কে সুপারিশ করেছি।
সংসদীয় কমিটিতে মন্ত্রণালয়ের দেয়া প্রতিবেদন বলছে, উত্তর আফ্রিকার ছয়টি দেশ আলজেরিয়া, তিউনিশিয়া, মরক্কো, মিসর, লিবিয়া ও সুদানের মধ্যে মিসর বাংলাদেশের অন্যতম শ্রমবাজার। ২০০০ সাল থেকে মিসরে কর্মী যাওয়া শুরু হয়। এ পর্যন্ত মোট ২৩ হাজার ১১৯ জন বাংলাদেশী কর্মী কর্মসংস্থানের উদ্দেশ্যে মিসরে গিয়েছেন। চলতি বছর গিয়েছেন ৩৫ জন।
লিবিয়া ও মিসর ছাড়া এ অঞ্চলের অন্য দেশগুলোয় বাংলাদেশী কর্মীদের যাওয়ার হার বেশ কম। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) সার্ভারের তথ্যানুসারে বাংলাদেশ থেকে এ পর্যন্ত আলজেরিয়ায় ৬ হাজার ২৬৫ জন, তিউনিশিয়ায় ৩৪ জন, মরক্কোয় ৭০ ও সুদানে ৯ হাজার ৯৮৫ জন কর্মী শ্রম ভিসায় গিয়েছেন।
প্রবাসী কর্মীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতকরণে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করছে বলে ওই প্রতিবেদনে জানানো হয়। সেখানে বলা হয়, বর্তমান সরকার প্রবাসী বাংলাদেশীদের অবদানকে স্বীকৃতি দেয়াসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। প্রবাসী বাংলাদেশী নারীকর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের কল্যাণে সরকার দেশে-বিদেশে নানা ধরনের কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এর মধ্যে প্রবাসী বাংলাদেশী অভিবাসী কর্মীদের প্রশাসনিক, আইনি ও কল্যাণমূলক সেবা দেয়ার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের শ্রম কল্যাণ উইংয়ে বিভিন্ন খাতে অর্থ বরাদ্দসহ সুষ্ঠুভাবে কার্যক্রম পরিচালনায় স্থানীয় ভিত্তিতে জনবল নিয়োগ দেয়া হয়। এছাড়া পাসপোর্ট সংক্রান্ত জটিলতায় অভিবাসী বাংলাদেশী সব কর্মীর দেশে আসতে সমস্যা হলে দূতাবাস বা হাইকমিশন থেকে আউট পাসের ব্যবস্থা করা, বিএমইটিতে অভিযোগ ব্যবস্থাপনা সেলের মাধ্যমে প্রবাসীদের যেকোনো সমস্যার প্রতিকার দেয়া হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রবাসী কর্মী ও তাদের পরিবারের সদস্যদের যেকোনো সমস্যায় প্রবাসবন্ধু কল সেন্টারের মাধ্যমে সেবা প্রদান; মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড ও মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশে সেবা প্রদানের জন্য হটলাইন চালু রয়েছে। বিদেশে মিশনের এসব হটলাইনে সার্বক্ষণিক সেবা প্রদানের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। শ্রম কল্যাণ উইং কর্তৃক সংশ্লিষ্ট দেশের বিভিন্ন জেলখানা, ডিটেনশন সেন্টার বা ক্যাম্প পরিদর্শনপূর্বক আটক কর্মীদের সঙ্গে সরাসরি সাক্ষাৎ করে প্রয়োজনীয় আইনি সহায়তা দেয়াসহ কারামুক্তির ব্যবস্থা করা হয়। কর্মীর কর্মস্থল পরিদর্শন করে নিয়োগকর্তার সঙ্গে সৃষ্ট বিভিন্ন সমস্যা সমাধান এবং প্রাপ্য মজুরিসহ অন্যান্য আর্থিক সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার আদায়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হয়; বিপদগ্রস্ত নারী কর্মীদের তাত্ক্ষণিকভাবে উদ্ধারের ব্যবস্থা এবং প্রয়োজনে দেশে ফেরত আনা হয়। নারী কর্মীদের নিরাপদ আশ্রয় প্রদানে বিভিন্ন দেশে বাংলাদেশ দূতাবাস বা হাইকমিশনের তত্ত্বাবধানে সেফ হোম স্থাপন ও পরিচালনা করা হয়; নিয়মিতভাবে হাসপাতাল পরিদর্শন করে আহত ও অসুস্থ কর্মীদের সুচিকিৎসা নিশ্চিতকরণ এবং চিকিৎসার তদারকি।
সংশ্লিষ্ট দেশের নিয়ম ও আইনকানুন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধির লক্ষ্যে দূতাবাস বা হাইকমিশনের মাধ্যমে বিভিন্ন শহর অথবা লেবার ক্যাম্পে সচেতনতামূলক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয় বলেও উঠে এসেছে প্রতিবেদনটিতে। সেখানে আরো বলা হয়, কর্মীর বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট দেশের কর্তৃপক্ষ যেমন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, শ্রম বা জনশক্তি মন্ত্রণালয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে নিয়মিতভাবে যোগাযোগ রক্ষা করে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেয়া হয়। প্রবাসী কর্মীর মেধাবী সন্তানদের শিক্ষাবৃত্তি প্রদান, তাদের দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ভর্তিতে সহায়তা, প্রতিবন্ধী সন্তানদের ভাতার ব্যবস্থাও করা হয়। পাশাপাশি বিমানবন্দরে প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের মাধ্যমে বিদেশগামী ও প্রত্যাগত কর্মীদের সহায়তা দেয়া হয়; প্রবাসে মৃত্যুবরণকারী কর্মীর মৃতদেহ দেশে আনা, প্রবাসে মৃত্যুবরণকারী কর্মীর মৃতদেহ বিমানবন্দর থেকে স্বজনদের কাছে হস্তান্তরের সময় তাত্ক্ষণিক পরিবহন ও দাফন খরচ বাবদ ৩৫ হাজার টাকা করে চেক দেয়া এবং পরবর্তী সময়ে প্রবাসে মৃত কর্মীর প্রতি পরিবারকে ৩ লাখ টাকা করে আর্থিক অনুদান দেয়া হয়। অসুস্থ কর্মী দেশে আনা, হাসপাতালে ভর্তি এবং চিকিৎসার জন্য ১ লাখ টাকা পর্যন্ত সহায়তা দেয়া হয়। কোনো প্রবাসী কর্মী অস্বাভাবিকভাবে মারা গেলে সে মৃত্যুজনিত ক্ষতিপূরণ, বকেয়া বেতন, ইন্স্যুরেন্স ও সার্ভিস বেনিফিট আদায়ের ব্যবস্থা গ্রহণ ও তা ওয়ারিশদের মধ্যে বিতরণ করা হয়; বিভিন্ন দেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা বা অন্য কোনো কারণে আটকে পড়া কর্মীদের নিরাপদে দেশে ফেরাতে প্রয়োজনীয় দেশে প্রবাসী কর্মীর সম্পদ রক্ষা এবং নানাবিধ অসুবিধা দূর করতে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের প্রবাসী কল্যাণ শাখা এবং স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে সহায়তা দেয়া হয়।
এছাড়া প্রতিবেদন বলছে, বিদেশগামী সব কর্মীকে বীমা সুবিধা দেয়া হয়; বিদেশে মৃত্যুবরণকারী কর্মীর মৃতদেহ এবং অসুস্থ কর্মী দেশে এলে ঢাকা ও চট্টগ্রামের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে স্বল্প ভাড়ায় অ্যাম্বুলেন্স সুবিধার ব্যবস্থা করা হয়। বৈধ পথে রেমিট্যান্স পাঠানোর জন্য সরকার এরই মধ্যে প্রণোদনা বাড়িয়ে ২ শতাংশ থেকে ২ দশমিক ৫ শতাংশ করেছে।










