সিলেটে টিলা ধসে প্রাণহানির ঘটনা বেড়েই চলেছে। সর্বশেষ গতকাল ভোরে জৈন্তাপুরে টিলা ধসে নিহত হয়েছেন একই পরিবারের চারজন। এ নিয়ে গত ২৫ দিনে জেলার পাঁচ উপজেলায় পাঁচটি টিলা ধসের ঘটনা ঘটেছে। এতে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন। অন্যদিকে দীর্ঘদিন ঝুঁকি নিয়ে টিলার পাদদেশে ঘর বানিয়ে বসবাস করছে আড়াই শতাধিক পরিবার। ঘটনা ঘটলেই সতর্কতা জানিয়ে নোটিস দিয়েই যেন কাজ সারছে জেলা প্রশাসন। চলতি মৌসুমে ব্যাপক বৃষ্টি হওয়ায় টিলার পাদদেশে বসবাসকারীদের ঝুঁকি আরো বেড়েছে। তবে ঝুঁকিপূর্ণভাবে পাহাড়ে বসবাসকারীদের বিরুদ্ধে উচ্ছেদ অভিযান, পুনর্বাসন কিংবা নিরাপদে সরিয়ে নেয়ার উদ্যোগ দেখা যায়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গিয়েছে, সিলেট সদর উপজেলার আখালিয়া, ব্রাহ্মণশাসন, দুসকি, টিলারগাঁও, খাদিমনগর, খাদিমপাড়া, বালুচর, পাঠানটুলা গুয়াবাড়ি জাহাঙ্গীরনগর, আখালিয়া বড়গুল এলাকার মুক্তিযোদ্ধা টিলাসহ পাহাড়ের বিভিন্ন স্থানে ঘর বানিয়ে দীর্ঘদিন বসবাস করছে কয়েকশ পরিবার। বাসিন্দারা কেউ ঘর ভাড়া নিয়েছে, কেউ নামমাত্র টাকা দিয়ে দখলদারদের কাছ থেকে জায়গা কিনেছে। বসবাসকারীদের মধ্যে নিম্ন আয়ের লোকজনই বেশি। প্রায় ১০ হাজার লোকের বসবাস বিভিন্ন টিলার পাদদেশে। এছাড়া গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলায় রয়েছে বেশকিছু পাহাড়-টিলা। যেখানে টিলার নিচে বাড়ি করে ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে স্থানীয় বাসিন্দারা।
এদিকে সিলেটে চলতি মৌসুমে ব্যাপক বৃষ্টিপাত হচ্ছে। অবিরাম বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে সাম্প্রতিক বন্যায় প্লাবিত হয়ে পড়ে জেলার বিভিন্ন উপজেলা। এর কিছুদিন পর সিলেটে বৃষ্টিপাত শুরু হয়েছে। এতে টিলার নিচে বসবাসকারীদের টিলা ধসে প্রাণহানির ঝুঁকি বেড়েছে।
সর্বশেষ ঘটনাটি ঘটেছে গতকাল ভোরে সিলেটের জৈন্তাপুর উপজেলার চিকনাগুল ইউনিয়নের পূর্ব সাতজানি গ্রামে। অতিবৃষ্টির কারণে মাটি নরম হয়ে পাশের উঁচু টিলা টিনশেড ঘরের ঘুমন্ত মানুষের ওপর ধসে পড়ে। ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারান একই পরিবারের চার সদস্য। আহত হয়েছেন আরো পাঁচজন। নিহতরা হলেন জুবের আহমদ (৩৫), তার
স্ত্রী সুমি বেগম (৩০), তাদের
পাঁচ বছরের ছেলে সাফি আহমদ ও জুবের আহমদের ভাবি শামীমারা বেগম (৪৮)। ফায়ার সার্ভিসের লোকজন ঘটনাস্থলে পৌঁছে আহতদের হাসপাতালে পাঠায়।
জৈন্তাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা গোলাম দস্তগীর বলেন, মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য সিলেট এমএজি ওসমানী হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
এদিকে গত ১৪ মে গোলাপগঞ্জ উপজেলার লক্ষ্মণাবন্দ ইউনিয়নের চক্রবর্তী পাড়া গ্রামে ঘুমের মধ্যে থাকা অবস্থায় টিলা ধসে প্রাণ হারান এনজিওকর্মী অপু পাল। এ ঘটনায় তার ভাইও আহত হন। গত ৪ জুন রাতে সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ উপজেলার ঘিলাছড়া ইউনিয়নে উত্তর আশিঘর, ঈসাপুর এলাকায় টিলা ধসে ছয়টি বাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। গত ১২ মে সিলেট সদর উপজেলা খাদিম নগর ইউনিয়নের সাহেবের বাজার রামপুর গ্রামে টিলা ধসে কাঁচাঘরসহ তিনটি পাকা ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। একই গ্রামে আরো তিনটি বাড়িতে টিলা ধসের ঘটনা ঘটে। ওই দিনই গোয়াইনঘাট উপজেলার ফতেহপুর ইউনিয়নের ফতেহপুর প্রথম খণ্ড নয়াগ্রামে হাফিজ মো. ফয়জুল করিমের ঘর ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
সরেজমিনে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, খাদিমনগর ইউনিয়নের ভাটা এলাকায় টিলা কেটে একটি মাদ্রাসা গড়ে তোলা হয়েছে। পেছনেও চলছে টিলা কাটা। সেখানেও বেশ কয়েকটি পরিবার ঝুঁকিপূর্ণভাবে বসবাস করছে। আখালিয়া বড়গুল এলাকার একটি টিলা দখল করে বেশ কয়েক বছর ধরে বসবাস করে আসছে অর্ধশতাধিক মুক্তিযোদ্ধা পরিবার। টিলা কেটে বাড়ি তৈরি করার ফলে টিলার মাটি দুর্বল হয়ে গেছে। মুক্তিযোদ্ধা টিলায় বসবাসকারী আব্দুল সহিদ বলেন, অনেক কষ্ট করে ঘরবাড়ি বানিয়ে পরিবার নিয়ে থাকছি। আমাদের যাওয়ার কোনো জায়গা নেই। টিলায় বসবাসকারীরা জানিয়েছেন, কম টাকায় জায়গা পাওয়ায় একটু ঝুঁকি নিয়েই তারা ঘর বানিয়েছেন।
বাংলাদেশ পরিবেশ আইনবিদ সমিতি (বেলা) সিলেটের বিভাগীয় সমন্বয়ক শাহ শাহেদা আখতার বলেন, সিলেটের ছয় উপজেলাসহ সিটি করপোরেশন এলাকায় ২০১১ সালে আদালতের একটি রিটে ১ হাজার ২৫টি টিলার পরিসংখ্যান দেখা যায়। বাস্তবে অনেক টিলার অস্তিত্বই নেই। ভূমিখেকোরা টিলা কেটে নিশ্চিহ্ন করে ফেলছে। প্রশাসনের খুব একটা তদারকি নেই। তিনি বলেন, টিলা কেটে ফেলার ফলে ভূমিধসের ঘটনা ঘটছে। টানা বৃষ্টিতে ঝুঁকি সৃষ্টি হলেও সতর্কতা সৃষ্টির লক্ষ্যে কোথাও প্রশাসনের কোনো উদ্যোগ দেখা যায়নি।
সিলেট পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক ইমরান হোসেন বলেন, টিলা কিংবা পাহাড় কাটার বিরুদ্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের অভিযান অব্যাহত রয়েছে। সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. মজিবুর রহমান জানান, টিলার নিচে বসবাসকারীদের সতর্ক করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সরাসরি গিয়ে সতর্ক করেছেন। তার পরও অনেকে ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকছেন। শিগগিরই কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে জানা গেছে।










