ঢলের পানিতে বাঁধ ভেঙে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জের অন্যতম ‘হালির
হাওরের’ প্রায় ছয় হাজার হেক্টর জমির বেশির ভাগ বোরো ফসলই তলিয়ে গেছে। কৃষক জানান, ঢল আসার পর থেকে স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করেও ফসল শেষ রক্ষা করতে পারেননি তারা। না পাকায় কাটতে হয়েছে কাঁচা-আধাপাকা ধান, তার পরও অর্ধেকের বেশি সোনালি ফসল পানিতে ডুবে গেছে। তবে কৃষি বিভাগ বলছে, ৯৫ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। হাওরে সময়মতো বাঁধের কাজ শুরু এবং শেষ না হওয়ায় পাউবোকে দায়ী করছেন স্থানীয় ও হাওরের কৃষকরা।
স্থানীয় ও হাওরের কৃষকরা জানান, হাওর রক্ষাবাঁধ নির্মাণে শুরু থেকে অনিয়ম, দুর্নীতি করা হয়েছে। সময়মতো বাঁধের কাজ শুরু ও শেষ হয়নি। সোমবার রাতে হালির হাওরের আছানপুর এলাকায় বাঁধ ভেঙে হাওর ডুবে যায়। এখনো হাওরের অনেক জায়গায় ধান পাকেনি। পাকতে আরো এক সপ্তাহ লাগত কিন্তু ধান পাকার আগেই তলিয়ে গেল হাওর।
হালির হাওরের কৃষক সুব্রত সরকার বলেন, ঢলের পানি আসার পর থেকে বাঁধ রক্ষায় আমরা স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করছিলাম। শেষ পর্যন্ত আর রক্ষা করা যায়নি। আমাদের সব ফসল তলিয়ে গেল। এ হাওরের অর্ধেকের বেশি ধান কাটা হয়নি। সব চলে গেল ঢলের পানিতে।
স্থানীয় জামালগঞ্জ উত্তর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান রজব আলী বলেন, হালির হাওরে উপজেলার তিনটি ইউনিয়নসহ তাহিরপুর উপজেলার একটি অংশের ধান রয়েছে। এখনো পুরোদমে ধান পাকেনি। কৃষক কাঁচা-আধাপাকা ধান কাটলেও অর্ধেকের বেশি ধান রয়ে গেছে। হাওরের কোনো কোনো জায়গায় ২৫ ভাগও ধান কাটা হয়নি। সব মিলিয়ে সর্বনিম্ন হলেও ৪০ ভাগ ধান পানির তলে চলে গেছে।
পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম বলেন, সোমবার রাতে জামালগঞ্জের হালির হাওরের আছানপুর এলাকার দিকে বাঁধ ভেঙে পানি প্রবেশ করে। কৃষকদের নিয়ে অনেক চেষ্টা করেও ভাঙন রোধ করা যায়নি।
জামালগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিশ্বজিৎ দেব জানান, বৈরী আবহাওয়া উপেক্ষা করেও শুরু থেকেই হাওরের বাঁধ রক্ষায় আমরা সতর্ক অবস্থানে ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ করে সোমবার রাতে আছানপুরের বাঁধ ভেঙে হালির হাওরে পানি ঢুকছে। এ হাওরে প্রায় ৯০ ভাগের ওপরে ধান কাটা শেষ হয়েছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক বিমল চন্দ্র সোম বলেন, হালির হাওরে ঢুকে পড়া পানিতেই ধান কাটছেন কৃষক। হাওর পুরোদমে পানিতে তলিয়ে যেতে আরো দু-তিনদিন লাগবে। এর আগে কৃষক ধান কাটতে পারবেন। হালির হাওরের মোট ৫ হাজার ২০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান চাষাবাদ হয়েছিল। এর মধ্যে রোববার পর্যন্ত ৪ হাজার ৭০০ হেক্টর জমির ধান কাটা হয়েছে। ৯০ শতাংশ ধান কাটা শেষ হয়েছে। আর মাত্র ৫০০ হেক্টর জমির ধান কাটা বাকি ছিল। আশা করছি কৃষকরা দ্রুত ধান কেটে গোলায় তুলতে পারবেন।
তথ্য
গোপনের অভিযোগ
হাওর বাঁচাও
আন্দোলনের
কৃষি বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন খাতা-কলমে ধান কাটার পরিসংখ্যান বাড়িয়ে তথ্য গোপন করছে বলে অভিযোগ করেছে হাওর নিয়ে কাজ করা কৃষক সংগঠন হাওর বাঁচাও আন্দোলন। হাওরে বাঁধ ভেঙে কাঁচা-আধাপাকা ধান তলিয়ে যাওয়ার দায় এড়াতে তারা এমন করছে বলেই দাবি সংগঠনটির।
মঙ্গলবার আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনটি দাবি করে, ২ এপ্রিল থেকে শুরু করে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত বাঁধ ভেঙে ও পানি উপচে জেলার ছোট-বড় ৩১টি হাওরে প্রায় ২০ হাজার হেক্টর জমির বোরো ফসল তলিয়ে গেছে। বেশির ভাগ হাওরে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বাঁধ ভেঙে তলিয়ে গেলেও ক্ষয়ক্ষতির প্রকৃত তথ্য তুলে না ধরে বাঁধ নির্মাণে অনিয়ম-দুর্নীতির সঙ্গে জড়িতদের পক্ষে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন কাজ করছে।
হাওর বাঁচাও আন্দোলন কেন্দ্রীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক বিজন সেন রায় বলেন, হাওরে এখনো অর্ধেক ধান কাঁচা অবস্থায় রয়েছে। কৃষি বিভাগ ও উপজেলা প্রশাসন খাতা-কলমে ধান কাটার পরিসংখ্যান বাড়িয়ে ক্ষয়ক্ষতির তথ্য গোপন করছে।
উল্লেখ্য, ২ থেকে ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত সুনামগঞ্জ সদর, শান্তিগঞ্জ, দিরাই, শাল্লা, ছাতক, ধর্মপাশা, মধ্যনগর, তাহিরপুর—এ সাত উপজেলার ১৬টি বাঁধ ভেঙে ফসল তলিয়ে যায়। দ্বিতীয় দফায় ১৫ থেকে ২১ এপ্রিল পর্যন্ত টাঙ্গুয়ার হাওরের বর্ধিত গুরমান ও হুরামন্দিরা, হাটার হাওর, পুঁটিয়া ও রাঙ্গামাটিয়া হাওরসহ পাঁচটি বাঁধ ভেঙে ফসল ডুবে যায়। ২৪ এপ্রিল শাল্লা উপজেলার ছায়ার হাওর ডুবে যাওয়ার পর জেলায় মোট ২২টি বাঁধ ভেঙে হাজার হাজার হেক্টর বোরো জমির ধান পানিতে ডুবে যায়। সর্বশেষ ২৬ এপ্রিল জামালগঞ্জ উপজেলার আছানপুর ১৭ নং পিআইসির বাঁধ ভেঙে প্রায় দুই হাজার হেক্টর জমির ফসল তলিয়েছে বলে জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।
এর আগে অতিবৃষ্টি, পাহাড়ি ঢল ও বৈরী আবহাওয়ার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে ৮০ শতাংশ পাকলেই হাওরের ধান কেটে নিতে নির্দেশনা দেয় প্রশাসন। ভারতের মেঘালয় ও চেরাপুঞ্জিতে ভারি বৃষ্টি এবং আগাম বন্যার পূর্বাভাসের কারণে ১৭ এপ্রিলের মধ্যে ধান কেটে নিতে বলা হয়েছিল স্থানীয় কৃষকদের। পাকা ধান দ্রুত কাটার জন্য কৃষকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দিচ্ছে কৃষি মন্ত্রণালয়। দেশের অন্যান্য স্থান থেকে ধান কাটার যন্ত্র কম্বাইন হারভেস্টার ও রিপার পাঠানো হয়েছে হাওরাঞ্চলে।










