যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক ও যানজট নিরসনে সম্প্রসারণ করা হয়েছে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক। লেন সংখ্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সড়ক বিভাজক দিয়ে স্থানীয় পরিবহন ও দূরপাল্লার যানবাহনের জন্য আলাদা লেনও করে দেয়া হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে বেশ কয়েকটি ইউটার্ন ও ইউলুপ। এর মধ্যে একটি সাভারের পাকিজা এলাকায়। অন্যটি গেন্ডা কাঁচাবাজারসংলগ্ন সড়কে। তবে যানজট নিরসনে তৈরি করা এসব ইউটার্ন এখন ভোগান্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। একদিকে দাঁড়িয়ে থাকা বাস, অন্যদিকে অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন পারাপার হওয়ায় সৃষ্টি হচ্ছে যানজট। কখনো কখনো যানজট মহাসড়কের উভয় পাশে দেড় থেকে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়। ঈদে মহাসড়কে গাড়ির চাপ বাড়লে দীর্ঘ যানজটের আশঙ্কা করছেন পরিবহন চালকরা।
নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ইউটার্ন এমন জায়গায় করতে হবে যেখানে স্থাপনা, জনসমাগম বা বাজার থাকবে না। রাস্তা বড় থাকবে। ইউটার্ন এলাকার ২০০ মিটারের মধ্যে কোনো শাখা সড়ক থাকবে না। ইউটার্ন ও শাখা সড়কের মধ্যের দূরত্ব ৩০০-৪০০ মিটার হলে ভালো।
ইউটার্ন বা ইউলুপ যানজট নিরসনের প্রধান উপায় নয় বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা কেন্দ্রের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান। তিনি বলেন, ‘আমাদের দেশে অনেক ইউটার্ন আছে; যা অবৈজ্ঞানিক বা অপরিকল্পিত। যেখানে-সেখানে ইউটার্ন দেয়া হয়েছে। এটা কোথায় হবে এর বিজ্ঞানসম্মত উপায় আছে। কিন্তু দুঃখজনক বিষয় হচ্ছে, দেশে নন-প্রফেশনাল লোকজন এগুলো করছে। প্রফেশনাল লোকের অভাবে এ ধরনের ইউটার্ন আমাদের জন্য হিতে বিপরীত হয়েছে।’
অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘আমাদের দেশে আমরা বাম লেনে চলি। একজন চালককে যখন ডান দিকে যেতে হয়, তখনই তার ইউটার্ন নেয়ার দরকার হয়। কিন্তু মহাসড়ক থেকে সরাসরি রাইট টার্ন নিতে পারছে না বিধায় তার ইউটার্ন দরকার, যাতে সে ডানে যেতে পারে বা রাস্তা ক্রস করতে পারে। কোনো চালক যদি ইউটার্ন নিয়েই শাখা সড়কে যেতে চায়, তাহলে মূল সড়কের গাড়ি ক্রসিংয়ে সমস্যা হয়। দুর্ঘটনার শঙ্কা থাকে। এজন্য শাখা সড়ক থেকে অন্তত ২০০ মিটার গ্যাপ রাখা উচিত। আমরা যদি ৩০০-৪০০ মিটার দূরে ইউটার্ন দেই, তাহলে চালক গাড়ি টার্ন নিয়ে সে আস্তে আস্তে বামে চেপে তার শাখা সড়কে প্রবেশ করতে পারবে। এতে সড়কের কার্যকারিতা বাড়বে। বিজ্ঞান বলে, গাড়ির চাপ যেখানে বেশি, সেখানে ইউটার্ন দেয়া যাবে না। ফাঁকা জায়গায় দিতে হবে। যাতে সরাসরি লেনের ট্রাফিকের সঙ্গে কোনো সমস্যা না হয়।’
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সাভারের পাকিজা এলাকার ইউটার্নের উভয় পাশেই শাখা সড়ক রয়েছে। একটি সড়ক চলে গেছে ব্যাংক কলোনি হয়ে সাভার সরকারি কলেজে, অন্যটি মজিদপুরের দিকে। এছাড়া এখানেই মহাসড়কের পূর্ব পাশে আছে পাকিজা নামে বড় একটি শিল্প-কারখানা ও পশ্চিম পাশে দেশের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলে যাওয়ার বাস কাউন্টার। এছাড়া সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ড ও থানা স্ট্যান্ড এলাকায় সড়ক বিভাজক দিয়ে লোকাল লেন ও সরাসরি লেন আলাদা দেয়া আছে। ফলে যানজট এড়াতে ও দ্রুত যেতে স্থানীয় গণপরিবহন তাদের জন্য ভাগ করা লোকাল লেনে না চলে সরাসরি লেনে চলাচল করে। এতে পাকিজা ইউটার্ন এলাকায় অধিকাংশ যাত্রী বাসে ওঠানামা করে। ফলে একদিকে থেমে থাকা, বাস অন্যদিকে অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন পারাপার হওয়ায় তৈরি হয় তীব্র যানজট। কখনো কখনো যানজট মহাসড়কের উভয় পাশে দেড় থেকে দুই কিলোমিটার পর্যন্ত ছাড়িয়ে যায়।
অন্যদিকে গেন্ডার ইউটার্নটি সাভারের সবচেয়ে বড় পাইকারি বাজারসংলগ্ন এলাকায়। উত্তরাঞ্চলসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে সবজি নিয়ে আসা ট্রাক ও অটোরিকশা মহাসড়কের ঢাকামুখী লেনের ওপর থামিয়ে পণ্য আনলোড করে। একইভাবে ক্রেতারাও কাঁচামাল কিনে অটোরিকশা ও মিনিট্রাকে লোড করে নিয়ে যায়। ফলে ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত ঢাকামুখী লেনে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়।
বিষয়টি ব্যাখ্যা করে ঢাকার কল্যাণপুর সড়ক উপবিভাগের প্রকৌশলী এএসএম তানভীর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘সাভার রেডিও কলোনি থেকে উলাইল পর্যন্ত এলাকা খুবই ঘনবসতিপূর্ণ। মহাসড়কের ওই এলাকার যেখানেই ইউটার্ন করা হোক না কেন, হয় সংযোগ সড়ক আছে, না হয় বড় স্থাপনা আছে। কোথাও ফাঁকা পাওয়া যায়নি। আর সাভার বাসস্ট্যান্ড এলাকা যখন ডিভাইডার দিয়ে আটকে দেয়া হয়েছে, তখন এর আশপাশে যানবাহনসহ মানুষের পারাপারের জন্য ইউটার্ন দরকার ছিল। সেখান থেকে কোনো বিকল্প উপায় না পেয়েই পাকিজায় ইউটার্ন করতে হয়েছে।’
সাভারে ফ্লাইওভার বা ওভারপাস করার চিন্তার কথা জানিয়ে এই প্রকৌশলী বলেন, ‘সেখানে যানজটের কথা এর আগেও আমরা শুনেছি। মূল সড়কে যে পরিমাণ জায়গা রাখা রয়েছে, ইউটার্ন এলাকায়ও একই পরিমাণ জায়গা রয়েছে। কিন্তু অটোরিকশা ও উল্টো পথে গাড়ি চলাচল করায় যানজট বেশি হচ্ছে। ট্রাফিক বা হাইওয়ে পুলিশ যদি এসব নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, তাহলে সমস্যা অনেকাংশে কমে যাবে। এছাড়া সামনে এ সমস্যা সমাধানে ওভারপাস করার চিন্তা রয়েছে। এজন্য কিছুটা সময় লাগবে।’










