কৃষি, মেডিকেল, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়সহ পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনার অবারিত সুযোগ থাকলেও প্রকৌশল শিক্ষায় উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পর্যাপ্ত সুযোগ সৃষ্টি হয়নি সিলেটে। একটি মাত্র ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ প্রতিষ্ঠার ১৫ বছরেও পারেনি নিজের পায়ে দাঁড়াতে। অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরিসহ অবকাঠামোগতভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ এ প্রতিষ্ঠান অপর্যাপ্ত জনবলে খুঁড়িয়ে চলছে। এ কলেজের ৭০ পদের ৫০টিই শূন্য; এমনকি নেই স্থায়ী অধ্যক্ষ ও রেজিস্ট্রার। ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ ও প্রেষণে নিয়োগপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার এ কলেজের সংকট মোকাবেলায় হিমশিম খাচ্ছেন।
প্রতিষ্ঠার পর থেকেই যেন অভিভাবকহীন কলেজটি। ২০১৮ সালের সংসদ নির্বাচনের আগে সিলেট আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে আয়োজিত জনসভায় তৎকালীন ও বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা কলেজটিকে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের ঘোষণা দিয়েছিলেন। সেই থেকে আশায় বুক বেঁধেছেন শিক্ষার্থীরা। কিন্তু এখন পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি।
২০০৫ সালে তৎকালীন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী এম সাইফুর রহমানের প্রচেষ্টায় সিলেট শহরের টিলাগড় আলুরতল এলাকায় সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে আট একর জায়গা নিয়ে স্থাপন হয় সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ। ২০০৭ সাল থেকে শুরু হয় শিক্ষা কার্যক্রম। তিনটি একাডেমিক ভবন (সিএসই, ইইই, সিই ভবন), একটি লাইব্রেরি ও প্রশাসনিক ভবন, অধ্যক্ষের বাসভবন, শিক্ষক ও কর্মকর্তাদের বাসভবন নিয়ে কলেজের পুরো কাঠামো গঠিত। এছাড়া ছাত্রদের জন্য দুটি ও ছাত্রীদের একটি আবাসিক হল রয়েছে। অবকাঠামোয় স্বয়ংসম্পূর্ণ হলেও পর্যাপ্ত জনবল নেই গুরুত্বপূর্ণ কলেজটিতে। সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং
কলেজে তড়িৎ ও ইলেকট্রনিক প্রকৌশল বিভাগ, পুরকৌশল বিভাগ, কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল বিভাগে পড়ার সুযোগ রয়েছে। প্রতিটি বিভাগ চার বছর মেয়াদি বিএসসি (ইঞ্জিনিয়ারিং) ডিগ্রি প্রদান করে থাকে এবং কলেজটি শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত।
কলেজের প্রশাসনিক শাখা থেকে জানা যায়, ২০০৭ সালে শিক্ষা কার্যক্রম শুরু হওয়ার পর এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি কোনো স্থায়ী অধ্যক্ষ পায়নি। চলতি, অতিরিক্ত অথবা ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ দিয়ে চলছে পাঠদান ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। অধ্যক্ষ ছাড়াও শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারীর বেশির ভাগ পদও শূন্য। স্থায়ী শিক্ষক না থাকায় অতিথি শিক্ষককে নিয়ে চলছে শিক্ষা কার্যক্রম। অস্থায়ী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চালাচ্ছেন প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক কার্যক্রম। একজন কলেজ রেজিস্ট্রারই সব কার্যক্রম পরিচালনা করছেন। তিনি নিজেও এই কলেজে এসেছেন প্রেষণে।
জানা যায়, কলেজের অধ্যাপকের তিনটি পদের মধ্যে একজনও অধ্যাপক নেই। সহযোগী অধ্যাপকের আটটি পদের মধ্যে আছেন দুজন। তাদের একজন কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রধান আব্দুর রউফ। তিনিই আবার ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। এছাড়া সহকারী অধ্যাপকের ১৫টি পদের মধ্যে সাতজন এবং প্রভাষকের ১৬টি পদের মধ্যে আছেন আটজন। অন্যদিকে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ২৬টি পদের বিপরীতে আছেন মাত্র তিনজন। অতিথি ও প্রেষণে আনা শিক্ষক-কর্মকর্তাদের দিয়ে প্রতিষ্ঠানের কার্যক্রম কোনো রকমে চালিয়ে নেয়া হচ্ছে।
অন্যদিকে কলেজের বিভিন্ন বিভাগে অত্যাধুনিক ল্যাবরেটরি থাকলেও জনবলের অভাবে সেসব অব্যবহূত অবস্থায় পড়ে আছে। আবার কোনোটির ল্যাবরেটরিতে রয়েছে যন্ত্রপাতি সংকট। প্রতিষ্ঠানের বিশাল লাইব্রেরি প্রায় অব্যবহূত পড়ে আছে। কলেজে নেই কোনো পরিবহন ব্যবস্থা। ফলে আলুরতল ক্যাম্পাস থেকে শহরে আসতে শিক্ষার্থীরা বিড়ম্বনার পাশাপাশি চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভোগেন।
আরিফুল ইসলাম নামের এক শিক্ষার্থী জানান, তিনি কলেজের হোস্টেলে থাকেন। প্রয়োজনীয় কাজে শহরে আসতে চাইলে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে হয়। সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন ছাত্রীরা। তারা হেঁটে মূল সড়কে আসতে অনেক সময় ছিনতাইকারীর কবলে পড়েন। অন্যদিকে কলেজের রয়েছে একটি সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। সেটা দেখভালেরও কেউ নেই। লাইব্রেরিয়ান পদে কোনো লোক না থাকায় মাঝেমধ্যে তৃতীয় শ্রেণীর কর্মচারীকে দিয়ে দেখভাল করানো হয়।
সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক হাসান মাহমুদ বলেন, ‘কলেজটি বিশ্ববিদ্যালয়ে উন্নীত করার সব সুযোগ রয়েছে। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা সিলেটে নির্বাচনী জনসভায়ও একে প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের কথা বলেছিলেন। যার জন্য আমরা প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণের চেষ্টা করেছি। সাধারণ ছাত্রছাত্রীরাও বিভিন্ন সময় বিশ্ববিদ্যালয় রূপান্তরের দাবিতে কর্মসূচি পালন করেন।’
সিলেট সরকারি মহিলা কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ড. নজরুল হক চৌধুরী বিস্ময় প্রকাশ করে বলেন, ‘সিলেট বিভাগের প্রথম ও একমাত্র ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ “সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ”। কলেজটির প্রয়োজনীয় বিভাগ নেই, শিক্ষক নেই, কর্মকর্তা-কর্মচারী নেই। বাংলাদেশে যতটি প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় হয়েছে, এর বেশির ভাগই প্রথমে ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ ছিল। সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজেরও সব সীমাবদ্ধতা দূর করে একে পূর্ণাঙ্গ করা এবং প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তর করা সময়ের দাবি।’
সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মো. সেলিম জানান, তিনি নিজেও প্রেষণে রয়েছেন। দীর্ঘদিন থেকে কোনো জনবল নিয়োগ হয়নি। কর্মকর্তাদের মধ্যে একমাত্র তিনিই রয়েছেন। জনবল না থাকায় নানা সমস্যায় পড়তে হয়।
সিলেট ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ আব্দুর রউফ বলেন, ‘কলেজের জনবল সংকট রয়েছে। জনবল নিয়োগের প্রক্রিয়াটি পিএসসি থেকে সম্পন্ন করতে হয়। আমরা প্রস্তাব বরাবরই পাঠাই, কাজের কাজ কিছু হয় না।’ জনবল না থাকায় ক্লাস নেয়া থেকে দাপ্তরিক কার্যক্রম—সব ক্ষেত্রে সমস্যায় পড়তে হয় বলে জানান তিনি।










