ভৌগোলিকভাবে বাংলাদেশের অবস্থান দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে। কৌশলগত এ অবস্থানের অর্থনৈতিক সুবিধা নিতে দুই অঞ্চলের মধ্যে সড়ক যোগাযোগ স্থাপনে গৃহীত আন্তর্জাতিক উদ্যোগগুলোর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়নে নেয়া হয়েছে একাধিক প্রকল্প। দুই লেনের একমুখী সড়কগুলোর প্রশস্তকরণ, গুরুত্বপূর্ণ নদীর ওপর সেতু নির্মাণ, নদী ও স্থলবন্দর এবং আন্তর্জাতিক বন্দরগুলোকে আন্তর্জাতিক সড়ক নেটওয়ার্কে সংযুক্ত করতে ঢেলে সাজানো হচ্ছে দেশের সড়ক অবকাঠামো।
বর্তমানে শুধু দেশের অভ্যন্তরে চলাচলকারী যানবাহনের চাপ সামাল দিতেই হিমশিম খেয়ে যাচ্ছে দেশের সড়ক-মহাসড়ক খাত। বিভিন্ন গবেষণা ও সমীক্ষায়ও বিষয়টি উঠে এসেছে। এ অবস্থায় বিদ্যমান, নির্মীয়মাণ ও পরিকল্পনাধীন সড়ক অবকাঠামোগুলো আন্তঃদেশীয় যানবাহনের চাপ সামাল দিতে পারবে কিনা, সে বিষয়ে প্রশ্ন তুলছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।
অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, উন্নত বাণিজ্য ব্যবস্থা ও টেকসই উন্নয়নের লক্ষ্যে দুই অঞ্চলের মধ্যে সংযোগ স্থাপনে নেয়া বেশ কয়েকটি উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ। মোটা দাগে এমন উদ্যোগের সংখ্যা সাতটি। এগুলো হলো এশিয়ান হাইওয়ে, সার্ক হাইওয়ে করিডোর, সাসেক রোড করিডোর, বিসিআইএম ইকোনমিক করিডোর, বিমসটেক রোড করিডোর, বিবিআইএন মোটর ভেহিকল এগ্রিমেন্ট ও ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ড ত্রিপক্ষীয় মহাসড়ক। উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন হলে ভারত, নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, থাইল্যান্ডসহ দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে সরাসরি সড়ক যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা হবে বাংলাদেশের।
এসব উদ্যোগের অংশ হিসেবে এরই মধ্যে চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে দেশের অর্থনীতির লাইফলাইন হিসেবে পরিচিত ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক। এ মহাসড়কে কাঁচপুর, মেঘনা ও গোমতী নদীতে নতুন করে নির্মাণ করা হয়েছে তিনটি সেতু। পুনর্বাসন করা হয়েছে পুরনো সেতুগুলো। চার লেনে উন্নীত করা হয়েছে ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক। বিমসটেক ও এশিয়ান হাইওয়ের অংশ হিসেবে নির্মাণাধীন পদ্মা বহুমুখী সেতুর কাজ শেষ পর্যায়ে। চালু করা হয়েছে ঢাকা-মাওয়া-ভাঙ্গা এক্সপ্রেসওয়ে। সাসেক করিডোর উন্নয়নের অংশ হিসেবে চার লেনে উন্নীত কার্যক্রম চলমান আছে জয়দেবপুর-চন্দ্রা-এলেঙ্গা এবং এলেঙ্গা-হাটিকুমরুল-রংপুর মহাসড়ক। ঢাকা-সিলেট, ভাঙ্গা-নড়াইল, চট্টগ্রাম-কক্সবাজার-টেকনাফ, রংপুর-বুড়িমারী, দৌলতদিয়া-খুলনা, পাটুরিয়া-মানিকগঞ্জ, কুমিল্লা-ব্রাক্ষণবাড়িয়া, আশুগঞ্জ-আখাউড়া, ভুলতা-নবীনগর, রংপুর-বাংলাবান্ধা, ভাঙ্গা-কুয়াকাটা, পটুয়াখালী-পায়রাসহ দেশের বিভিন্ন জাতীয়, আঞ্চলিক ও জেলা সড়ককে আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুসরণ করে এসব সড়ক অবকাঠামো নির্মাণের কথা বলা হলেও বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন রকম। সড়ক অবকাঠামোর উন্নয়ন প্রকল্পগুলোয় পরিকল্পনা পর্যায় থেকেই রয়ে যাচ্ছে নানা ত্রুটি-বিচ্যুতি। সঠিকভাবে সমীক্ষা না করা, নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করার সময় বিভিন্ন ধরনের অসংগতি, সঠিক সময়ে বাস্তবায়ন শেষ করতে না পারা, নির্মাণসামগ্রীর মানে ছাড় দেয়াসহ নানা কারণে দেশের সড়ক অবকাঠামোগুলো টেকসই তো হচ্ছেই না, উল্টো সেগুলো অপরিকল্পিতভাবে গড়ে তোলার কারণে তৈরি হচ্ছে যানজট-বিশৃঙ্খলা। থেকে যাচ্ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। ফলে নির্মাণ করা সড়ক অবকাঠামোগুলো দেশের বিদ্যমান যানবাহনেরই চাপ সামাল দিতে পারছে না। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সমীক্ষা বলছে, বাংলাদেশে পণ্যবাহী যানবাহনের গড় গতি ঘণ্টায় মাত্র ১৫ কিলোমিটার। অন্যদিকে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, দেশে পণ্য ও যাত্রীবাহী সব ধরনের যানবাহনের গড় গতিই পর্যায়ক্রমে কমে যাচ্ছে।
এ অবস্থায় দেশের সড়ক-মহাসড়কে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে আসা যানবাহন চলাচল শুরু হলে পরিস্থিতি আরো ভয়ানক হয়ে উঠবে বলে মনে করছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞরা। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. সামছুল হক বণিক বার্তাকে বলেন, যাতায়াত ব্যবস্থার ধমনি বলতে যেসব সড়ককে বোঝায়, সেগুলোর জন্য আন্তর্জাতিকভাবে কিছু মানদণ্ড ঠিক করা রয়েছে। এর কোনোটাই কিন্তু বাংলাদেশে নির্মিত ও নির্মাণাধীন সড়কগুলোয় চোখে পড়ছে না। বিদ্যমান মহাসড়কগুলো এখন দেশের যানবাহনের চাপই ঠিকমতো সামাল দিতে পারছে না। এর বড় কারণ হলো মহাসড়কের পাশাপাশি অনিয়ন্ত্রিতভাবে হাটবাজার ও বিভিন্ন ধরনের অবকাঠামো গড়ে তোলা।
তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশের কোনো মহাসড়কই আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে নেই। আন্তঃদেশীয় পরিবহনগুলোর সিংহভাগই হয় পণ্যবাহী। বাংলাদেশে যেসব আন্তঃদেশীয় সংযোগ সড়ক তৈরি হচ্ছে সেগুলোতেও পণ্যবাহী যানবাহনের প্রাধান্য থাকবে। প্রতিবেশী দেশগুলোর যানবাহন বাংলাদেশের সড়ক অবকাঠামো ব্যবহার করবে নির্দিষ্ট হারে টোল দিয়ে। এসব যানবাহনের মালিক বা চালকরা যদি বাংলাদেশে ঢুকে দেখে রাস্তা খারাপ, হাট-বাজারের কারণে যানজট হচ্ছে, নিরাপত্তা ইস্যুগুলো উপেক্ষিত থাকছে, তাহলে তারা বাংলাদেশের সড়ক ব্যবহার করতে চাইবে না। সড়কের পরিচালন অবস্থা, গুণগত মান, নিরাপত্তা—কোনোটাই আন্তর্জাতিক মানদণ্ড দূরের কথা, বাংলাদেশের উপযোগী মানদণ্ডেই নেই। কোনোভাবেই এসব সড়ক অবকাঠামো ব্যবসাবান্ধব নয়।
সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের তথ্য বলছে, এশিয়ান হাইওয়ের তিনটি রুট যাবে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে। এর মধ্যে এশিয়ান হাইওয়ে-১-এ পড়েছে তামাবিল-সিলেট-নরসিংদী-কাঁচপুর-ঢাকা-ভাঙ্গা-নড়াইল-যশোর-বেনাপোল রুট। এশিয়ান হাইওয়ে-২-এ পড়েছে তামাবিল-সিলেট-নরসিংদী-কাঁচপুর-ঢাকা-জয়দেবপুর-এলেঙ্গা-রংপুর-পঞ্চগড়-বাংলাবান্ধা রুট। একইভাবে এশিয়ান হাইওয়ে-৪১-এ পড়েছে টেকনাফ-কক্সবাজার-ফেনী-কাঁচপুর-ঢাকা-জয়দেবপুর-হাটিকুমরুল-বনপাড়া-কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ-যশোর-মোংলা রুট।
অন্যদিকে সার্ক হাইওয়ে করিডোরের (এসএইচসি) ছয়টি রুট পড়েছে বাংলাদেশে। এসএইচসি-১-এ পড়েছে বেনাপোল-ঢাকা-আখাউড়া রুট। একইভাবে এসএইচসি-৪-এ ফুলবাড়ী-বাংলাবান্ধা-মোংলা/চট্টগ্রাম, এসএইচসি-৫-এ সিলেট-ঢাকা, এসএইচসি-৬-এ আখাউড়া-আগরতলা-চট্টগ্রাম, এসএইচসি-৮-এ বুড়িমারী-মোংলা/চট্টগ্রাম এবং এসএইচসি-৯-এ পড়েছে মালদা-শিবগঞ্জ-যমুনা সেতু রুট।
বুড়িমারী, বাংলাবান্ধা, ঢাকা, বেনাপোল ও চট্টগ্রামকে কেন্দ্র করে গড়ে তোলা হচ্ছে সাসেক রোড করিডোর। অন্যদিকে যশোর-ঢাকা-চট্টগ্রাম-কক্সবাজার ঘুমধুম রুট রয়েছে বিসিআইএম ইকোনমিক করিডোরের কেন্দ্রে। একইভাবে বিমসটেক রোড করিডোরের সাতটি রুট যাবে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে। অন্যদিকে ভারতের ‘লুক ইস্ট’ নীতির অধীনে ভারত-মিয়ানমার-থাইল্যান্ডের মধ্যে ১ হাজার ৪০৮ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি মহাসড়কের (ত্রিপক্ষীয় মহাসড়ক) যুক্ত হওয়ার পরিকল্পনা করছে বাংলাদেশ। আর ২০১৫ সালে স্বাক্ষর হওয়া বিবিআইএন মোটর ভেহিকল এগ্রিমেন্টের মাধ্যমে বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত ও নেপালের মধ্যে সরাসরি চলবে মোটরযান।
এসব রুটের বড় একটি অংশ বাস্তবায়নের দায়িত্ব সড়ক ও জনপথ (সওজ) অধিদপ্তরের। বিশেষজ্ঞরা দেশে নির্মিত, নির্মাণাধীন ও পরিকল্পনাধীন সড়কগুলোয় আন্তঃদেশীয় যানবাহন চলাচলের সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেও সংস্থাটির কর্মকর্তারা তা মানতে রাজি নন। বিষয়টি সম্পর্কে দৃষ্টি আকর্ষণ করলে সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী এ কে এম মনির হোসেন পাঠান বণিক বার্তাকে বলেন, আন্তর্জাতিক মহাসড়কের সব মানদণ্ড অনুসরণ করেই বাংলাদেশের আন্তঃদেশীয় মহাসড়কগুলো তৈরি করা হচ্ছে। প্রতিটি মহাসড়ক তৈরি করা হচ্ছে ছয় লেনে। স্থানীয় ধীরগতির যানবাহন যেন মূল মহাসড়কে প্রবেশ করতে না পারে, সে ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। হাট-বাজার, মোড়-ইন্টারসেকশনগুলোর মতো জায়গাগুলো ওভারপাস, আন্ডারপাস ও ফ্লাইওভারের মতো অবকাঠামো দিয়ে বাধাহীন করে তোলা হচ্ছে।
দেশের বিদ্যমান যানবাহনের চাপেই মহাসড়কগুলো দেবে এঁকেবেঁকে, রাটিং তৈরি হচ্ছে—এমন পরিপ্রেক্ষিতে আন্তঃদেশীয় ভারী যানবাহনের চাপ এ মহাসড়কগুলো কীভাবে সামাল দেবে এমন প্রশ্নে তিনি বলেন, ভারী যানবাহন সামাল দেয়ার একমাত্র উপায় হলো কঠোরভাবে ওজনসীমা নিয়ন্ত্রণ। আমরা শুধু আন্তঃদেশীয় সড়ক তৈরি করছি না, সেগুলোয় যাতে নির্ধারিত ওজনসীমার চেয়ে বেশি ওজন নিয়ে কোনো যানবাহন চলতে না পারে, সেজন্য সারা দেশে ২৮টি ওজন নিয়ন্ত্রণ স্টেশনও তৈরি করছি। পাশাপাশি মহাসড়কগুলোয় উন্নত প্রযুক্তির সঙ্গে সেগুলো পরিচালনায় দক্ষ জনবলের সন্নিবেশ ঘটানোরও পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তাই সামগ্রিকভাবে আমরা বলতে পারি, আন্তঃদেশীয় যানবাহনের চাপ সামাল দেয়ার সব প্রস্তুতিই আমাদের রয়েছে।










