নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণের অজুহাতে বন্দরে বা ঘাটে অবতরণসহ স্বাভাবিক চলাচলে বাধা দেয়া হচ্ছে নদীপথে চলাচলকারী জাহাজের নাবিক ও শ্রমিকদের। এতে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিত্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল পরিবহন কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে। এ বিষয়ে উদ্বেগ জানিয়ে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তর। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এ অবস্থা চলতে থাকলে পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থা বিশৃঙ্খল হয়ে পড়বে।
জানা গেছে, গম, ডাল, ভুট্টা, চিনি, ভোজ্যতেল, সিমেন্ট ক্লিংকার, ইস্পাতের কাঁচামাল, কয়লার মতো ভোগ্য ও শিল্পপণ্য চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে মাদার ভেসেল (সমুদ্রগামী বড় জাহাজ) থেকে খালাস হয়ে সরাসরি ছোট জাহাজে করে নদীপথে শিল্প-কারখানা ও দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে পরিবহন করা হয়। এর মধ্যে নদীপথে সবচেয়ে বেশি পণ্য পরিবহন হয় লাইটার জাহাজ (নদীপথে চলার উপযোগী ছোট নৌযান) বরাদ্দকারী সংস্থা ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেলের (ডব্লিউটিসি) মাধ্যমে। এ বেসরকারি সংস্থার অধীনে থাকা প্রায় এক হাজার লাইটার জাহাজ দিয়ে পণ্য নদীপথে পরিবহন হয়। পরে এসব পণ্য ধারাবাহিকভাবে দেশের ৩৭টি ঘাট ও শিল্প মালিকদের কারখানার ঘাটে নিয়ে খালাস করা হয়। তবে এখন নাবিক ও কর্মরত শ্রমিকরা বাধার মুখে পড়ায় এসব জাহাজ গন্তব্যে গিয়ে আটকে থাকছে।
ডব্লিউটিসির পাশাপশি ভোগ্যপণ্য ও শিল্প কাঁচামাল পরিবহনের জন্য দেশের ১১টি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের মালিকদের প্রায় ৩০০ নিজস্ব লাইটার জাহাজ রয়েছে। দেশে পণ্য উৎপাদনে নিয়োজিত কারখানার অবস্থান সাধারণত নদীর তীরে হয়। এ কারণে আমদানীকৃত কাঁচামাল নদীতীরবর্তী জেটিতে খালাস করে কারখানায় নেয়া হয়। এখন নভেল করোনাভাইরাসকে ঘিরে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে নাবিক ও শ্রমিকরা বাধা পেলে নদীবন্দর ও ঘাটে পণ্য খালাস ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি ভবিষ্যতে নদীপথে জরুরি পণ্য পরিবহনেও জটিলতা তৈরি হবে বলে মনে করছেন শিল্প উদ্যোক্তা ও নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা।
অধিদপ্তর থেকে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সচিব বরাবর চিঠিতে বলা হয়েছে, করোনা পরিস্থিতির এ দুর্যোগময় মুহূর্তে দেশের একমাত্র নৌ-সেক্টরের নাবিকরা তাদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে অর্থনীতির চাকা সচল রাখার জন্য নিরলস পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। তবে অভ্যন্তরীণ নৌযান দেশের কোনো বন্দরে মালামাল খালাস করার জন্য ভেড়ার পর কর্মরত নাবিকরা অবতরণ করতে চাইলে করোনা সংক্রমণের অজুহাতে তাদের বাধা দেয়ার অভিযোগ আসছে। এছাড়া পণ্য খালাসের কাজে জড়িত শ্রমিকদের জাহাজে ওঠানামায়ও বাধা দেয়া হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের অভ্যন্তরে নিত্যপণ্য পরিবহনের কাজে ব্যবহূত পণ্যবাহী নৌযানের নাবিক এবং শ্রমিকরা এ সংকটময় মুহূর্তে কাজে অনীহা প্রকাশ করবে, যা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। বিষয়টির গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে সব জেলা প্রশাসককে নাবিক ও শ্রমিকদের চলাচলে সহযোগিতার অনুরোধ করারও সুপারিশ করা হয়েছে চিঠিতে।
এ ব্যাপারে নৌ-পরিবহন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক কমোডর সৈয়দ আরিফুল ইসলাম বণিক বার্তাকে বলেন, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড সচল রাখার স্বার্থে এবং নভেল করোনাভাইরাস সংক্রমণ প্রতিহত করার লক্ষ্যে আমরা আগেই সতর্ক থেকে পদক্ষেপ নিয়েছি। নদীপথে সকল প্রকার স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালন সাপেক্ষে মালামাল পরিবহনকাজে ব্যবহূত অভ্যন্তরীণ পণ্যবাহী নৌযানের নাবিকদের নদীবন্দরে অবতরণ এবং পণ্য খালাসের সঙ্গে জড়িত শ্রমিকদের অভ্যন্তরীণ জাহাজে ওঠানামার সুযোগ সৃষ্টির ব্যবস্থা করার প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে মন্ত্রণালয়কেও অবহিত করেছি।
ডব্লিউটিসির নির্বাহী পরিচালক মাহবুব রশীদ বলেন, নদীপথে চলাচলকারী জাহাজের কার্যক্রম সচল রাখতে স্বাস্থ্যবিধি মেনে নাবিক ও শ্রমিকদের নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারাটা জরুরি। এরই মধ্যে গন্তব্যে পৌঁছে যাওয়া জাহাজে কর্মরতদের ব্যাপারে স্থানীয় প্রশাসন ও স্থানীয়দের সহযোগিতা দরকার।
নিজস্ব লাইটার জাহাজ থাকা ক্রাউন সিমেন্ট কংক্রিট অ্যান্ড বিল্ডিং প্রডাক্টস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও বাংলাদেশ সিমেন্ট ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমএ) সভাপতি মো. আলমগীর কবির বলেন, শুধু শিল্পের কাঁচামালই নয় খাদ্য সরবরাহ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা বজায় রাখতে ঘাটগুলোতে বিনা বাধায় পণ্য খালাস অব্যাহত রাখা জরুরি। সামনে রমজান আসছে, ফলে প্রচুর ভোগ্যপণ্য পরিবাহিত হবে নদীপথে। তখন পণ্য পরিবহনে ছোট জাহাজের চাহিদাও বাড়বে। স্বাস্থ্যবিধি মেনেই পণ্য স্থানান্তর কর্মকাণ্ড পরিচালিত হওয়া সম্ভব।
প্রিমিয়ার সিমেন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আমিরুল হক বলেন, ‘নিত্যপণ্য ও শিল্পের কাঁচামাল নিয়ে আমাদের ছোট জাহাজগুলো নদীবন্দর, ঘাটে কাজ করতে না পারলে সমুদ্রবন্দরে ঠিক সময়ে ফিরতে পারবে না। এতে সমুদ্রগামী বড় জাহাজ থেকে খোলা পণ্য স্থানান্তর কার্যক্রম বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হবে। নদীপথে সরবরাহ ব্যবস্থা ঠিক রাখতে সরকার নির্দেশিত স্বাস্থ্যবিধি মেনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া জরুরি।’
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্যমতে, নদীপথে মূলত পরিবহন করা হয় খোলা পণ্য বা কার্গো। ৮০০ থেকে তিন হাজার টন পর্যন্ত ধারণক্ষমতার জাহাজে করে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে লাইটার জাহাজে খালাসকৃত পণ্য সদরঘাট লাইটার জেটি ছাড়াও দেশের প্রত্যন্ত এলাকা যেমন নারায়ণগঞ্জ, ফরিদপুর (সিঅ্যান্ডবি), বরিশাল, নোয়াপাড়া, বাঘাবাড়ী, নগরবাড়ী, ঘোড়াশাল, আশুগঞ্জ, মিরপুর, ভৈরবসহ বিভিন্ন স্থানে পৌঁছে। তবে খুব সীমিত পরিসরে পোশাকের কাঁচামালসহ শিল্পপণ্য পরিবহন করতে কনটেইনার জাহাজে কনটেইনারও পরিবহন হয় নদীপথে। এজন্য সরকারি উদ্যোগে ঢাকার অদূরে পানগাঁওয়ে প্রায় ৩২ একর জায়গার ওপর ইনল্যান্ড কনটেইনার টার্মিনাল (আইসিটি) গড়ে তোলা হয়েছে। চট্টগ্রাম থেকে পানগাঁও রুটে কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, এ রুট ব্যবহার করে ২০১৯ সালে আমদানি-রফতানি মিলিয়ে মোট ২৭ হাজার ৪৭৭ একক কনটেইনার পরিবহন করা হয়েছে।
নদীপথে পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখতে ব্যবস্থা নেয়ার আহ্বান জানিয়ে চট্টগ্রাম চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের সভাপতি মাহবুবুল আলম বণিক বার্তাকে বলেন, নদীপথে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক রাখতে ঘাটে থাকা পণ্য খালাস কার্যক্রম ঠিক রাখতে হবে। বার্জে পণ্য পরিবহনে অপচয়ও কম হয়। সবদিক থেকে নিরাপদ, সুবিধাজনক ও ব্যয়সাশ্রয়ী এই পথে সরকার নির্দেশিত প্রয়োজনীয় স্বাস্থ্যবিধি মেনেই পণ্য পরিবহনের পদক্ষেপ নিতে হবে।










