চাল, তেল, মাছ, মাংস, আটা কিংবা চিনি—এসব খাদ্যপণ্যের মূল্য সাম্প্রতিক মাসগুলোয় দেশের বাজারে রেকর্ড উচ্চতা ছুঁয়েছে। অনেক খাদ্যপণ্য আগের চেয়ে দেড়-দুই গুণ কিংবা তারও বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। খাদ্যপণ্যের এ উচ্চমূল্য মানুষের উদ্বেগ ও চাপের প্রধানতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। জাতিসংঘের বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির (ডব্লিউএফপি) এক খানা জরিপে এ তথ্য উঠে এসেছে।

সংস্থাটির পরিচালিত জরিপে সর্বশেষ ছয় মাসে মানুষের উদ্বেগ ও চাপের প্রধান কারণগুলো সম্পর্কে জানতে চাওয়া হয়। জরিপ কার্যক্রমে দেশের আটটি বিভাগের ১ হাজার ২০০ খানার তথ্য সংগ্রহ করা হয়। টেলিফোনে নেয়া সাক্ষাত্কারের ভিত্তিতে এ জরিপ পরিচালিত হয় গত আগস্টে। জরিপে অংশগ্রহণকারীরা খাদ্যের উচ্চমূল্য, প্রাকৃতিক দুর্যোগ, অসুস্থতা ও স্বাস্থ্যব্যয়কেই নিজেদের উদ্বেগ ও চাপের কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

জরিপের ফলাফলে দেখা গিয়েছে, খাদ্যের উচ্চমূল্যকে নিজেদের উদ্বেগ ও চাপের বড় কারণ হিসেবে দেখিয়েছে ৭৬ শতাংশ খানা। উদ্বেগ ও চাপের দ্বিতীয় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে অসুস্থতা ও স্বাস্থ্যব্যয়। ৪১ শতাংশ খানা এটিকে তাদের উদ্বেগের কারণ বলে জানিয়েছে। আর প্রাকৃতিক দুর্যোগ নিয়ে উদ্বেগ ও চাপ রয়েছে ৩৮ শতাংশ খানার।

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) সাবেক গবেষণা পরিচালক ড. এম আসাদুজ্জামান এ প্রসঙ্গে বণিক বার্তাকে বলেন, বছরের শুরুর দিক তথা গত ফেব্রুয়ারি থেকে দ্রব্যমূল্য বাড়ছে। খাদ্যপণ্যের উচ্চমূল্যে মানুষ আগে যে পরিমাণ খাবার গ্রহণ করত, এখন তা কিনতে পারছে না। যেহেতু মানুষের আয় বাড়েনি, তাই পরিবারগুলোয় খাবার বরাদ্দ বিষয়ে উদ্বেগ ও চাপ বাড়বে, এটাই স্বাভাবিক। আর খাবার কম পেলে পুষ্টি কমবে, রোগ-ব্যাধি বাড়বে। তাই দেখা যাচ্ছে, স্বাস্থ্যব্যয় ও অসুস্থতার বিষয়েও অনেকের উদ্বেগ রয়েছে। সামনে কাঙ্ক্ষিত পরিমাণে চাল উৎপাদন না হলে এ উদ্বেগ আরো বাড়তে পারে। এক্ষেত্রে সরকারের আগে থেকেই পরিকল্পনা করা উচিত। যদিও আমরা দেখি যে বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই সমস্যায় পড়ার পর সমাধান খোঁজা হচ্ছে।

মানুষের উদ্বেগ ও চাপ কমাতে কী ধরনের পদক্ষেপ নেয়া যেতে পারে? এমন প্রশ্নের জবাবে এ কৃষি অর্থনীতিবিদ বলেন, নিম্নবিত্ত পরিবারগুলোর প্রতি বেশি নজর দিতে হবে। ওএমএস কার্যক্রমের পরিধি আরো বাড়াতে হবে। শহরে সীমাবদ্ধ না রেখে গ্রামের নিম্নবিত্ত মানুষের কাছেও এ ধরনের কর্মসূচি নিয়ে যেতে হবে।

‘বাংলাদেশ ফুড সিকিউরিটি অ্যান্ড ভালনারেবিলিটি মনিটরিং’ শীর্ষক ওই প্রতিবেদনে বিভাগভিত্তিক উদ্বেগের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। এতে দেখা যায়, আটটি বিভাগের মধ্যে ছয়টিতেই খানাগুলোর উদ্বেগ ও চাপের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে উঠে এসেছে খাদ্যের উচ্চমূল্য। আর সিলেট ও ময়মনসিংহ এ দুটি বিভাগে উদ্বেগ ও চাপের কারণ হিসেবে উঠে এসেছে প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এ দুটি অঞ্চলে তখন বন্যা থাকায় সেখানকার খানাগুলোয় প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিষয়ে বেশি উদ্বেগের তথ্য উঠে এসেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

বিভাগভিত্তিক হিসেবে খাদ্যের উচ্চমূল্যকে উদ্বেগের সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে দেখিয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগের খানাগুলো। ওই এলাকার ৯১ শতাংশ খানাই জানিয়েছে, খাদ্যের উচ্চমূল্য তাদের উদ্বেগের বড় কারণ। আর স্বাস্থ্যব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বিভাগটির ৫৩ শতাংশ খানা। এছাড়া চট্টগ্রামের ৯ শতাংশ খানা প্রাকৃতিক দুর্যোগ বিষয়ে উদ্বেগ ও চাপের কথা জানায়। খাদ্যের উচ্চমূল্য নিয়ে উদ্বেগ ও চাপ বেশি বলে জানিয়েছে খুলনার খানাগুলোও। সেখানকার ৮৫ শতাংশ খানাই খাদ্যের উচ্চমূল্যকে উদ্বেগের প্রধানতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছে। এদিক থেকে তৃতীয় অবস্থানে থাকা বরিশাল ও রাজশাহী বিভাগের ৮১ শতাংশ খানা খাদ্যের উচ্চমূল্যকে তাদের উদ্বেগের প্রধানতম কারণ হিসেবে দেখিয়েছে। এছাড়া অন্যান্য বিভাগের মধ্যে রংপুরে ৭৪, ঢাকায় ৭৩, ময়মনসিংহে ৬১ ও সিলেটে ৩০ শতাংশ খানা তাদের উদ্বেগ ও চাপের প্রধানতম কারণ হিসেবে খাদ্যের উচ্চমূল্যের কথা উল্লেখ করেছে।

ডব্লিউএফপির ‘বাংলাদেশ মার্কেট মনিটর’ শীর্ষক একটি প্রতিবেদনেও দেশে খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চিত্র উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, দুই বছরের ব্যবধানে দেশে মোট চালের দাম ৮ থেকে ১৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। একইভাবে বেড়েছে আটা ও ডালের দামও।