দেশে আবাসন ও গৃহস্থালি খাতে ব্যবহার বাড়ছে সিরামিক পণ্যের। সম্প্রসারণ ঘটছে সিরামিক শিল্পেরও। ক্রমপ্রসারমাণ এ শিল্প খাতটির বাজার, বিনিয়োগ ও ব্যবসা নিয়ে ধারাবাহিক। পর্ব-২ 

আশির দশকের মাঝামাঝি সময়ে দেশে আধুনিক সিরামিক শিল্পের যাত্রা হয়। ওই সময় টেবিলওয়্যারই (বাসনকোসন) ছিল শিল্পটির মূল পণ্য। যদিও দেশের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় অভ্যন্তরীণ পর্যায়ে টেবিলওয়্যারের বাজার সম্প্রসারণের সুযোগ ছিল কম। এখন সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দেশের বাজারে ব্যবহার বাড়ছে টেবিলওয়্যারের। সর্বশেষ ২০১৯-২০ অর্থবছর পর্যন্ত চার বছরে দেশে এ-জাতীয় পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হয়েছে ৬৭ শতাংশ।

সব মিলিয়ে সিরামিক শিল্পে মোট বিনিয়োগের ২৪ শতাংশ নিয়োজিত রয়েছে টেবিলওয়্যারে। যদিও স্থানীয় বাজারে বিক্রীত সিরামিক পণ্যের মধ্যে টেবিলওয়্যার মাত্র ৯ শতাংশ। অভ্যন্তরীণ বাজারে পিছিয়ে থাকলেও রফতানিতে সিরামিক শিল্পে সবচেয়ে এগিয়ে টেবিলওয়্যার। সিরামিক পণ্যের মোট রফতানির ৯৮ শতাংশই টেবিলওয়্যার। এ পণ্য ব্যবহার করছে বিশ্বের ৩১টি দেশের মানুষ।

রফতানির পাশাপাশি এখন স্থানীয় পর্যায়েও সম্প্রসারিত হচ্ছে সিরামিক টেবিলওয়্যারের বাজার। দেশে সিরামিক টেবিলওয়্যার উৎপাদনকারী কারখানাগুলোর বার্ষিক উৎপাদন সক্ষমতা ২৬ কোটি ১৯ লাখ ২০ হাজার পিস। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০১৫-১৬ অর্থবছরেও দেশে সিরামিক টেবিলওয়্যারের বাজার ব্যাপ্তি ছিল ৩৮৯ কোটি ২২ লাখ টাকার। ২০১৯-২০ অর্থবছরের মধ্যে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৬৫২ কোটি ৮৭ লাখ টাকায়। এ হিসাবে চার বছরে টেবিলওয়্যার ব্যবহার বেড়েছে ৬৭ শতাংশ। এর মধ্যে স্থানীয়ভাবে উৎপাদন হয়েছিল ৪৭৯ কোটি ৫২ লাখ টাকার। আমদানি করা হয় ১৭৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকার। এর বাইরেও ওই অর্থবছরে রফতানি হয়েছিল ৪২০ কোটি ৯৪ লাখ টাকার। এ-জাতীয় পণ্য তৈরিতে সরাসরি নিয়োজিত ১৯ হাজারের বেশি শ্রমিক।

দেশে সিরামিক শিল্পের পথচলা শুরু গত শতকের পঞ্চাশের দশকে। তবে এ খাতের আধুনিকায়ন হয় মুন্নু সিরামিক ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের হাত ধরে। প্রতিষ্ঠানটি ১৯৮৫ সালে প্রথম উৎপাদনে আসে। মুন্নু সিরামিকের শুরু হয়েছিল রফতানিমুখী কারখানা হিসেবে। এখনো রফতানি বাজারে শক্তিশালী ভিত রয়েছে প্রতিষ্ঠানটির। এ বাজার আরো সম্প্রসারণের জন্য বাংলাদেশের বাইরেও দুটি দেশে বিক্রয় ও বিপণনকেন্দ্র স্থাপন করেছে মুন্নু সিরামিক। প্রতিষ্ঠানটির ভাইস চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএমইএ) সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট মইনুল ইসলাম মনে করছেন, সার্বিক সহযোগিতা পেলে টেবিলওয়্যারের বাজারে শক্ত অবস্থান গড়ে নিতে পারবে বাংলাদেশ।

বণিক বার্তাকে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক বাজার বিবেচনায় বাংলাদেশ যে ধরনের টেবিলওয়্যার তৈরি করে, বৃহৎ পরিসরের বাজার বিবেচনায় তা প্রতিযোগিতা সক্ষম না। এখন চাহিদায় পরিবর্তন আসতে শুরু করেছে। তার পরও এ পণ্যের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল বলে আমি মনে করি। এটি বলছি কারণ কভিড মহামারীর প্রেক্ষাপটেও শিল্পটি টিকে রয়েছে। বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ বাজারেও সিরামিক টেবিলওয়্যারের চাহিদা পরিস্থিতি ভালো। সার্বিক দিক বিবেচনায় সরকারের সহযোগিতা নিয়ে শিল্পটির আরো অনেক দূর এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। দেশে সিরামিক শিল্প-কারখানাগুলোয় মূলত তিন ধরনের পণ্য উৎপাদন হয়—স্যানিটারিওয়্যার, টেবিলওয়্যার ও টাইলস। শিল্পটিতে মোট কারখানার সংখ্যা ৬৮। এর মধ্যে টেবিলওয়্যার উৎপাদন করছে ২০টি। বিসিএমইএর তথ্য অনুযায়ী, এ ২০ কারখানায় মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ২ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা। বার্ষিক টার্নওভার বিবেচনায় মোট বাজারের ৭৪ শতাংশ দখলে রেখেছে ছয়টি প্রতিষ্ঠান।

এ ছয় প্রতিষ্ঠানের অন্যতম শাইনপুকুর সিরামিক লিমিটেড। ১৯৯৭ সালে গাজীপুরের বেক্সিমকো শিল্পনগরীতে যাত্রা করে কোম্পানিটি। শিল্প উপখাতটি সম্পর্কে জানতে চাইলে শাইনপুকুর সিরামিকের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ হুমায়ুন কবির এফসিএ বণিক বার্তাকে বলেন, সিরামিক শিল্প বিকশিত হওয়া শুরু করে টেবিলওয়্যারের মাধ্যমে। তখন অভ্যন্তরীণ বাজারে সিরামিক টেবিলওয়্যার পণ্যের চাহিদা খুব একটা বেশি ছিল না। ফলে যারাই বিনিয়োগ করেছে, তারা অগ্রাধিকার দিয়েছে রফতানিতে। তবে এখন দেশে একটি সক্রিয় মধ্যবিত্ত শ্রেণী রয়েছে, যাদের মাধ্যমে টেবিলওয়্যারের স্থানীয় একটি বাজার তৈরি হচ্ছে। এক্ষেত্রে এখন অতিরিক্ত সক্ষমতা রয়েছে টেবিলওয়্যার উৎপাদনে। এদিকে বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে সিরামিক টেবিলওয়্যারের চাহিদা সংকুচিত হয়েছে। কারণ মানুষের ভোগ ব্যবহারে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে টেবিলওয়্যারের বাজারে নতুন বিনিয়োগের ক্ষেত্রে অনেক হিসাবি হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে বলে আমি মনে করি।

মুন্নু সিরামিক ও শাইনপুকুর সিরামিক ছাড়াও দেশে শিল্প উপখাতটির শীর্ষ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে আছে ফার সিরামিক, প্যারাগন সিরামিক, প্রতীক সিরামিক, স্টার পোরসেলিন, পিপলস সিরামিক ও স্ট্যান্ডার্ড সিরামিক। এছাড়া আছে তাজমা সিরামিক, যুবক সিরামিক ও আর্টিসান সিরামিক।

এর মধ্যে বৃহৎ পরিসরে রফতানি করছে ফার, শাইনপুকুর, স্টার পোরসেলিন, প্যারাগন, আর্টিসান, মুন্নু, প্রতীক ও পিপলস সিরামিক। রফতানি অর্থমূল্য বিবেচনায় টেবিলওয়্যারে সবচেয়ে বেশি অবদান ফার সিরামিকসের। মোট রফতানিতে প্রতিষ্ঠানটির অংশ ২৬ শতাংশের সামান্য বেশি। শাইনপুকুরের অবদান ১৭ দশমিক ৭৯ শতাংশ। স্টার পোরসেলিনের অংশীদারিত্ব ১৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ। আর্টিসানের অবদান ১০ দশমিক ৫৬ শতাংশ। মুন্নু সিরামিকসের অংশ ৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ।

>>পর্ব-১ : বৃহৎ রূপ নিচ্ছে টাইলসের বাজার