কাপ্তাই হ্রদের পানি কমে আসায় চট্টগ্রামের সুপেয় পানির সরবরাহ নিয়ে বিপাকে পড়েছে চট্টগ্রাম ওয়াসা। প্রধান কয়েকটি শোধনাগারে লবণাক্ততার কারণে ওয়াসার পানি উৎপাদন উল্লেখযোগ্য পরিমাণ কমে গেছে। সম্প্রতি কর্ণফুলী নদীতে কাপ্তাই হ্রদ থেকে জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র দিয়ে প্রবাহিত পানি বন্ধ হয়ে যায় বলে বিজ্ঞপ্তি দেয় চট্টগ্রাম ওয়াসা। যদিও কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ বলছে, কাপ্তাই হ্রদ থেকে কর্ণফুলী নদীতে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রাখার বিষয়টি সত্য নয়।

চট্টগ্রাম ওয়াসার বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, কাপ্তাই হ্রদ থেকে কর্ণফুলী নদীতে পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় চট্টগ্রাম ওয়াসার পরিশোধিত পানিতে লবণাক্ততা বেড়ে গেছে। এ কারণে ওয়াসার পানি পরিশোধন ২৪ ঘণ্টার পরিবর্তে ১২ ঘণ্টায় নামিয়ে আনা হয়েছে। 

যদিও কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ বলছে, কাপ্তাই হ্রদে পানির স্তর কমে আসায় পাঁচটি ইউনিটের পরিবর্তে শুধু একটি ইউনিটের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। এক সপ্তাহ আগেও একটি মাত্র টারবাইনে ৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন হলেও বর্তমানে ১২ ঘণ্টায় ২৫ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। যদিও চট্টগ্রাম ওয়াসার বিজ্ঞপ্তিতে কাপ্তাই হ্রদ থেকে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় পানি সরবরাহ বিঘ্নিত হচ্ছে বলে দাবি করা হয়। 

বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিউবো) সুপারভাইজরি কন্ট্রোল সিস্টেমের (এসসিএডিএ) অপারেশন বিভাগের তথ্যমতে, ২৯ এপ্রিল কাপ্তাই হ্রদের ওয়াটার লেভেল ছিল ৭৫ দশমিক ১৫। যদিও ওইদিন রুলকার্ভ অনুযায়ী পানির লেভেল থাকার কথা ছিল ৮২ দশমিক ৪০। এছাড়া ২ মে পানির লেভেল ছিল ৭৫ দশমিক ১০, রুলকার্ভ থাকার কথা ছিল ৮১ দশমিক ৮১, ৩ মে পানির লেভেল ছিল ৭৫ দশমিক শূন্য ৭ এবং ৪ মে পানির লেভেল ছিল ৭৫ দশমিক শূন্য ৪। অথচ ৩ মে ওয়াসার প্রচারিত বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, কাপ্তাই হ্রদের পানির লেভেল ৬৯ দশমিক শূন্য ২ ফুটে নেমে এসেছে এবং স্বাভাবিক অবস্থায় পানির লেভেল থাকার কথা ছিল ১০৯ ফুট, যা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলে দাবি করেছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড। 

চট্টগ্রাম ওয়াসা সূত্রে জানা গেছে, মদুনাঘাট, মোহরা, রাঙ্গুনিয়ায় অবস্থিত পানি শোধনাগার ও গভীর নলকূপের মাধ্যমে ওয়াসার দৈনিক  মোট ৫০ কোটি লিটার পানি পরিশোধন ও সরবরাহ করার সক্ষমতা রয়েছে। চাহিদা অনুযায়ী দৈনিক নিয়মিত ৪৭-৪৮ কোটি লিটার পানি পরিশোধন করে সংস্থাটি। কর্ণফুলী নদীতে নোনা পানির প্রবাহ বেড়ে যাওয়ায় মদুনাঘাট ও মোহরা পানি শোধনাগার থেকে পানি পরিশোধন অর্ধেকে নেমে এসেছে। এ দুটি কেন্দ্র থেকে প্রতিদিন ৯ কোটি করে  মোট ১৮ কোটি লিটার পানি পরিশোধন সম্ভব। 

বর্তমানে ১২ ঘণ্টা বন্ধ রাখার কারণে দৈনিক ৯ কোটি লিটার পানি পরিশোধ করতে পারছে ওয়াসা। যার কারণে চট্টগ্রাম শহরে পানির চাহিদা থাকলেও দৈনিক পানি সরবরাহ করতে পারছে ৩৮-৩৯ কোটি লিটার। কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের মাধ্যমে কর্ণফুলী নদীতে পানিপ্রবাহ না বাড়লে চট্টগ্রামের সুপেয় পানি  সংকট আরো তীব্র হবে বলে মনে করছে চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষ। 

কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ কেন্দ্রের ম্যানেজার এটিএম আবদুজ্জাহের বণিক বার্তাকে বলেন, ‘কাপ্তাই হ্রদের পানি কমে এলেও একটি মাত্র ইউনিট দিয়ে প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা বিদ্যুৎ উৎপাদন করা হচ্ছে। কাপ্তাই হ্রদ থেকে কর্ণফুলী নদীতে পানি সরবরাহ বন্ধ হয়ে যাওয়া ও বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ রাখার বিষয়টি সত্য নয়। বর্তমান পদ্ধতি অনুসরণ করে ওয়াটার লেভেল ৬৯ পর্যন্ত না নামা পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন চলবে। তাছাড়া যেকোনো সময় বৃষ্টিপাত হলেই আগের পরিস্থিতি ফিরে আসবে।’ 

গত ৩ মে গণমাধ্যমে প্রচারিত চট্টগ্রাম ওয়াসার জরুরি পুনঃগণবিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চলমান শুষ্ক মৌসুমে কাপ্তাই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের লেকে পানির লেভেল ৬৯ দশমিক শূন্য ২ ফুটে নেমে এসেছে, যা স্বাভাবিক অবস্থায় ১০৯ ফুট থাকে। এ অবস্থায় জলবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে পানি নির্গত হচ্ছে না। ফলে মোহরা ও শেখ রাসেল (মদুনাঘাট) পানি শোধনাগারে হালদা নদী থেকে উত্তোলিত পানিতে লবণাক্ততা অতিমাত্রায়   বেড়েছে। পরিশোধিত পানিতে লবণাক্ততার মাত্রা মানবদেহের জন্য সহনীয় পর্যায়ে রাখতে পানি উত্তোলন প্রতিদিন ১২ ঘণ্টা বন্ধ রাখতে হচ্ছে। 

এতে আরো বলা হয়, পানি উত্তোলনের পরিমাণ কমে যাওয়ায় পানির উৎপাদন ও সরবরাহ অস্বাভাবিকভাবে হ্রাস পেয়েছে। সে কারণে পানি সরবরাহে বিঘ্ন ঘটছে। চট্টগ্রাম ওয়াসা সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে কাজ করছে। বিভিন্ন স্থানে রেশনিং পদ্ধতিতে পানি সরবরাহ করার প্রয়োজন হচ্ছে। এ সময় সম্মানিত গ্রাহকদের প্রয়োজনীয় পানি সংগ্রহের মাধ্যমে পানি ব্যবহারে মিতব্যয়ী হওয়ার জন্য বিনীত অনুরোধ করা হলো। অনিবার্য প্রাকৃতিক কারণে সৃষ্ট সাময়িক অসুবিধার জন্য চট্টগ্রাম ওয়াসা কর্তৃপক্ষ সম্মানিত গ্রাহকদের কাছে আন্তরিকভাবে দুঃখ প্রকাশ করছে। 

চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রচারিত এ গণবিজ্ঞপ্তিকে মিথ্যাচার বলে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড, চট্টগ্রাম দক্ষিণাঞ্চলের কর্মকর্তারা। চট্টগ্রাম ওয়াসা মিথ্যা তথ্য প্রকাশ করায় বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের সুনাম ক্ষুণ্ন হয়েছে বলে মনে করেন তারা। 

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম ওয়াসার প্রধান প্রকৌশলী মাকসুদ আলম বণিক বার্তাকে বলেন, ‘‌আমাদের প্রচারিত বিজ্ঞপ্তিতে দেয়া তথ্যটি বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড থেকে নেয়া হয়েছে। এখানে ভুল হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।’

উল্লেখ্য, নির্মাণকালীন কাপ্তাই হ্রদের পানির গড় সর্বোচ্চ লেভেল থাকত ১২০ ফুট এমএসএল (সমুদ্র পৃষ্ঠ থেকে উচ্চতা) বেশি। ১৯৭০ সালে জাইকার এক সমীক্ষায় পানির সর্বোচ্চ স্তর ১১৮ ফুট এমএসএল পাওয়া যায়। তবে পাঁচ দশক ধরে জমতে থাকা পলি, দখল-ভরাটের কারণে পানির সর্বোচ্চ গড় ১১০ ফুট এমএসএলের নিচে নেমে এসেছে। সাম্প্রতিক সময়ে এ হ্রদের পানির স্তর আরো কমে ১০৫-১০৬ ফুট এমএসএলে নেমে গেছে। ফলে নিয়মিত পাঁচটি টারবাইন চালু রাখার মাধ্যমে দৈনিক ২৩০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা থাকলেও সেটি সম্ভব হচ্ছে না। বাধ্য হয়ে ভরা বর্ষা মৌসুমে পাঁচটি টারবাইন চালু রাখা হলেও বছরের অধিকাংশ সময়ই দুটি টারবাইন চালু রাখা হয়।