সবকিছু ঠিক থাকলে আগামী ডিসেম্বরে মেট্রোরেলের যুগে প্রবেশ করতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ উত্তরা-মতিঝিল পথে মেট্রো রেলের সর্বোচ্চ ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ টাকা। দেশের মানুষের আর্থিক সামর্থ্য ও বর্তমানের বাসভাড়া বিশ্লেষণ করে খাতসংশ্লিষ্টরা মেট্রোরেলের জন্য নির্ধারিত ভাড়াকে বেশি হিসেবে অভিহিত করেছেন। অন্যদিকে এ হারে আদায় হওয়া ভাড়া দিয়েও পরিচালন ব্যয় তুলে আনা নিয়ে শঙ্কার কথা জানিয়েছেন খোদ বাংলাদেশের মেট্রো কর্তৃপক্ষের কর্মকর্তারা।

গতকাল উত্তরায় মেট্রোরেলের ডিপোতে প্রদর্শনী ও তথ্যকেন্দ্র উদ্বোধনের পর মেট্রোর ভাড়ার হার চূড়ান্ত করার কথা জানান সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। তিনি বলেন, মেট্রোরেলে সর্বনিম্ন যাত্রী ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা। আর উত্তরা থেকে মতিঝিল স্টেশন পর্যন্ত ভ্রমণের জন্য খরচ হবে ১০০ টাকা। কিলোমিটারপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ৫ টাকা। যেসব যাত্রী সাপ্তাহিক, মাসিক, পারিবারিক কার্ড ব্যবহার করবেন, তাদের বিশেষ ছাড় দেয়া হবে। যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধারা বিনামূল্যে মেট্রোরেলে ভ্রমণ করতে পারবেন।

সরকার নির্ধারিত মেট্রোরেলের এ ভাড়াকে ‘বেশি’ ও ‘অযৌক্তিক’ হিসেবে মন্তব্য করেছেন যাত্রী অধিকার নিয়ে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির মহাসচিব মোজাম্মেল হক চৌধুরী। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, ঢাকা শহরে সরকার নির্ধারিত বাস ভাড়া কিলোমিটারপ্রতি ২ টাকা ৪৫ পয়সা। সেখানে মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে কিলোমিটারপ্রতি ৫ টাকা। আবার বাসের সর্বনিম্ন ভাড়া ১০ টাকা হলেও মেট্রোর সর্বনিম্ন ভাড়া নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ টাকা। এ ভাড়ার হার কোনোভাবেই সাধারণ মানুষের আর্থিক সামর্থ্যের উপযোগী হয়নি। এটি সাধারণ যাত্রীদের ওপর জোর করে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। নির্ধারণের আগে যাত্রী ও খাতসংশ্লিষ্টদের মতামত নেয়া হলে ভাড়ার হারটি জনবান্ধব হতো।

রাজধানীতে মেট্রোরেল নির্মাণ, পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে রয়েছে ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেড (ডিএমটিসিএল)। কোম্পানির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, উত্তরা থেকে মতিঝিল হয়ে কমলাপুর পর্যন্ত যে মেট্রোটি তৈরি হচ্ছে, সেটিতে ট্রেন পরিচালনা করতে প্রতিদিন ৫ কোটি টাকা পর্যন্ত খরচ হবে। আর প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা সমীক্ষা অনুযায়ী, ২০২২ সালে প্রতিদিন ৩ লাখ ৯৬ হাজার যাত্রী চলাচল করবে এ মেট্রোতে। এক্ষেত্রে সব যাত্রীর কাছ থেকে সর্বোচ্চ ভাড়া আদায় করা হলেও প্রতিদিন আয় হবে প্রায় ৪ কোটি টাকা। কিন্তু সব যাত্রী তো শুরু থেকে শেষ গন্তব্য পর্যন্ত যাতায়াত করবেন না। এক্ষেত্রে ভাড়া আদায়ের পরিমাণ হবে আরো কম। ফলে নিয়মিত যাত্রী পরিবহনের মাধ্যমে পরিচালন খরচ উঠে আসবে না।

সম্ভাব্যতা সমীক্ষায় বলা হয়েছে, উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোরেলে প্রতি বছর যাত্রী সংখ্যায় প্রবৃদ্ধি হবে। ২০৩০ সাল নাগাদ প্রতিদিন যাতায়াত করা যাত্রীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়াবে ৫ লাখ ৮৮ হাজারে। কিন্তু পরিবহন বিশেষজ্ঞরা এ হারে যাত্রী প্রবৃদ্ধি হবে কিনা, তা নিয়ে শঙ্কা প্রকাশ করেছেন।

বিষয়টি সম্পর্কে জানতে চাইলে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ড. হাদিউজ্জামান বণিক বার্তাকে বলেন, ঢাকার প্রথম মেট্রোতে অবকাঠামোগত কিছু ঘাটতি থেকে গিয়েছে। সবচেয়ে বড় সমস্যা আশপাশের এলাকাগুলোর সঙ্গে মেট্রো স্টেশনের সমন্বয় না থাকা। এজন্য বাসা থেকে মেট্রো স্টেশনে যাওয়া এবং স্টেশন থেকে গন্তব্যে যাতায়াতের ক্ষেত্রে মানুষের ভোগান্তি কিন্তু থেকেই যাবে। এ কারণে মেট্রোরেল চালুর পর প্রথম কিছুদিন হয়তো প্রচুর যাত্রী হবে। এটা হবে মানুষের উৎসাহ ও কৌতূহলের জন্য। কিন্তু পর্যায়ক্রমে মানুষ যখন বাসা থেকে স্টেশন এবং স্টেশন থেকে গন্তব্যে যাতায়াতে দুর্ভোগে পড়বে, তখন মেট্রোর যাত্রীর চাপ কমার আশঙ্কা কিন্তু থেকেই যায়। যাত্রীর চাপ কমলে সেটি মেট্রোর রাজস্বে সরাসরি প্রভাব ফেলবে। এটা অনেকটা নিশ্চিত যে শুধু যাত্রী পরিবহন করে মেট্রোর পরিচালন ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় তুলে আনা যাবে না।

তবে উত্তরা-মতিঝিল মেট্রোর ভাড়াকে অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি বললেও বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে তা যৌক্তিক বলেও নিজের মত জানান তিনি।

২০১৫ সালের মেট্রোরেল আইনে গণপরিবহনটির ভাড়া নির্ধারণের ক্ষেত্রে দুটি বিষয় বিবেচনায় নেয়ার কথা বলা হয়েছে। এর একটি হলো মেট্রো পরিচালন ব্যয়, অন্যটি জনসাধারণের আর্থিক সামর্থ্য। এ দুই বিষয় বিবেচনা করেই মেট্রোর ভাড়ার হার নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন ডিএমটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সরকারের সাবেক সচিব এমএএন ছিদ্দিক। তিনি বণিক বার্তাকে বলেন, আইন অনুযায়ী গঠিত কমিটি মেট্রোরেলের ভাড়া নির্ধারণ করেছে। তারা যেহেতু দীর্ঘ এক বছরের বেশি সময় নিয়ে ভাড়া নির্ধারণ করেছে, নিশ্চয় সবগুলো বিষয় তারা বিবেচনা করেছে। যাত্রীদের কাছ থেকে আদায় করা ভাড়ার পাশাপাশি যাত্রীবহির্ভূত আয় থেকেও মেট্রোর পরিচালন খরচ তুলে আনা হবে।

মেট্রোরেলের জন্য এরই মধ্যে একটি বাণিজ্যিক স্পেস ভাড়া/ইজারা নীতিমালার একটি খসড়া প্রস্তুত করেছে ডিএমটিসিএল। এতে যাত্রী আয়বহির্ভূত খাতের জন্য রাজস্ব আয়ের সাতটি ক্ষেত্র চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো স্টেশন এলাকায় নির্মিত স্থায়ী/অস্থায়ী অবকাঠামো যেমন রিটেইল শপ, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, মিনি শপ, ফাস্টফুড শপ, ফুড কোর্ট, মানি এক্সচেঞ্জ, এটিএম বুথ কিংবা অন্য যে নামেই অভিহিত হোক না কেন কর্তৃপক্ষ কর্তৃক অনুমোদিত এ ধরনের স্থাপনা। এর বাইরে বিজ্ঞাপন; নাটক, সিনেমা, প্রামাণ্য চিত্র ইত্যাদির শুটিং; কার পার্কিং; স্বল্প সময়ের কোনো ক্যাম্পিং বা প্রচারণা; প্রদর্শনী এবং অনুরূপ বাণিজ্যিক কার্যক্রমকে রাজস্ব আয়ের ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।