বাংলাদেশের জনগণ দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জন করেছে, নতুন যুগের সূচনা করেছে এবং সমতার, মুক্ত ও গণতান্ত্রিক নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছে। এসব কথা বলেছেন ঢাকায় নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। আজ সোমবার (১৪ অক্টোবর) এক সেমিনারে তিনি আরো বলেছেন, ১ ডিসেম্বর থেকে চীন একতরফাভাবে বাজার উন্মুক্ত করবে এবং বাংলাদেশকে শতভাগকরযোগ্য পণ্যের ওপর শূন্য-শুল্ক সুবিধা প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর অর্থ হল— এলডিসি উত্তরণের আগে চীন বাংলাদেশ থেকে সিরিয়াল, চিনি, ভোজ্যতেল, রাবার এবং রাবার পণ্য, কাঠের পণ্য, পাট ও পাটজাত পণ্য, কাগজ ও কাগজের পণ্য, উল এবং তুলা আমদানি উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করবে। চীন বাংলাদেশী তাজা আম আমদানি করবে।

রাজধানীর একটি হোটেলে ‘বাংলাদেশ-চীন সম্পর্ক: একটি ভবিষ্যৎ আউটলুক’ শীর্ষক দিনব্যাপী সেমিনারের উদ্বোধনী সেশনে এসব কথা বলেছেন চীনা রাষ্ট্রদূত। চীন-বাংলাদেশ কুটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৫০ বছর পূর্তি উপলক্ষে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ (বিআইআইএসএস) এবং সেন্টার ফর চায়না স্টাডিজের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত সেমিনারের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পররাষ্ট্র বিষয়ক উপদেষ্টা মো. তৌহিদ হোসেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের মাননীয় রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন এবং বাংলাদেশের অর্থনীতি বিষয়ক শ্বেতপত্র প্রণয়ন কমিটির চেয়ারম্যান ও সিপিডির বিশিষ্ট ফেলো ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য।

বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ইয়াও ওয়েন বলেন, কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের ৪৯ বছর ধরে চীন সবসময় দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের উন্নয়নকে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়েছে। দুই দেশ ক্রমাগত পারস্পরিক সম্মান, সমতা এবং উভয়পক্ষ জয়ী হওয়ার মতো সহযোগিতাকে মেনে চলেছে।

বর্তমান প্রেক্ষাপটে, চীন-বাংলাদেশ সম্পর্কের সংজ্ঞা ও অগ্রগতির জন্য তিনটি পরিবর্তন এবং তিনটি অপরিবর্তনীয় বিষয় সম্পর্কে স্পষ্ট বোঝা প্রয়োজন উল্লেখ করে চীনা রাষ্ট্রদূত বলেন, উভয় দেশের ঐতিহাসিক সুযোগ এবং বাহ্যিক পরিবেশ গভীর পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে গেছে। প্রথমত, পরিবর্তিত ঐতিহাসিক কার্যক্রম। বাংলাদেশের জনগণ দ্বিতীয় স্বাধীনতা অর্জন করেছে, একটি নতুন যুগের সূচনা করেছে এবং একটি সমান, মুক্ত ও গণতান্ত্রিক নতুন বাংলাদেশ গড়ার অঙ্গীকার করেছে। চীন হতদারিদ্র্য দূর করেছে, একটি মাঝারি সমৃদ্ধ সমাজ গড়ে তুলেছে এবং তার প্রথম শতবর্ষী লক্ষ্য অর্জন করেছে। এখন চীন দ্বিতীয় শতবর্ষের লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। দ্বিতীয়ত, পরিবর্তিত উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা। বাংলাদেশে আইনশৃঙ্খলার শাসন পুনরুদ্ধার, অর্থনীতিকে পুনরুজ্জীবিত করা এবং স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণের জন্য সক্রিয়ভাবে প্রস্তুতির দিকে মনোনিবেশ করছে। চীনও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে রয়েছে, একটি শক্তিশালী জাতি গঠনে অগ্রসর হচ্ছে এবং আধুনিকীকরণের চীনা পথের মাধ্যমে জাতীয় পুনরুজ্জীবনের চেষ্টা করছে। তৃতীয়ত, পরিবর্তিত দায়িত্ব। আমরা এমন একটি বিশ্বে বাস করছি যেখানে পরিবর্তন, অশান্তিসহ বিশৃঙ্খল নিরাপত্তা, উন্নয়নের ভারসাম্যহীনতা এবং শাসনের ব্যর্থতা একে অপরের সঙ্গে জড়িত। বৈশ্বিক হটস্পটগুলোতে দ্বন্দ্ব, শক্তিমত্তার প্রতিযোগিতা এবং ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। উন্নয়নশীল দেশ এবং গ্লোবাল সাউথ হিসেবে চীন ও বাংলাদেশকে অবশ্যই একটি সমান ও সুশৃঙ্খল বহুমুখী বিশ্বের জন্য সমর্থন ও সহযোগিতা করতে হবে। সত্যিকারের বহুপাক্ষিকতা চর্চা করতে হবে। আধিপত্যবাদ ও ক্ষমতার রাজনীতির বিরোধিতা করতে হবে এবং আন্তর্জাতিক সম্পর্কের গণতন্ত্রীকরণকে উন্নীত করতে হবে।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, চীনের সঙ্গে বাংলাদেশ সামরিক যোগাযোগ বাড়াতে চায়। বাংলাদেশের উন্নয়নে সরকার চীনের নতুন নতুন বিনিয়োগ আশা করে। বিশেষ করে গ্রিন এনার্জি, আইসিটি খাত এবং সামরিক খাতে সহযোগিতা আশা করে। রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠাতে চীনের আরো সক্রিয় অংশগ্রহণ চায় ঢাকা।

চীনে বাংলাদেশের রফতানি বাড়ানোর আহ্বান জানান তৌহিদ হোসেন। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পর্কে উপদেষ্টা বলেন, রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোই একমাত্র সমাধান।